সতীর্থ কবিদের টিটকারি গায়ে জ্বালা ধরানোর জন্য যথেষ্ট— ‘কীরে মিজানুল হক, এত বছর লিখে কোন ফায়দাটা হলো, যদি ঈদসংখ্যায় কবিতা ছাপা না হয়?’ দোষ আমার কিছুই নেই। যা আছে সবই গুণ, গুণে গুণারণ্য। নিজ কাব্যমালঞ্চের আমিই তো অধিপতি। ঈদসংখ্যার সম্পাদকরা যদি কবিতা না চান, উপযাচক হয়ে কবিতা পাঠিয়ে দিলেও তারা গ্রহণ না করেন— আমি কী করতে পারি? শুধু এবার নয়, প্রত্যেক বছরই চেষ্টা করেছি ঈদসংখ্যাগুলোতে কবিতা প্রকাশ করার।
ঈদসংখ্যায় কবিতা প্রকাশের চেষ্টা ও ব্যর্থতা
কোরবানির সময় অনেকেই চায় মোটা-তাজা গরুটা তাদের হোক। তাতে গরুর সঙ্গে সেলফি তুলতে আরাম, গরুর গায়ে হেলান দিয়ে কুলফি খেতেও মজা। খুব বেশি উচ্চাভিলাষী কেউ কেউ গরুর পিঠেও পড়ে বসেন। ঘোড়ায় বসার বিকল্প স্বাদ পান হয়তো। এসব যেমন নিজেদের গরিমা তথা স্ট্যাটাসবান্ধব, ঈদসংখ্যায় লেখা প্রকাশ পাওয়াটাও তেমনই স্ট্যাটাস অনুকূল বিষয়। নিজের মধ্যে বড় কবির একটা ফিলিং চলে আসে। দেশে গুণীর কদর নেই বলে আমার মতো তরুণ কবিকেও এমন অমর্যাদাকর পরিস্থিতিতে পড়তে হয়। কেউই কবিতা প্রকাশ করতে চায় না।
গত মাসে গিয়েছিলাম দৈনিক অপরাধ বাংলার সাহিত্য সম্পাদক মোহন মোকাদ্দেম ভাইয়ের কাছে। নতকণ্ঠে বলেছি, ‘গুরু, ঈদসংখ্যার জন্য একটা কবিতা এনেছি। জাদুবাস্তবতা-পরাবাস্তবতা থেকে শুরু করে সমকালীন বাস্তবতা সবই রেখেছি এতে। গোলা-বারুদে ঠাসা। পড়ে দেখবেন, প্লিজ!’ মোকাদ্দেম ভাই ঠোঁট বাঁকিয়ে প্রশ্ন করেছেন, ‘তোমার বয়স কত হলো হে?’ বয়স আমার কম হয়নি। যদিও সাহিত্যামোদী লোকজন তরুণ কবি বলে, তার মানে এটা নয় নাক টিপলে শিকনি পড়বে। সবচেয়ে বড় কথা, বয়স দিয়ে কি আর কবিত্ব নির্ণয় করা যাবে? যদি যেত, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যদি হন বিশ্বকবি তার বাবাকে নিশ্চয়ই আমরা মহাবিশ্ব কবি হিসেবে পেতাম। সেটা তো হয়নি। এমনকি আমার বাবাও কবি হতে পারেননি। কোনোদিন কাগজে তার নাম ছাপা হয়নি। অনামা কোনো অনলাইন পোর্টালের ধারে-কাছেও যেতে পারেননি তিনি।
সাহিত্য সম্পাদকদের প্রত্যাখ্যান
