সন্তানের জন্য অভিনয়ে লম্বা বিরতি দিলারা জামানের
সন্তানের জন্য অভিনয়ে লম্বা বিরতি দিলারা জামানের

অভিনেত্রী দিলারা জামানের সন্তান জুবায়রা জামান চৌধুরী তার মায়ের জীবন ও ত্যাগের গল্প শুনিয়েছেন। মা দিবসে তিনি তার লেখনীর মাধ্যমে মা দিলারা জামানকে তুলে ধরেছেন।

মায়ের প্রতি দায়িত্ব

জুবায়রা জানান, ২৬ বছর ধরে তিনি দেশের বাইরে আছেন। ২০১৪ সালে তার বাবা মারা যান। শেষ সময়ে বাবা বারবার বলতেন, ‘তোর মায়ের দায়িত্ব আমি তোকে দিয়ে যেতে চাই।’ বাবা মারা যাওয়ার পর দিলারা জামান সিদ্ধান্ত নেন তিনি আমেরিকা থাকবেন না। গ্রিন কার্ড ছেড়ে দেন। তাকে রাজি করাতে পারেননি জুবায়রা। তখন নিজেকে খুব ব্যর্থ মনে হতো। ভাবতেন বাবাকে দেওয়া কথা রাখতে পারেননি।

মায়ের একগুঁয়েমি ও ভালোবাসা

জুবায়রা বলেন, তার মা ভীষণ একগুঁয়ে। কথা শুনতে চান না। সবার কাছে তিনি অভিনেত্রী দিলারা জামান, একজন সেলিব্রিটি; কিন্তু তার কাছে তিনি মা। সম্পর্কটা রক্তের, এখানে কোনো স্বার্থ নেই। মেয়ে হিসেবে মন খুলে সব বলতে পারেন। ফলে রাগ-অভিমানটাও বেশিই হয়।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

মায়ের সঙ্গে একটা বড় অভিমানের জায়গা তার পর্দার ছেলেমেয়েরা। নাটকে দেখেন তিনি ছেলেমেয়েদের জড়িয়ে ধরছেন, চুমু খাচ্ছেন। এ রকম অনেক ভিডিও ভাইরালও হয়। দেখলে তার মন খারাপ হয়। মায়ের একটা জড়তা আছে। এই জিনিসগুলো তিনি তাদের সঙ্গে করেননি। অনেকে বোঝানোর চেষ্টা করে, পর্দায় যেটা দেখা যায়, সেটা অভিনয়। তারপরও মনে হয়, তিনি তো তাদের সঙ্গেও ওই ঘনিষ্ঠতাটুকু দেখাতে পারেন। এখন জুবায়রা নিজেও মা। মেয়েদের কাছে তিনি ভালোবাসা প্রকাশ করেন। মায়ের কথা যখন ভাবেন, মনে হয়, তাদের প্রজন্ম হয়তো ভালোবাসার প্রকাশটা গুরুত্বপূর্ণ মনে করেনি। তারা এটার সঙ্গে অভ্যস্ত নয়।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

কঠোর শাসন ও সততার শিক্ষা

জুবায়রা বলেন, তার মা খুব স্ট্রিক্ট ছিলেন। তারা দুই বোন, তিনি আর বড় আপা তানিরা, তাদের দুজনকেই অনেক শাসনের মধ্যে বড় করেছেন। সন্ধ্যা ছয়টার মধ্যে বাড়ি ফিরতে হতো। বন্ধুরা একসঙ্গে মিলে দুপুর বা রাতের খাবার খাওয়া, আড্ডা দেওয়া—এটা পারতেন না। বাসায় ছেলে বন্ধু আনা নিষেধ ছিল, এলেও ড্রয়িংরুমে বসা পর্যন্তই অনুমতি ছিল। এ ক্ষেত্রে বাবাও ছিলেন সমান কঠোর।

মা শিক্ষকতা করতেন। তিনি যে স্কুলে যেতেন, তাদেরও একই স্কুলে ভর্তি করাতেন। সব সময় চোখে চোখে রাখতেন। তারা কখনোই ক্লাস ফাঁকি দিতে পারেননি। তবে এই কঠোরতার মধ্য দিয়ে একটি জিনিস তিনি তাদের শিখিয়েছেন—সততা। বাবা বাংলাদেশ টেলিভিশনের পরিচালক (প্রশাসন) ছিলেন। তাদের দুজনই কোনো কিছুতে লোভ লালসা করেননি। ফলে তারা খুব প্রাচুর্যের মধ্যে বড় হননি। এ বিষয়টা তাদের মধ্যেও এসেছে। চেষ্টা করেন সব পরিস্থিতিতে সৎ থাকার। সব সময় মনে রাখেন ওপরে একজন আছেন, যিনি দেখছেন।

