গোলকধাঁধার গল্প: সুমন সাজ্জাদের গ্রন্থে জীবনের জটিলতা ও দ্বন্দ্বের বিশ্লেষণ
গোলকধাঁধার গল্প: সুমন সাজ্জাদের গ্রন্থে জীবনের জটিলতা

পত্রিকার পাতায় আঁকা গোলকধাঁধাগুলোর প্রস্থান পথ খুঁজে পেতাম না আমি। কানাগলি অস্থির করে তুলতো, ব্যর্থতায় শেষ হতো। এক পর্যায়ে শিখি উলটা পথে যাত্রা—প্রস্থান থেকে প্রবেশে। সেই অভ্যাসে 'গোলকধাঁধার গল্প' পড়ি শেষ গল্প 'তুই যা' থেকে। চরিত্র স্পষ্ট হতে থাকে, বুঝি বাসনা ও মৃত্যুর গোলকধাঁধা জীবনেরই গল্প। প্রস্থান মৃত্যু, প্রবেশ বাসনা। কামনা-বাসনা জীবনকে অভিজ্ঞতা ও স্মৃতির আধার করে, 'জলের মতো ঘুরে ঘুরে' নিঃসঙ্গ গোলকধাঁধায় পরিণত করে।

জীবন কি আবোরেসেন্ট নাকি রাইজোমেটিক গোলকধাঁধা?

অনেক তাত্ত্বিকের কাছে জীবন গোলকধাঁধা। সুমন সাজ্জাদের গোলকধাঁধা আবোরেসেন্ট (বৃক্ষবৎ), কর্তৃত্বক্রমিক, কেন্দ্রীভূত ও দ্বিকোটিবিশিষ্ট। একটি কেন্দ্র, একটি প্রবেশ ও বহির্গমন পথ। স্থানান্তর বিন্দু থেকে বিন্দুতে, গতিবিধি নির্ধারিত। দাবার বোর্ডের মতো প্রতিটি পদক্ষেপ কাঠামোগত পুনরুৎপাদন (Deleuze & Guattari 16)। একটি সত্য, সবকিছুর মূল। এক রূপান্তরিত হয় বহুতে।

সুমন সাজ্জাদের গোলকধাঁধা আবোরেসেন্ট, তাই দ্বিকোটিবিশিষ্ট পথ। বাসনার বিপরীতে মৃত্যু, স্বপ্নের বিপরীতে বাস্তব, অতীতের বিপরীতে বর্তমান, প্রকাশ্যের বিপরীতে আড়াল, অথেনটিকের বিপরীতে ম্যানিপুলেটেড। স্ত্রীর বিপরীতে প্রেমিকা, বিবাহের বিপরীতে ডিভোর্স, প্রতিশ্রুতির বিপরীতে প্রতারণা, নাগরিক অধিকারের বিপরীতে রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন। অদৃশ্য কেন্দ্র, প্রবেশ ও প্রস্থান পথ রয়েছে।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

প্রবেশ পথ 'খড়ের পুতুল' ও কেন্দ্রীয় বিষয়বস্তু

গোলকধাঁধার গল্পের প্রবেশ পথ 'খড়ের পুতুল'। লেখক পাঠকের হাতে সূত্র দেন: 'দয়া করে গল্পের বই ভেবে বইটা কেউ পড়বেন না। দয়া করে গল্প ভেবে গল্পটা পড়বেন না (১২)।' অথচ বইয়ের নাম 'গোলকধাঁধার গল্প'—বৈপরীত্য।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

কেন্দ্রীয় বিষয়বস্তু উপনিবেশোত্তর জাতি-রাষ্ট্রের শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণির জীবন। কেন্দ্রে তাদের উপনিবেশিত/আধুনিক মানস—বিচ্ছিন্নতা, হতাশা, অপ্রাপ্তি, হাহাকার, অসন্তুষ্টি, স্মৃতি। 'হয়ে ওঠা' ও যাপনাভিজ্ঞতা। অনিরূপিত মানদণ্ড, স্খলন, চিনচিনে নৈতিকতা, অপরাধবোধ ও কনফেশন: 'আমি কোনো অপরাধ করিনি।/ আমি কোনো পরস্ত্রীর নিদ্রা হরণ করিনি।/ অনিচ্ছায় আমি কোনো সংগম করিনি।/ আমি কখনো কারো ক্ষতি করিনি।/ আমি কাউকে টানিনি আমার শয্যায় (২০২)।' অপরাধের ধারণা অপরাধী উৎপাদন করে, দাবার বোর্ডের মতো চরিত্ররা একে অপরকে উৎপাদন করে কেন্দ্রীয় বিধি—চিনচিনে নৈতিকতা রূপে।

