বিতর্ক ও আইনি জটিলতার পর প্রায় এক বছর বিরতি কাটিয়ে সময় রায়নার জনপ্রিয় শো ‘ইন্ডিয়াজ গট ল্যাটেন্ট’ দ্বিতীয় মৌসুম নিয়ে ফিরেছে। এবার শোটি শুধু ইউটিউবেই নয়, নেটফ্লিক্স ও ইউটিউবে একযোগে প্রচারিত হচ্ছে। পাশাপাশি সময় রায়নার জন্য একটি এক্সক্লুসিভ কমেডি স্পেশালও নির্মাণ করছে নেটফ্লিক্স।
নতুন ঠিকানা নেটফ্লিক্স, সঙ্গে ইউটিউব
১৯ জুন আনুষ্ঠানিকভাবে নেটফ্লিক্স ও সময় রায়না নতুন সহযোগিতার ঘোষণা দেন। দ্বিতীয় মৌসুমের প্রথম পর্ব ২০ জুন সন্ধ্যা সাতটায় নেটফ্লিক্স ও ইউটিউবে একযোগে মুক্তি পায়। ভারতীয় ডিজিটাল বিনোদনের ক্ষেত্রে এটিই প্রথম বড় আকারের সিমুলকাস্ট। অর্থাৎ একই সময়ে দুই প্ল্যাটফর্মে একই কনটেন্ট প্রকাশ করা হচ্ছে। এরপর প্রতি দুই সপ্তাহ অন্তর নতুন পর্ব মুক্তি পাবে। সময় রায়না ও তাঁর সহযোগী বলরাজ সিং জানিয়েছেন, দুই প্ল্যাটফর্মের সংস্করণের মধ্যে কোনো পার্থক্য থাকবে না; দর্শকেরা একই আনফিল্টারড (সম্পাদনা ছাড়া) কনটেন্ট দেখতে পারবেন।
ভাইরাল জনপ্রিয়তা থেকে আইনি বিতর্ক
২০২৪ সালে ইউটিউবে শুরু হওয়া ‘ইন্ডিয়াজ গট ল্যাটেন্ট’ খুব দ্রুতই ভারতের অন্যতম আলোচিত কমেডি ট্যালেন্ট শোতে পরিণত হয়। প্রতিযোগীদের অভিনব পারফরম্যান্স, বিচারকদের তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া এবং সময় রায়নার স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থাপনা অনুষ্ঠানটিকে তরুণ দর্শকদের কাছে ব্যাপক জনপ্রিয় করে তোলে। তবে ২০২৫ সালের শুরুতে অতিথি বিচারক রণবীর আল্লাহবাদিয়ার একটি মন্তব্য ঘিরে বড় বিতর্ক সৃষ্টি হয়। তাঁর সেই মন্তব্যকে ‘যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ’ ও ‘অশালীন’ উল্লেখ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক সমালোচনার শুরু হয়। পরে বিষয়টি আইনি পর্যায়েও গড়ায়। সময় রায়না, রণবীর আল্লাহবাদিয়াসহ অনুষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত কয়েকজনের বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগ দায়ের করা হয়। জনমতের চাপ বাড়তে থাকলে সময় রায়না ইউটিউব থেকে অনুষ্ঠানের সব পর্ব সরিয়ে নেন এবং কিছু সময়ের জন্য জনসমক্ষে ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজের উপস্থিতিও অনেকটাই সীমিত করে দেন।
এক বছর পর প্রত্যাবর্তন
বিতর্কের প্রায় এক বছর পর সময় রায়না আবার ফিরে আসেন তাঁর প্রথম পূর্ণাঙ্গ স্ট্যান্ড-আপ স্পেশাল ‘স্টিল অ্যালাইভ’ নিয়ে। ইউটিউবে প্রকাশিত ১ ঘণ্টা ২১ মিনিটের এই স্পেশাল ভিডিওতে তিনি খোলাখুলিভাবে অনেক বিষয়ে আলোচনা করেন। সেগুলোর মধ্যে অন্যতম ছিল ‘ইন্ডিয়াজ গট ল্যাটেন্ট বিতর্ক’, এক বছরের বিরতি, ব্যক্তিগত ও আর্থিক সংকট, শৈশবের বুলিং, কাশ্মীরি পণ্ডিত পরিচয়, মানসিক স্বাস্থ্য এবং কঠিন সময়ে পরিবার, বন্ধু ও ভক্তদের সমর্থন নিয়ে। প্রকাশের পর পর্বটি দ্রুতই ভাইরাল হয়ে যায়। ভিডিওটি প্রকাশের পর পাঁচ কোটিরও বেশি ভিউ অর্জন করে। এর ফলে এটি একক আপলোডে বিশ্বের অন্যতম সর্বাধিক দেখা পূর্ণাঙ্গ স্ট্যান্ড-আপ কমেডি স্পেশাল হিসেবে আলোচনায় আসে।
