রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ উপজেলার প্রধান বাজারে সম্প্রতি দেড় কেজি ওজনের একটি টাকি মাছ ধরা পড়েছে। এই ঘটনা আবারও আলোচনায় এনেছে টাকি ও চ্যাং মাছের পার্থক্য নিয়ে সাধারণ মানুষের বিভ্রান্তি।
দুই মাছের বংশ ও প্রজাতি
টাকি ও চ্যাং উভয়ই সর্পমাথা পরিবারের (Channidae) অন্তর্ভুক্ত। মাথা সাপের মতো দেখতে বলেই এই নামকরণ। শোল, গজার, তিলাশোলও একই পরিবারের, আকার ও স্বভাবে ভিন্ন। টাকির বৈজ্ঞানিক নাম Channa punctata, যার অর্থ গায়ের ছোপ ছোপ দাগ। চ্যাংয়ের নাম Channa orientalis, যদিও কিছু গবেষক একে Channa gachua বলে চিহ্নিত করেন। প্রজাতি নির্ধারণে মৎস্যবিজ্ঞানীদের মধ্যে এখনো পুরোপুরি মতৈক্য নেই।
টাকি চেনার উপায়
টাকি বাংলাদেশের প্রায় সব খাল-বিল, পুকুর ও ডোবায় পাওয়া যায়। অঞ্চলভেদে একে ল্যাটা, লাটি, ওকন বা চাইতান বলা হয়। দেখতে শোল মাছের ছোট সংস্করণের মতো, মাথা চাপা, শরীর লম্বাটে ও আঁশে মোড়া। সাধারণ আকার ১৩ সেন্টিমিটারের কাছাকাছি, তবে কোনোটি সাড়ে ৩২ সেন্টিমিটার পর্যন্তও হতে পারে। গায়ের দুইপাশে হলদেটে আভা, পেটের দিকে দাগ স্পষ্ট। মুখ বড় ও দাঁত ধারালো। শিকারি স্বভাবের কারণে ছোট মাছের পোনা ও নিজ প্রজাতির পোনাও খেয়ে ফেলে। তাই পুকুরে অন্য মাছের সাথে চাষ করা যায় না; আলাদা পুকুরে চাষ করতে হয়। বর্ষা ও প্রাক্-বর্ষায় প্রজননকালে পাড়ের কাছে এক-দেড় মিটার গভীরে জলজ লতাপাতার বাসায় স্ত্রী মাছ ডিম পাড়ে, পুরুষ মাছ নিষেক করে। বাচ্চা ফোটার পর মা-বাবা উভয়েই পাহারা দেয়।
টাকির গলবিলের কাছে ফ্যারেঞ্জিয়াল ডাইভারটিকুলা নামক অঙ্গ থাকে, যা পানির বাইরে থেকে বাতাসের অক্সিজেন টানতে সাহায্য করে। পানি শুকিয়ে গেলে বা কাদায় আটকালেও দীর্ঘক্ষণ বেঁচে থাকতে পারে, যা সাধারণ মাছের পক্ষে অসম্ভব।
চ্যাং কেন কম দেখা যায়
চ্যাং তেলোটাকি, রাগা, ঘাইরা বা গাচুয়া নামেও পরিচিত। ইংরেজি নাম Ceylon snakehead ও Walking snakehead, কারণ পানির বাইরে হাঁটার ভঙ্গিতে নড়াচড়া করতে পারে। শরীরের সামনের দিক চোঙাকৃতি, পেছনের দিকে চাপা। পাখনার কিনারায় কমলা রঙের ছোঁয়া থাকে, যা দূর থেকে চ্যাংকে চেনার সবচেয়ে সহজ উপায়।
চ্যাং আকারে টাকির চেয়ে ছোট এবং বর্তমানে বাংলাদেশের জলাশয়ে পাওয়া কঠিন। ২০১২ সালের বন্য প্রাণী সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা আইনে এটি সংরক্ষিত প্রাণীর তালিকাভুক্ত, ধরা বা শিকার আইনত নিষিদ্ধ। অন্যদিকে, টাকি আইইউসিএন বাংলাদেশের লাল তালিকায় বিপদমুক্ত বলে বিবেচিত, তাই এখনও সহজলভ্য।
পাঁচ ভাইয়ের পরিবার
বাংলাদেশে টাকিজাতীয় মাছের পাঁচ প্রজাতি রয়েছে: টাকি, শোল, গজার, তিলাশোল ও চ্যাং। শোল ও গজার আকারে বড় এবং বাজারে বেশি দেখা যায়। তিলাশোল কম দেখা যায়, চ্যাং প্রায় লুকিয়ে রয়েছে। একসময় খাল-বিলে এরা প্রচুর ছিল, কিন্তু এপিজুওটিক আলসিরেটিভ সিনড্রোম, জলাশয় ভরাট, নদী শুকিয়ে যাওয়া, রাসায়নিক সারের দূষণ ও অনিয়ন্ত্রিত মাছ ধরার কারণে সংখ্যা কমেছে।
টাঙ্গাইলের একটি পুকুরে কয়েক বছর আগে কমলা রঙের একটি টাকিজাতীয় মাছ পাওয়া গিয়েছিল, স্থানীয় নাম ‘কমলা টাকি’। মৎস্যবিশেষজ্ঞরা নিশ্চিত হতে পারেননি এটি পাঁচ প্রজাতির কোনো রূপভেদ নাকি নতুন প্রজাতি। উত্তর এখনো অজানা।
তাই পরের বার বিলের ধারে সাপমুখো মাছ দেখলে পাখনার দিকে খেয়াল করুন। কমলা রঙ থাকলে তা চ্যাং, যা আইনের সুরক্ষায় থাকা একটি মাছ, বর্তমানে সহজে পাওয়া যায় না।
সূত্র: ফিশ ফার্মিং বিডি