মোকাদ্দেম ভাইয়ের অসম্মতি উৎপাদন তথা বাধা পেয়ে গেলাম সাপ্তাহিক গণমনতন্ত্র অফিসে। সাহিত্য সম্পাদক কুব্বাত আহসানকে প্রস্তাব দিলাম, ‘ঈদসংখ্যার জন্য ফাটাফাটি একটা কবিতা এনেছি, বস। দিয়ে যাই?’ তিনি ভ্রূ কুঁচকে প্রশ্ন করলেন, ‘তোমার সাহস তাহলে ঈদসংখ্যা পর্যন্ত পৌঁছে গেছে! এখানে কাদের কবিতা ছাপা হয় কোনো ধারণা আছে?’ ‘না তো, গুরু! তারা কোন দেশের কবি?’ ‘যাদের বয়স অন্তত পঞ্চাশ পেরিয়েছে। তোমার তো এখনো ঈদগাহে বেলুন ফোলানো, বাঁশি বাজানো আর চকলেট চোষার বয়স। আর দেশ নিয়ে কথা বলার আগে ম্যানার শেখো। ভুলভাল কবিতা লেখার চেয়ে এটাই তোমাদের জন্য বেশি জরুরি।’ নীরবে অপমানটুকু হজম করলাম।
গত সপ্তাহেই ষাটের দশকের কবি বিপুলা দত্ত-এর কবিতার পাশে আমার কবিতা প্রকাশিত হয়েছে। এর আগে সত্তরের দশকের ইসমাইল ইয়াকিনের কবিতার নিচে ছাপা হয়েছিল। ঈদ এলেই কেন তবে বয়সের হিসাব আসে! মিজানুল হককে চেনে না, জানে না সাহিত্যজগতে এমন ক’জন আছে? সেই আমাকেও কিনা ঈদসংখ্যায় কবিতা ছাপানোর জন্য অগ্নিপরীক্ষা দিতে হচ্ছে। অকূল মহাসাগরে ভাসন্ত অবস্থায় দেখতে হচ্ছে নিজের কবিসত্তাকে। এটাকে কী বলব— জলপরীক্ষা?
নিজস্ব অনলাইন ঈদসংখ্যা প্রকাশের সিদ্ধান্ত
বিশ রমজানের পর একের পর এক ঈদসংখ্যা প্রকাশিত হতে থাকে। এসব দেখে বুকে যেন ভারী পাথর আছড়ে পড়ে। কোনো কাগজেই মিজানুল হক নেই। কোথাও পেলাম না প্রতিভার দামটা! অথচ আমার চেয়ে কম বয়সী ছেলে-মেয়েদের কবিতাও ছাপা হচ্ছে। তাদের সক্ষমতা কী, আমার অক্ষমতা কোথায়? কবিরাজ্য একইসঙ্গে উদ্ভট ও অদ্ভুত, এখানে সদুত্তর মেলে না। সিন্ডিকেটের বাইরে কেউ কারও সঙ্গে চা পান দূরে থাকুক, একগ্লাস জল পর্যন্ত ছোঁয় না।
অনেক ভেবে সিদ্ধান্ত নিলাম— নিজেই এবার ঈদসংখ্যা প্রকাশ করব। অনলাইন ঈদসংখ্যা। ঈদের সকাল থেকে ঘণ্টায় ঘণ্টায় নিজের নানামাত্রিক লেখা আপলোড করতে থাকব। ঈদসংখ্যাটা হবে বিষয়বৈচিত্র্যে পরিপূর্ণ। একের ভেতর সব। পাঁচ লাইনে কবিতা, সাড়ে আঠারো শব্দে গল্প। একশ শব্দে উপন্যাস। ছাপ্পান্ন শব্দে প্রবন্ধ। সাতান্ন শব্দে চিত্রকলা সমালোচনা। বাইশ শব্দে স্মৃতিচারণ। আটাশ শব্দে ঈদকেন্দ্রিক সংস্কৃতি। সম্পূর্ণ বিনামূল্যের (এমবি ও আপাত অমূল্য সময়ের কথা বাদ দিলে) ঈদসংখ্যাটা নিশ্চয়ই অন্যরকম আমেজ বয়ে আনবে। আমার দেখাদেখি অন্য কবিরাও স্বসম্পাদিত ঈদসংখ্যা (অনলাইন) প্রকাশে ব্যাপক গণজোয়ার সৃষ্টি করবে...
