একবার রাত কাটানোর উদ্দেশ্যে একটি হোটেলে যান ফ্রানৎস কাফকা। ছিমছাম, পরিপাটি ও বেশ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন সবকিছু। রুমে চেক ইন করেই কাফকা টের পান বিছানায় ছারপোকা, অস্বস্তি গ্রাস করে তাকে। দ্রুত মালিককে জানালে তিনি বেশ অবাক হন। ভ্রূ কুঁচকে বলেন, তার হোটেলের অন্য কোনো কক্ষেই ছারপোকার অস্তিত্ব নেই। এমন উদ্ভট অভিযোগ কখনো তাকে শুনতে হয়নি। হুট করে এই রুমেই কীভাবে ছারপোকা আসলো? সম্ভবত কাফকা নিজেও একই প্রশ্ন করেছিলেন নিজেকে। আসলে এই রুমের ছারপোকাটি তারই ছারপোকা, তার নিজেরই এক পতঙ্গ, এক ধরনের বিকল্প সত্তা।
জাতীয় পরিচয়ের দ্বান্দ্বিকতা
এই সত্তাটিই কখনো তাকে স্থির হতে দেয়নি, সারাক্ষণ বিচলিত থাকতেন। নিজেকে তাই বাঁধতে চাননি কোনো সীমাবদ্ধতা বা নিয়ম-কানুনের বেড়াজালে। জন্মসূত্রে ইহুদি হলেও ইদ্দিশ বা হিব্রু জানতেন না। পরিবারে চেক বা জার্মান দুই ভাষাতেই কথা বলা হতো, কিন্তু পরিবারের কাছে চিঠি লিখতেন শুধু চেক ভাষায়। তার সমস্ত সাহিত্যকর্ম আবার জার্মান ভাষায়। তাই তাকে ঠিক যেমন ইহুদি লেখক বলা যায় না, তেমনি চেক বা জার্মান লেখকও বলা সমীচীন নয়। জাতীয় আত্মপরিচয়ের এই ‘মধ্যবর্তী অবস্থা’ বা ‘অদ্ভুত দ্বান্দ্বিকতা’ তার সাহিত্যেও বেশ স্পষ্ট। তার চরিত্রগুলো তাই একক জাতীয় বা আঞ্চলিক পরিচয়ে তাদের বেঁধে ফেলা যায় না।
সাহিত্যই ছিল তাঁর স্বদেশ
একমাত্র যে ‘অঞ্চল’-কে কাফকা সত্যিই ভালোবাসতেন তা হলো সাহিত্য। একে তিনি মনে করতেন নিজের আধ্যাত্মিক স্বদেশভূমি হিসেবে। তিনি বলেন, “আমি শুধু সাহিত্যকে ভালোবাসি না, আমি নিজেই সাহিত্য, আমি সাহিত্য দিয়েই তৈরি।” নিজের অস্তিত্বকে তিনি বিলীন করে দিয়েছিলেন সাহিত্যের মাঝে।
সাহিত্য ও ভালোবাসার মাঝে বিলীন হতে চাইলেও প্রতিবার প্রতিবন্ধক হিসেবে আবিষ্কার করেছেন নিজ পিতাকে। ছোটোবেলা থেকেই তিনি দেখেছেন পিতার নিষ্ঠুরতা। মায়ের ভালোবাসা পাওয়ার বয়সে তিনি দেখেছেন তার হাড়ভাঙা পরিশ্রমের দিনগুলো। খুব সকালে মা-বাবা বের হয়ে যেতেন দোকানে। ফিরতেন রাতে, ক্লান্ত-পরিশ্রান্ত হয়ে। সব জীবনীশক্তি একেবারে নিঃশেষ করে। তার প্রথম ভালোবাসা ফেলিসকে লেখা চিঠিতে তাই তিনি অভিযোগ করে বলেন, “আমার মা হলেন আমার মহাপুরুষ বাবার স্নেহময়ী দাসী। আর আমার বাবা হলেন আমার মায়ের স্নেহময় স্বৈরশাসক—তাদের মধ্যে রয়েছে নিখুঁত সম্প্রীতি।”
পিতার সাথে সম্পর্ক ও সৃজনশীলতা
তার সৃজনশীলতার চালিকাশক্তি হয়ে ওঠে শৈশবে পাওয়া তার এইসব মানসিক আঘাতগুলো। পিতাকে লেখা তার চিঠিগুলোতে তিনি বলেন, “সম্প্রতি তুমি আমাকে জিজ্ঞেস করেছিলে আমি কেন বলি যে তোমাকে ভয় পাই। বরাবরের মতোই আমি তোমাকে উত্তর দিতে পারিনি। এর কারণ আংশিকভাবে আমি তোমাকে ভয় পাই এবং আংশিকভাবে এই ভয়টা ব্যাখ্যা করতে গেলে এমন অনেক খুঁটিনাটি বিষয় বলতে হবে, যা সাধারণ কথোপকথনে বলা কঠিন। আমার লেখা সব বই-ই ছিল তোমাকে নিয়ে—সেখানে আমি এমন অশ্রু ফেলেছি যা তোমার বুকে ফেলতে পারিনি।”
এই অশ্রু তার পিতাকে স্পর্শ করেছে কিনা তা জানা যায়নি, তবে সিক্ত করেছে জগতের সবাইকে। মানুষের অন্তরের গহিনে যে জটিলতার জগৎ ঠিক সেখানেই এই অ-জাতীয়, অ-আঞ্চলিক লেখকের বাস। তাই আজ থেকে একশ তেতাল্লিশ বছর আগে জন্ম নেওয়া এই লেখক এখনো চিরতরুণ। শুভ জন্মদিন ফ্রানৎস কাফকা।



