শিল্পী মুস্তাফা মনোয়ারের সাথে শেষ সাক্ষাৎ: শিল্প, জীবন ও মানবিকতার অমৃত কথা
শিল্পী মুস্তাফা মনোয়ারের সাথে শেষ সাক্ষাৎ

বহুদিন ধরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেখছিলাম, শিল্পী মুস্তাফা মনোয়ার অসুস্থ। মনে হলো—যে মানুষটির এত বড় অবদান আমার জীবনে, তাঁকে যদি একবার কাছ থেকে না দেখি, তাহলে সারা জীবনের আক্ষেপ থেকে যাবে। যেভাবেই হোক, মানুষটিকে অন্তত একপলক দেখতে চাই।

সাক্ষাতের প্রস্তুতি ও অপেক্ষা

অনেক চেষ্টা করেও কোথাও স্যারের ঠিকানা বা যোগাযোগের নম্বর পেলাম না। হঠাৎ একদিন ফেসবুকে স্যারের কন্যা নন্দিনী আপুকে খুঁজে পেলাম। বিনয়ের সঙ্গে অনুরোধ করলাম। অবশেষে তিনি একদিন বললেন, সন্ধ্যার পরে চলে আসুন।

স্যারের সঙ্গে দেখা করতে যাওয়ার কথা শুনে আমার বন্ধুরাও আর নিজেদের সামলাতে পারল না। তারাও স্যারকে একবার দেখতে চাইল। অবশেষে আমরা চারজন রওনা দিলাম—শিল্পী আরাফাত করিম, আলোকচিত্রী আহমেদ আরিফ, চিত্রপরিচালক সোহেল মোহাম্মদ রানা ও আমি।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

সাক্ষাৎকার: মুস্তাফা মনোয়ারের সাথে অন্তরঙ্গ মুহূর্ত

৩ আগস্ট ২০২৫, সন্ধ্যা ৭টা। স্যারের বাসায় পৌঁছালে নন্দিনী আপু আন্তরিকভাবে আমাদের বসালেন। কিছুক্ষণ পর পাশের একটি ঘরে নিয়ে গেলেন। দরজা খুলতেই আমরা স্তব্ধ। সামনে মেডিকেল বেডে শুয়ে আছেন আমাদের প্রিয় মুস্তাফা মনোয়ার স্যার। কী করব বুঝে উঠতে পারছিলাম না। ঠিক তখনই স্যার বললেন, দাঁড়িয়ে কেন? ভেতরে এসো।

ভয়ে ভয়ে কথা শুরু করলাম; কিন্তু আশ্চর্য হয়ে দেখলাম, আমাদের দেখে স্যার যেন ভীষণ খুশি। মনে হলো যেন তিনি আমাদের অপেক্ষাতেই ছিলেন। আমার হাত ধরে বললেন, কী গল্প করতে চাও? বলো। আমি তো আনন্দে আত্মহারা।

প্রশ্ন: আপনার ‘মন্টু’ নামটি কে দিয়েছিলেন?

স্যার একটু অবাক হয়ে তাকালেন। নন্দিনী আপুও জানতে চাইলেন—বাবা, নামটি কে দিয়েছিলেন? স্যার হেসে বললেন, বুবু দিয়েছিল। মানে তোমার ফুপু।

প্রশ্ন: রক্তকরবী নিয়ে সত্যজিৎ রায় প্রশংসা করেছিলেন। এরপর কি আবার চলচ্চিত্র নির্মাণের ইচ্ছা হয়েছিল?

— হ্যাঁ, হয়েছিল।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

প্রশ্ন: কাজের মৌলিকতা আর নিজস্ব স্টাইল কতটা জরুরি?

— মৌলিকতার মূল বিষয় হলো মনের ভেতরের ভাবনার প্রতীক। সেই প্রতীকগুলোকে ধরে রাখতে হয়।

প্রশ্ন: মুক্তির গান নির্মাণ করতে গিয়ে কোনো বাধা এসেছিল?