নেটফ্লিক্সে সময় রায়নার নতুন চমক
‘ইন্ডিয়াজ গট ল্যাটেন্ট’-এর পাশাপাশি সময় রায়নার জন্য একটি নতুন কমেডি স্পেশালও তৈরি করছে নেটফ্লিক্স। এটি হবে নেটফ্লিক্স এক্সক্লুসিভ। নেটফ্লিক্সের তথ্য অনুযায়ী, নতুন স্পেশালে সময় রায়নার পরিচিত কৌতুক, গল্প বলার নিজস্ব ভঙ্গি এবং সমসাময়িক নানা বিষয় নিয়ে তাঁর পর্যবেক্ষণ তুলে ধরা হবে। নেটফ্লিক্সের পক্ষ থেকে আরও জানানো হয়েছে, বিভিন্ন ধরনের গল্প, নতুন ফরম্যাট এবং ভিন্নধর্মী সৃজনশীল কণ্ঠস্বর দর্শকদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার কৌশলের অংশ হিসেবেই সময় রায়নার সঙ্গে এই দীর্ঘমেয়াদি সহযোগিতা। তবে নতুন কমেডি স্পেশালটির নাম, ফরম্যাট বা মুক্তির তারিখ এখনো ঘোষণা করা হয়নি।
তারকায় ভরপুর প্রথম পর্ব
দ্বিতীয় মৌসুমের প্রথম পর্বে অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বলিউড অভিনেত্রী আলিয়া ভাট, শর্বরী বাগ ও কৌতুকশিল্পী আশীষ সোলাঙ্কি। এটি ছিল নেটফ্লিক্সে ‘ইন্ডিয়াজ গট ল্যাটেন্ট’-এর অভিষেক পর্ব। তাই প্রথম এপিসোড ঘিরে দর্শকদের প্রত্যাশাও ছিল অনেক বেশি। তবে পুরো পর্বের সবচেয়ে আলোচিত ব্যক্তি হয়ে ওঠেন এক প্রতিযোগী, যিনি ডোনাল্ড ট্রাম্পের অনুকরণে অভিনয় করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক ভাইরাল হন। অনেক দর্শকের মতে, তিনিই প্রথম পর্বের ‘শো-স্টিলার’। এদিকে পর্বের একটি মুহূর্তও নেটদুনিয়ায় আলোচনার জন্ম দেয়। দর্শক আসন থেকে এক ব্যক্তি নারীবিদ্বেষী মন্তব্য করলে আলিয়া ভাট সঙ্গে সঙ্গে প্রতিবাদ জানিয়ে বলেন, ‘কে বলল?’—এই প্রতিক্রিয়া সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক প্রশংসা পায়।
প্রশংসার পাশাপাশি সমালোচনাও
দ্বিতীয় মৌসুমের প্রত্যাবর্তনে ভক্তদের উচ্ছ্বাস থাকলেও প্রথম পর্ব নিয়ে মতভেদও দেখা গেছে। অনেক দর্শকের মতে, আগের তুলনায় অনুষ্ঠানটি কিছুটা বেশি পরিকল্পিত বা স্ক্রিপ্ট–নির্ভর মনে হয়েছে। আবার অন্যদের মতে, বিতর্কের পর আইনি ঝুঁকি মাথায় রেখে কিছু পরিবর্তন আনা স্বাভাবিক। সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে জানা গেছে, প্রথম মৌসুমের আইনি জটিলতার অভিজ্ঞতার পর এবার শোয়ের সঙ্গে একটি বড় আইনি দলও যুক্ত রয়েছে, যাতে ভবিষ্যতে সম্ভাব্য আইনি জটিলতা মোকাবিলা করা যায়। তবে অনেক দর্শক মনে করছেন, বিতর্কের পরও সময় রায়না শোটির মূল বিনোদনধর্মী আবহ ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছেন।