ঈদের আরও কিছুদিন বাকি আছে। সেই চেষ্টা পরে করা যাবে। আপাতত সম্ভাব্য আরও কয়েকটা জায়গায় নক করে দেখি। বলা তো যায় না, লটারির টিকিটের মতো লেগেও যেতে পারে।
গদ্য লেখার অনুরোধ ও দ্বিধা
পর্যাপ্ত পরিমাণের টক-ঝাল ও কড়া নুন মিশিয়ে নতুন একটা কবিতা লিখলাম। হাজির হলাম মাসিক উপকণ্ঠায়ন ম্যাগাজিন সম্পাদক মতিন মিনহাজের কাছে। কবিতার জায়গায় কবিতা পড়ে রইল, মূল পত্রিকা কাম সাহিত্য সম্পাদক মতিন মিনহাজ বললেন, ‘হিশামউদদিন তালুকদার : জীবন-কর্ম ও সাহিত্যপ্রতিভা’ শিরোনামে একটা লেখা লিখতে পারবে?’ দ্বিধান্বিত কণ্ঠে বললাম, ‘এসব লেখা কি ঠিক হবে? আমি মূলত একমাত্র কবি। জানেনই তো কবিতা কখনো সতীন পছন্দ করে না। গদ্য হচ্ছে কবিতার সতীন। তাই আমি কবিতা লিখি না। মনে-প্রাণে ধনে-মানে কবিই হতে চাই।’
‘কী আবোলতাবোল বকছ! সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, আল মাহমুদ, সৈয়দ শামসুল হক কি কবি হিসেবে ফেলনা? এরাও প্রচুর গদ্য লিখেছেন। কবি হিসেবেও শীর্ষস্থানে আছেন। গদ্য তাদের কবিসত্তায় বিন্দুমাত্রও আঁচড় ফেলতে পেরেছে?’ ‘তারা বড় শিল্পী। উদাহরণকে অতিক্রম করে যেতে পারা মনীষীর কাজ।’ ‘তুমিও একদিন বড় হবে। আজীবন তরুণ কবি থেকে যাওয়ার সুযোগ নেই। ভুলে যাচ্ছ কেন, আমি হচ্ছি ক্রেন। কাউকে সমতল থেকে হিমালয়চূড়ায় তুলে দেওয়াই আমার কাজ। এই দুই হাতে হাজারে হাজারে লেখক-কবি সৃষ্টি করেছি, তুমি জানো না? যদিও অন্যদের বানাতে গিয়ে আমি নিজেই উল্লেখযোগ্য সাহিত্যিক হয়ে উঠতে পারিনি। মনে করো না এটা আমার বিনয়। এটাই কিন্তু শাশ্বত সত্য।’ বলতে বলতে রাঙা মেহেদির বিজ্ঞাপনের মতো হাত দুটো উঁচু করে তালু দেখালেন মতিন মিনহাজ।
এমন কথায় আমি খুশি হয়ে যাই। বলি, ‘সত্য বলছেন ভাইয়া? আমাকে সৈয়দ শামসুল হক বানিয়ে দিতে পারবেন?’ “তো আর বলছি কী! ভবিষ্যতে তোমার পদ-পদবি লিখতে চাই ‘ভিন্নধর্মী কবি ও বহুমাত্রিক লেখক’ হিসেবে। এভাবেই নিজের নামের সঙ্গে মাত্রা যোগ করতে হবে, পালক জুড়ে দিতে হবে।” ‘আচ্ছা। আমি হিশামউদদিন তালুকদারকে নিয়ে লেখার যথাসাধ্য চেষ্টা করব। তিনি এখন কোন শিল্প গ্রুপের চেয়ারম্যান?’ ‘ইন্ডাস্ট্রি খোঁজো কেন? তুমি খুঁজবে আর্ট। হিশামউদদিন তালুকদারের সাহিত্যকর্মের স্বরূপ অন্বেষণ করবে। ব্যক্তি হিশামের হিসাব এখানে গৌণ। কোনো ইন্ডাস্ট্রিই কিন্তু আজীবন টিকে থাকে না। কিন্তু চর্যাপদ বা উন্নত শিল্প কখনো হারিয়ে যায় না।’ ‘আমার কবিতাটা কিন্তু রেখে গেলাম। সামলে রাখুন।’ ‘আচ্ছা। সময় করে আমি দেখব।’