অভিনয় থেকে বিরতি ও ফেরা

চট্টগ্রামে দিলারা জামান থিয়েটার করতেন, অরিন্দমে ছিলেন। তারপর যখন ঢাকায় এলেন, থিয়েটার পুরোপুরি ছেড়ে দিলেন। তিনি জানতেন থিয়েটারে অনেক সময় দিতে হবে। তখন স্কুল আর বাসা—এই দুইয়ের মধ্যে বন্দী হয়ে যান। তাদের স্কুলে আনা–নেওয়া করতেন। রিকশায় জুবায়রাকে কোলে নিতেন, বড় আপা পাশে বসত। নিজ হাতে রান্না করতেন। তারা কখনো গৃহপরিচারিকার রান্না খাননি। বাজারটাও নিজে করতেন। এই সময়টায় অভিনয় থেকে তিনি লম্বা বিরতিতে চলে যান।

এরপর হুমায়ূন আহমেদের ‘এইসব দিনরাত্রি’ নাটক দিয়ে তার অভিনয়ে ফেরা। তখন তার মধ্য বয়স, মা চরিত্রে তখনই হয়তো অভিনয় করার কথা না। কিন্তু তিনি সেই চরিত্র করলেন। তার পর থেকে একই ধরনের রাগী, খিটখিটে মায়ের চরিত্র আসতে থাকল। তখন তিনি কেবল ওই ধরনের চরিত্রের জন্যই বিবেচিত হতেন। এই স্যাক্রিফাইস তিনি তাদের জন্য করেছেন।

মাতৃত্বের গভীরতা

মা হতে দিলারা জামানের অনেক সময় লেগেছিল। বিয়ের ১০ বছর পর তিনি মা হন। জুবায়রার মনে হয় এ জন্য মায়েদের প্রতি তার আলাদা দরদ আছে। ছোটবেলা থেকেই দেখতেন, কারও মা হওয়ার খবর শুনলে তিনি ব্যস্ত হয়ে যেতেন। হয়তো হাতে কিছু টাকা গুঁজে দিয়ে আসতেন। টিফিন বক্স ভরে খাবার রান্না করে নিয়ে যেতেন।

দিলারা জামানের মাতৃত্বের অনুভূতি অনেক গভীর। তাদের একটা ছোট ভাই আছে। ওর নাম আশিক। আশিক ওর আড়াই বছর থেকে তাদের পরিবারের সঙ্গে আছে। তারা একসঙ্গেই বড় হয়েছেন। দিলারা জামান ওকে নিজের ছেলের মতো আদর করেন। ২০১৪ সাল থেকে আশিক তার সঙ্গেই থাকে।

উদারতা ও ত্যাগ

জুবায়রা তার মাকে দেখেছেন প্রচণ্ড উদার। তার কাছে ১০ টাকা থাকলে পাঁচ টাকা তিনি অন্যদের জন্য রেখে দেন। কারও হয়তো চোখের অপারেশন, কারও ছেলের পড়ালেখার খরচ—যেটুকু পারেন সাহায্য করেন। অনেক সময় জমানো টাকাও এসব কাজে খরচ করে ফেলেন। অনেকে তার এই উদারতার সুযোগ নেয়। তিনি সেটা বুঝতে চান না। এ নিয়ে তার সঙ্গে আবার জুবায়রার কথা-কাটাকাটি হয়। তবে তিনি সন্তুষ্টি নিয়ে ঘুমাতে যান, এটা তিনি অনুভব করতে পারেন।

জুবায়রার বিদেশে আসার একটা কারণ ছিল, তিনি মা-বাবাকে বিদেশে নিতে চাইতেন। কিন্তু সেটা পারেননি। তারা দুই বোনই দেশের বাইরে থাকেন। দেশে দিলারা জামানের সঙ্গে আশিক থাকে। আর তার একজন সহকারী আছে। তবে তার সবচেয়ে বড় সঙ্গী কাজ। এই বয়সেও তিনি তার কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকেন। এটা একদিকে জুবায়রাকে কিছুটা স্বস্তি দেয়। তার ডায়াবেটিস আছে, কিডনির সমস্যা আছে, কানে শুনতেও সমস্যা হয়। জুবায়রার মনে হয় কাজ তাকে একাকিত্ব থেকে দূরে রাখে।

মিস করা মায়ের রান্না

দিলারা জামানের পুরো জীবনটা ত্যাগের মধ্য দিয়ে গেছে। জুবায়রা চেষ্টা করেন প্রতিবছর ১০-১৫ দিনের জন্য হলেও ঘুরে আসার। তার দুই মেয়ে আমাইরা আর আরিসা জানে, ওদের নানি বাংলাদেশের একজন সেলিব্রিটি। মুঠোফোনে নানির সঙ্গে ওদের কথা হয়।

দূর থেকে মায়ের কথা সব সময় মনে পড়ে। আর মাঝে মাঝে মিস করেন তার হাতের রান্না। দিলারা জামান মাছ খুব ভালো রাঁধেন। মসলা বেশি দেন না, হালকা ঝোল ঝোল রাখেন। মায়ের হাতের মাছ খুব মিস করেন জুবায়রা।