— এগুলো কখনোই কেয়ার করিনি। এগুলো তো থাকবে; কিন্তু অতিক্রম করে এগিয়ে গেছি।

প্রশ্ন: সবাই শুধু শিশুদের শেখাতে চায়, শিশু কী ভাবে; তারা কীভাবে কল্পনা করে।

— দেখো শিল্প হবে সহজ, সহজীকরণ তো করে বোঝানোর দরকার নেই শিশুদের মতো।

প্রশ্ন: একজন শিল্পীর ভালো মানুষ হওয়া কতটা জরুরি?

— একজন শিল্পী ভালো মানুষ হবে—এটাই সত্য।

প্রশ্ন: শিল্পের ভাবনা কীভাবে আসে?

— মনের ক্যামেরাটা সব সময় সচল রাখতে হবে। নিজের মনের ওপর বিশ্বাস রাখতে হবে। এটা আমি জোর দিয়ে বলতে পারি।

প্রশ্ন: শুনেছি, আপনি অঙ্কে ৪ পেয়েছিলেন। একজন শিল্পীর কি খুব ভালো ছাত্র হওয়া জরুরি?

— ইচ্ছাটা থাকা জরুরি। ভালো ছাত্র তারাই হবে, যারা ভালো শিল্পী হবে।

প্রশ্ন: রং কীভাবে দেখতে হয়?

স্যার হেসে বললেন, রঙের মতো সহজ কিছু নেই। যে রং আমি ব্যবহার করব, সেটাই আমার রং। নিজের মতো করে ব্যবহার করতে হবে।

এ সময় বন্ধুরা ইশারা দিচ্ছিল—স্যার অসুস্থ; আর বিরক্ত করা ঠিক হবে না। আমি চুপ হয়ে গেলাম। কিন্তু স্যার নিজেই বললেন, চুপ কেন? বলো, কী জানতে চাও? আমি আবার প্রশ্ন শুরু করলাম।

প্রশ্ন: কী ধরনের কবিতা বা উপন্যাস আপনাকে প্রভাবিত করেছে?

— ছোটবেলা থেকেই অনেক ধরনের লেখা পড়তাম। এখনো পড়তে ভালো লাগে। একজন শিল্পীর সব ধরনের শিল্প ও সাহিত্য সম্পর্কে জানা দরকার।

প্রশ্ন: পঞ্চকবি আপনাদের বাসায় আসতেন। যদি তাঁদের কথা কিছু বলতেন?

স্যার কিছুক্ষণ স্মৃতিতে ডুবে থেকে বললেন, হ্যাঁ বাবার কাছে আসতেন।

প্রশ্ন: কোনো শিল্পমাধ্যমে কাজ করতে না পারার আক্ষেপ আছে?

— হ্যাঁ, আছে। হয়তো আরও অনেক কিছু করা যেত।

প্রশ্ন: এত ব্যস্ত জীবনের মধ্যেও পরিবারকে কীভাবে সময় দিতেন?

এই প্রশ্নে স্যার শুধু মুচকি হেসেছিলেন।

প্রশ্ন: নতুন যারা পাপেট নিয়ে কাজ করতে চায়, তাদের জন্য আপনার পরামর্শ?

— আনন্দ নিয়ে কাজ করতে হবে।

এরই মধ্যে অনেক রাত হয়ে গেছে। সবাই তাড়া দিচ্ছে; কিন্তু আমার যেন উঠতেই ইচ্ছা করছে না। মনে হচ্ছিল, এই গল্পের কোনো শেষ নেই। বিদায় নিয়ে বেরিয়ে এলাম। মনে মনে বললাম, আবার দেখা হবে, সব্যসাচী শিল্পী মুস্তাফা মনোয়ার স্যার।

আমার মনের কথা কোনো দিনই শেষ হবে না। আপনি, আপনার শিল্প, আপনার জীবনদর্শন আর আপনার অসাধারণ মানবিকতা দিয়ে আমাদের হৃদয়ে চিরদিন বেঁচে থাকবেন স্যার।