গদ্য লেখার সংকট ও প্রবীণ কবির সাক্ষাৎ
লোভে পড়ে কথা দিয়েছি, লিখব। কিন্তু লিখতে পারছি কই! একজন যথার্থ কবি কি পারে স্বতঃস্ফূর্তভাবে গদ্য লিখতে? আমার রাত কাটে না, দিন কাটে না। মাথার চুল ছিঁড়ি। ভাব ও ভাষা কোথায় যে লুকিয়ে গেল। এদিকে লেখা জমা দেওয়ার সময়ও ঘনিয়ে আসছে। বাধ্য হয়ে উঁকি দিলাম ষাটোর্ধ্ব কবি ও প্রাবন্ধিক মানসুরুজ্জামানের ঘরে। মানসুরুজ্জামান আমার কথা ভালোভাবে না শুনেই আক্ষেপ করে বললেন, ‘আমার কবিতা কেন ছাপা হয় না? সাহিত্য সম্পাদকরা তাহলে কাদের কবিতা ছাপে?’ থতমত খেয়ে বললাম, ‘নিশ্চয়ই দেশের কবিদের কবিতাই ছাপা হয়। কলকাতার কবিদের কবিতা ছাপা হয় কালে-ভদ্রে। আর বাংলাভাষী কতিপয় প্রবাসী কবি তো থাকবেনই।’ ‘তাহলে আমার কবিতা কই! আমার উৎকৃষ্ট প্রবন্ধও ছাপে না কেন? এরা কি জন্ম থেকে মৃত্যু অবধি স্বজনপ্রীতিই করে যাবে! আর ছাপার অভাবে ধুঁকে ধুঁকে মরবে আমার মতো বয়োজ্যেষ্ঠ সাহিত্যিকরা? তোমার মতো সম্ভাবনাময় তরুণরা তড়পাবে একাকী! সবাইকে সমান সুযোগ দিতে হবে। তবেই না গণতন্ত্র, সাম্য ও স্থিতিশীলতার জয় হবে।’
আমি তো এসেছিলাম নিজের কবিতা প্রকাশের ব্যবস্থা করতে। সেটার জন্য আমাকে একটা গদ্য লিখে ধৈর্য ও প্রতিভার পরীক্ষা দিতে হবে। মানসুরুজ্জামান ভাইয়ের হাপিত্যেস শুনলে চলবে কেন? তিনি আমার কোনো কথাই শুনতে চাচ্ছেন না। গাইডলাইন দেওয়া দূরে থাকুক। উপদেষ্টার লাইন থেকে সরে গিয়ে একনাগাড়ে বিষোদগার করেই যাচ্ছেন। কোনো কবিন্ধিক (কবি+প্রাবন্ধিক) এমন হয়? আগে কখনো দেখিনি। এমন কবিন্ধিকের কাছে আসাই ভুল হয়েছে। তার কথার মাঝখানে বলে উঠলাম, ‘আমি তাহলে যাই।’ ‘যাই মানে! তুমি কি এই সমস্যার সুরাহা চাও না?’ ‘নিশ্চয়ই চাই। কোনো একদিন আমরা জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে মানববন্ধন করব। কবিতা প্রকাশ আমাদের সুযোগ নয়— অধিকার। আপনিও পরিচিত সাংবাদিক ও ফেসবুক অ্যাকটিভিস্টদের বলে রাখুন।’ ‘ভালো প্রস্তাব দিয়েছি। একটু পরে যাও। তোমার ভাবি চা বানাচ্ছে। এই ফাঁকে নতুন একটা কবিতা শোনাই তোমাকে।’ ডাইরি খুলে মানসুরুজ্জামান ভাই পড়লেন— বাসনা কি তবে বাইম মাছ জেগে উঠবে ফের পুনর্বার জমাট জল সরে মাটি শুকালে মাথা তুলবে অতল পরিধি কামনা তবে বাসনা-গোত্রীয়... কীভাবে বলি, কবিতাটা ভালো লাগেনি। পাঠক হিসেবে কবি মিজানুল হক অত কাঁচা নয়। বাসনার সঙ্গে কামনার সম্পর্ক থাকতে পারে কিন্তু বাইম মাছের কী! বুড়ো-হাবড়া কবিরা আজকাল কবিতার নামে যে কীসব পয়দা করে চলছে বুঝি না ছাই। তবু হাসি হাসি মুখ করে বলি, ‘চমৎকার লিখেছেন, ভাই। এই কবিতা ঘরে ঘরে পঠিত হওয়া উচিত। আমার সামর্থ্য থাকলে এটাকে বিশ্বের দুইশ ভাষায় অনুবাদ করিয়ে সব শ্রেণির মানুষকে পড়ানোর ব্যবস্থা করতাম।’
মানসুরুজ্জামান খুশি খুশি গলায় বললেন, ‘অথচ দ্যাখো, এই কবিতা যদি আমি কোনো জাতীয় দৈনিকে পাঠাই, ওরা প্রকাশ করবে না। দুঃখের বিষয় কী জানো, আজকাল কম বয়সী ছেলে-ছোকরা সাহিত্য সম্পাদকরা না বোঝে কবিকে, না বোঝে কবিতা। অথচ ভাবখানা ধরে রাখে— সব জানে, সমস্ত কিছু বুঝে ফেলেছে!’ এবার বোধহয় কথাটা পড়ার সময় এসেছে। সহমত জানিয়ে বলি, ‘ঠিক বলেছেন, ভাই। আমি একটা গদ্য লিখতে চাচ্ছি। কীভাবে লিখতে হয় জানি না। তাই পরামর্শের জন্য আপনার কাছে ছুটে এসেছি।’ ‘কেমন গদ্য?’ ‘বিষয় : হিশামউদদিন তালুকদার : জীবন-কর্ম ও সাহিত্যপ্রতিভা।’ ‘খবরদার, এসব ঊনকবি ও অলেখকদের কাজ। তুমি সম্ভাবনাময় একজন কবি। ভবিষ্যতে নিশ্চয়ই হিরণ্ময় হিমাংশু-এর মতো বড় কবি হতে পারবে। তুমি কেন এসব ছাতামাতা লিখতে যাবে!’ ‘মতিন মিনহাজ ভাই আমাকে বিশেষভাবে অনুরোধ করেছেন লেখাটা লিখতেন। তার ধারণা এটা আমিই সবচেয়ে ভালো লিখতে পারব।’ ‘মতিন ব্যাটার কাজ নিজেই করুক না হায়/সেটা করা কি মিজানুল হকের শোভা পায়!’ মনে পড়ল লেজ-কাটা সেই শিয়ালের গল্প। মানসুরুজ্জামানের লেখা কেউ ছাপে না। তাই আমার লেখাজোখা ছাপা হোক এটাও তিনি চান না। তাকে আশ্বস্ত করার জন্য বলি, ‘ঠিক আছে, ভাই। লিখব না।’ কিন্তু চা কোথায়, আসছে না কেন? দীর্ঘ একঘণ্টা বকবকানি শোনার পর জানতে হলো ভাবি বাপের বাড়িতে বেড়াতে গেছেন!