প্রস্থান পথ 'তুই যা' ও দ্বন্দ্ব

প্রস্থান পথ 'তুই যা'। বাসনার প্রতিমূর্তি 'তুই' গোলকধাঁধা সফর করে 'নেই' হয়ে ওঠে। লেখক লিখেছেন: 'তুই কে? কে তুই? কেউ না? কেননা তুইও নেই (২০৮)।' পরের বাক্যে বলেন: 'যাহ, ফিরে যা (২০৮)।' নেই তুই, কী করে ফিরবে? টেক্সটের বাইরে জগৎ আছে বলে মনে করেন লেখক। 'ঝুলন' গল্পে ২২ তলা দালানের লিফট ১০৭ তলায় গিয়ে থামে, লিফট হয়ে ওঠে ঝুলন্ত কফিন ও কবর, লোকটা থাকে সমান চেতন (১৮২)।

'মোগাম্বো খুশ হুয়া' গল্পের সাংবাদিক খোঁজে 'অথেনটিক কিছু'। তরুণ ইন্টার্ন ডাক্তার ও কনস্টেবল তাকে অথেনটিকের খোঁজ দেয়। নিউজ এডিটর ফোনে বলে: 'পাবা, পাবা। বাট, অত ডিপে যাওয়ার দরকাই নাই। চাপ আছে (১৬৩)।' লেখক মনে করেন 'অথেনটিক' ও 'ডিপ' আছে, তাই গোলকধাঁধা আবোরেসেন্ট কাঠামোয় গড়ে ওঠে। দেল্যুজ ও গোয়াতারির মতে, 'Arborescent systems are hierarchical systems with centers of signifiance and subjectification, central automata like organized memories (Deleuze & Guattari 16)।'

প্রতিটি গল্প একেক গোলকধাঁধা

'মুকুলের বউ' গল্পে রাশেদ প্রবেশ করে গোলকধাঁধায়। তার স্বীকারোক্তি: 'এতদিন তো কাকিই ছিল! কিন্তু মাস্টারবেশনের সময়… সিঁথির সিঁদুর। দুভাগ যোনি। পরিতোষ-কাকিমা (১৭)।' বিমূর্ত মুকুলপালের বউ 'তুই যা' গল্পে হাজির হয় জ্যোৎস্না, রোশনি বা পান্না নামে। রাশেদ হয়ে ওঠে 'তুই'। 'ঝুলন' গল্পের লিফট উপরে ওঠার উপায়। মন্ত্রী বলেছিল: 'তুমি পারবা, গো অ্যাহেড, চালায়া যাও। আজ দেড়শ কোটি, কাল পাঁচশ কোটি। ওয়েট অ্যান্ড সি (১৬৯)।' লিফট ২২ তলায় থামে না, থামে যখন কফিন ও কবর হয়।

'মুগাম্বো খুশ হুয়া' গল্পের সাংবাদিক নিজেও অথেনটিক নয়, তার পরিচয় 'নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক'। 'খাবনামা' গল্প শেষ হয় প্রশ্নে: 'আজ রাতে আমি কি আবারও কোনো স্বপ্ন দেখব (১৫৬)?' উত্তর হ্যাঁ, কারণ স্বপ্ন বাসনার বহিঃপ্রকাশ। পাশের ফ্ল্যাটের অন্তর্বাস পরিহিত মহিলা স্বপ্নের প্রতিমূর্তি। কথক স্ত্রীর ঠোঁটে ঠোঁট রেখে ভেবেছিলেন বাসনার অবসান, কিন্তু 'বরফ-পাহাড়' গল্পে রাহাত সাহানাকে মাড়িয়ে ভেনাসের দিকে ঝুঁকে পড়ে। ভেনাস তার ডিজাইআর। শেষ মেসেজ: 'হোয়াট ইজ দ্য ডিফারেন্স বিটউইন টু লাভস? ডু ইউ নো (১১৪)?' উত্তর: মৃত্যু।