সময় রায়না: ক্যারিয়ারের পথচলা
সময় রায়না বর্তমানে ভারতের অন্যতম আলোচিত কমেডিয়ান ও কনটেন্ট নির্মাতা। তাঁর জন্ম ভারতের জম্মু ও কাশ্মীরে, একটি কাশ্মীরি পণ্ডিত পরিবারে। কৈশোরেই কমেডির প্রতি আগ্রহ তৈরি হয়। মাত্র ১৬ বছর বয়সে তিনি ইউটিউবে কমেডি ভিডিও প্রকাশ শুরু করেন। মহারাষ্ট্রের পুনেতে প্রিন্ট ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে ভর্তি হলেও পড়াশোনায় মন বসেনি। ২০১৭ সালের আগস্টে প্রথম ওপেন মাইক শো করেন। এরপর পুনেতে জনপ্রিয় কমেডিয়ানদের সঙ্গে নিয়মিত পারফর্ম করতে থাকেন। সহকর্মী কমেডিয়ান আকাশ গুপ্তর পরামর্শে তিনি কমেডি প্রতিযোগিতা ‘কমিকিস্তান’-এর দ্বিতীয় মৌসুমে অংশ নেন। সেখানে আকাশ গুপ্তের সঙ্গে যৌথভাবে বিজয়ী হয়ে জাতীয় পরিচিতি পান। কোভিড-১৯ মহামারির সময় স্ট্যান্ড-আপ শো বন্ধ হয়ে গেলে সময় রায়না ইউটিউবে দাবা (চেস) স্ট্রিমিং শুরু করেন। তিনি বিশ্বের অনেক খ্যাতিমান দাবাড়ুর সঙ্গে লাইভ স্ট্রিম করেন, তাঁদের মধ্যে ছিলেন বিশ্বনাথন আনন্দ, বিদিত গুজরাথি, ম্যাগনাস কার্লসেন, ভ্লাদিমির ক্রামনিক, জুডিত পোলগার, অ্যানিশ গিরি, তেমুর রাজাবভ। এ ছাড়া তিনি ‘কমেডিজ অন বোর্ড’ নামে অনলাইন দাবা টুর্নামেন্ট চালু করেন, যেখানে ক্রিকেটার যুজবেন্দ্র চাহালসহ বিভিন্ন তারকা অংশ নেন। ২০২৪ সালের জুনে সময় রায়না ‘ইন্ডিয়াজ গট ল্যাটেন্ট’ নামে একটি ট্যালেন্ট-ভিত্তিক কমেডি শো চালু করেন। প্রতিযোগীদের পারফরম্যান্স নিয়ে নির্মম, ডার্ক হিউমারধর্মী মন্তব্য এবং সেন্সরবিহীন পরিবেশের কারণে শোটি তরুণদের মধ্যে দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। এরপর তিনি একই নামে একটি অ্যাপও চালু করেন, যেখানে আনসেন্সরড কনটেন্ট প্রকাশ করা হতো। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে শোটির একটি পর্বে অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন রণবীর আল্লাহবাদিয়া। অনুষ্ঠানে তাঁর করা প্রশ্ন নিয়ে বিতর্ক শুরু হলে সময় রায়নাও সমালোচনার মুখে পড়েন। পুলিশ তদন্ত শুরু করে এবং শোটি ব্যাপক আইনি ও সামাজিক বিতর্কের মুখে পড়ে। যদিও বিতর্কিত মন্তব্যটি সময় রায়না করেননি, অনুষ্ঠানের সঞ্চালক ও নির্মাতা হওয়ায় তিনিও তদন্তের আওতায় আসেন। বিতর্কের আগে সময় রায়নার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক কোটিরও বেশি অনুসারী ছিল। তিনি ভারতের অন্যতম জনপ্রিয় ইউটিউব কমেডিয়ান ও লাইভ স্ট্রিমার হিসেবে পরিচিতি পান। তাঁর কমেডির বৈশিষ্ট্য ডার্ক হিউমার, তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া (ইমপ্রোভাইজেশন) এবং সেন্সরবিহীন উপস্থাপনা, যা বিপুল জনপ্রিয়তা এনে দেয়, তেমনি বারবার বিতর্কেরও জন্ম দেয়।