ঈদসংখ্যার ডেডলাইন ও ফেসবুকে ক্ষোভ
ঈদ এগিয়ে আসছে। ঈদসংখ্যা প্রকাশ করার সময় নিশ্চয়ই বেশি নেই। এদিকে আমি তিনটা লাইনও লিখতে পারিনি। শুধু ‘হিশামউদদিন তালুকদার ভালো মানের একজন সাহিত্যিক। তিনি একজন মানবিক মানুষ’ বাক্য দুইটা হাজার হাজারবার লিখে যদি লেখাটা শেষ করার সুযোগ থাকত তাহলে নিশ্চয়ই কামিয়াব হতাম। কিন্তু তা তো আর হওয়ার নয়। আমাকে ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করতে হবে সেটাই— যা আমি জানি না, বুঝিও না। আমাকে ওসব টানেও না, ছাই।
এদিকে লেখাটা জমা দেওয়ার ডেডলাইনও কাছিয়ে আসছে। শেষমেশ নিজের ব্যর্থতা স্বীকার করে নিয়ে সভয়ে কল করলাম মতিন মিনহাজকে— ‘ভাই, লেখাটা বোধহয় আমার দ্বারা হবে না।’ তিনি কড়া গলায় বললেন, ‘বোধহয় বলছ কেন? বল হ্যাঁ অথবা না।’ ‘আমি পারছি না, ভাই। প্রবন্ধ লেখা খুব কঠিন কাজ। আমার কবিতাটা দেখবেন, প্লিজ।’ ‘আমি জানতাম, শেষ মুহূর্তে তুমি এমন একটা ভজঘট পাকাবে। অথর্ব কোথাকার! তোমার কবিতা দেখেছি। ওসব এখন চলে না। শুধু মাত্রাজ্ঞান থাকলেই হয় না, কাণ্ডজ্ঞানও থাকতে হয়। এসে নিয়ে যেও।’ আহারে কবিতা, কোথাও তোর জায়গা নেই। তুই এতিম— পিতৃ-মাতৃহীন।
আমাদের মতো সুযোগবঞ্চিত কবির সর্বশেষ ভরসা ফেসবুক। নিজেদের না পাওয়ার গ্লানি, অতৃপ্তি এখানেই ঝেড়ে দিই। এছাড়া কী অস্ত্র আছে আমার, আমাদের! অনেকেই ফেসবুকে ঈদসংখ্যা নিয়ে বিষোদগার করে। প্রায় প্রত্যেকের উন্মুক্ত ডাইরি ও মুক্তমঞ্চ এই ফেসবুক। যাপিত জীবনের জ্বালা-যন্ত্রণা, অপ্রাপ্তি-হতাশা ঢেলে ঢেলে দেওয়া যায় মার্ক জুকারবার্গের ঘাড় বরাবর। ক্ষোভ ঝেড়ে দিয়ে নিজেদের হালকা করি, অন্যের মনোযোগও আকর্ষণ করি। কেউ কেউ কটাক্ষ করে এটাকে ফেসবুক বিপ্লব বলে বটে। তবে আমরা জানি, এমবি ছাড়া বিপ্লব সংঘটিত হয় না। বিদ্যুৎও জরুরি উপাদান বটে।
হ্যাঁ, আমরা সম্পাদক গোষ্ঠীকে জ্ঞানদান করার অধিকার রাখি। দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বলে দিতে পারি, কী তাদের করণীয়; কেন তারা সেটা করছেন না; কী তাদের অপরাধ। ঈদসংখ্যা প্রকাশিত হয়, ফেসবুকে বা পত্রিকায় সেটার ঘোষণা দেওয়া হয় না কেন? কেন গোপনে তাদের কাছের মানুষদের আর তথাকথিত বরেণ্য লেখকদের ভূষিমাল নিয়ে ‘গোপন সংখ্যা’ প্রকাশ করা হয়। এসবের অনুমোদন দেয় কে? দেশে কি আইন, বিচার, মানবতা কিছুই নেই!