'ভবচক্র' গল্পে ১৯৪৩ সালের সকাল কানাইয়ের বাস্তবতা, সন্ধ্যা ডিজাইআর। কানাইয়ের সাইকেল যাত্রা বাস্তবতা থেকে ডিজাইআরে। 'হাটবারের পর থেকে কানাইকে আর কোথাও দেখা যায় না (১০০)।' 'মঙ্গলগ্রহে প্রেম' গল্পে পৃথিবী প্রেমহীন গ্রহ। ইরফান মুনাকে নিয়ে মঙ্গলগ্রহে পৌঁছে। 'আতিশ' গল্পে আতিশ আলমিত্রাকে ছুঁয়ে ফেলে, তারপর 'অন্ধকারে দুজন দুজনকে জড়িয়ে ধরতেই বাতাসের প্রবল ঘূর্ণিতে বালির পাহাড়টি মুহূর্তে অদৃশ্য হয়ে গেল। আতিশ অথবা ছায়ামূর্তি—সেখানে কেউ নেই (৩৯)।'

'মিস্ট্রি' গল্পের মিস্ট্রি আসলে কোথায়? বুড়ো আর রাখি আগে থেকেই সম্পর্কিত। কথক নিজের অবস্থান বুঝতে পারে না। বুড়ো প্রশ্ন করে: 'রাখি বল তো কাকে তোর পছন্দ? কাকে তুই বেছে নিবি?' রাখি উত্তর দেয়: 'নো চয়েস। অবভিয়াসলি তোমারেই বাইছা নিব (১৩৬)।' গল্প এখানেই শেষ নয়। কেন্দ্র রাখি নয়; রাখিকে পেতে বুড়োর জন্য প্রেমিক জোটাতে হয়, ডুয়েলে লড়তে হয়। কথক অবস্থান বুঝতে না পারায় সম্পর্ক কাঠামো গোলকধাঁধা হয়।

রাইজোমেটিক গোলকধাঁধার বৈপরীত্য

রাইজোমেটিক গোলকধাঁধার কোনো কেন্দ্র ও নির্গমন পথ নেই, একাধিক প্রবেশপথ। নিজেকে সর্বদাই মধ্যবর্তী অবস্থানে আবিষ্কার করে। কোনো পূর্বনির্ধারিত আকার নেই, শেষ নেই। গমনের মধ্য দিয়েই মানচিত্র রচিত হয়। মানুষের ভার্চুয়াল রিয়েলিটি রাইজোমেটিক গোলকধাঁধা। ফেসবুক, ইন্স্ট্রাগ্রামে নিজেকে মধ্যবর্তী অবস্থানে খুঁজে পায়। কোনো পূর্বনির্ধারিত মানচিত্র নেই, প্রতিটি ক্লিকের মাধ্যমে রচিত হয়। কোনো কর্তৃত্বক্রম নেই, প্রতিটি স্পেস সমান গুরুত্বপূর্ণ। দেল্যুজ ও গোয়াতারির ভাষ্যে: 'A rhizome ceaselessly establishes connections between semiotic chains, organizations of power, and circumstances relative to the arts, sciences, and social struggles (Deleuze & Guattari 7)।'

সুমন সাজ্জাদের গোলকধাঁধা পেরোনো যায়, কারণ তা আবোরেসেন্ট। সুনির্দিষ্ট আকার, কেন্দ্র, প্রবেশ ও নির্গমন পথ। তিনি পুঁজি নিয়ন্ত্রিত আধুনিক জীবনকে উপজীব্য করেছেন। বাংলাদেশের মতো উপনিবেশোত্তর জাতি-রাষ্ট্রের আধুনিক বিষয়ীর গঠন, বিকাশ ও এজেন্সি সম্পর্কিত প্রশ্নাবলি গল্পের অচেতনে ভূমিকা রাখলেও, তিনি স্পষ্ট করেননি। তিনি আশ্রয় করেছেন যাপিত জীবন, লিখেছেন গল্প। আধুনিক জীবনের কন্ট্রাডিকশন ও সংশয় জীবনকে গোলকধাঁধায় পরিণত করে, তিনি রচনা করেছেন ধ্রুপদী গোলকধাঁধা।