জ্বালাময়ী ভাষায় স্ট্যাটাস দেওয়ার জন্য আমি ১৫ টাকায় তিনদিনের সংক্ষিপ্ত এমবি (মিনি)প্যাক কিনে নিলাম। ডাটা সচল হলে লিখলাম— ‘ঈদসংখ্যা নয়, এসব বাণিজ্যিক ও তেলা মাথায় তেল দেওয়া পন্থাকে আমি ও আমরা অশুভ সংখ্যা হিসেবে আখ্যায়িত করতে চাই। আজ পর্যন্ত কোনো ঈদসংখ্যাই কি পেরেছে বাংলা সাহিত্যকে একচুল পরিমাণও এগিয়ে নিতে? পারেনি। তাহলে আমরা কেন ঈদসংখ্যার জন্য এতটা লালায়িত হবো? কষ্টার্জিত টাকায় কেন কিনব, সময় নষ্ট করে কেন পড়ব! আর যেসব অসাধু সম্পাদক ওই পদ দখল করে বসে আছেন, তাদের বলছি— আপনাদেরও একদিন জবাবদিহি করতে হবে। কাদের লেখা প্রকাশ করেন আপনারা— অফলাইনে ও অনলাইনে? প্রকৃত মেধাবীদের মূল্যায়ন না হলে তারা যে মনে কষ্ট পায় এটা বুঝতে পারেন না কেন? সত্যি বলতে কী, তথাকথিত এসব ঈদসংখ্যা নিয়ে আমার একবিন্দু আগ্রহও নেই।’
প্রভূত আনন্দ পেলাম ক্ষোভটা ঝাড়তে পেরে। এই স্ট্যাটাস সাহিত্য সম্পাদকরা দেখবে না? যারা আমাকে তাচ্ছিল্যভরে প্রত্যাখ্যান করেছে তাদের চোখে পড়বে না? সবাই দেখুক, আমার কী যায়-আসে। কারও ধার ধারি নাকি! কী আশ্চর্য, বৃষ্টিফোঁটার মতো লাইক-কমেন্ট পড়তে থাকল। দুই মিনিটে হাজারখানেক লাইক আর শ’য়ের বেশি কমেন্ট পড়ে গেল। আর শেয়ার? যতবার গুনতে যাই, পরক্ষণে আরও দুইটা শেয়ার বাড়তি যুক্ত হয়। পরক্ষণে আরও কয়েকটা...
সময়মতো নিদ না গিয়ে আমরা কাব্য রচনা করি। ঈদের চাঁদে খুশি খুঁজি না, সেটা খুঁজে পাই ঈদসংখ্যা ও পত্রিকার পাতায়। অথচ বিনিময়ে মেলে না কিছুই। কবিতা ছাপা হয় না। কালে-ভদ্রে দুই একটা ছাপা হলেও কর্তৃপক্ষ না দেয় সম্মানী, না দেয় একটা চকলেট বা শিঙাড়া। সম্মান তো দেয়ই না। আমরা, কবিরা কি মরা গাঙে ভেসে এসেছি!
আমাদের সম্মিলিত সীমাহীন জিদের কাছে তছনছ হয়ে যাবে সিন্ডিকেটবাদী ওইসব সাহিত্য ও তস্য বিভাগীয় সম্পাদককুল। কোন মেধাবী সাহিত্যিক যেন বলেছিলেন, থাকিতে আপন হস্ত/ কেন হবো নারীর দ্বারস্থ। তেমনি আমরাও ফেসবুক থাকতে কেন অন্যের দ্বারস্থ হবো, বিশেষ করে ঈদসংখ্যায় লেখা প্রকাশের ক্ষেত্রে। ঘোষণাটা আগামীকালই দিয়ে দেব। ঈদের দিন সকাল থেকে ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হবে মিজানুল হক একক ঈদসংখ্যা। নানা স্বাদের লেখা ও আঁকায় ভরপুর!



