বিশ্বকাপের মঞ্চে বন্ধুত্বের অমর গল্প
বিশ্বকাপের মঞ্চে বন্ধুত্বের অমর গল্প

শৈশবে বন্ধুদের সঙ্গে ফুটবল খেলার স্মৃতি মনে পড়ে। সন্ধ্যা নামার আগে পাড়ার মাঠের ধুলোয় একটা বিশেষ আলো থাকে। পশ্চিমের রোদ যখন পুকুরপাড়ের গাছগুলো পেরিয়ে নিচে নেমে আসে, সেই ধুলো তখন সোনালি হয়ে ওঠে। দূরে কোনো বাড়ি থেকে নাম ধরে ডাক আসে।

প্রথম বলটি ছিল জাম্বুরা

সেই ধুলোর মধ্যে আমাদের প্রথম লাথি দেওয়া বলটা কিন্তু ফুটবল ছিল না; ছিল একটা জাম্বুরা। ধুলোমাখা কয়েক জোড়া পা, আর গোল খেয়ে হেরে যাওয়ার পর কাঁধে রাখা পরম ভরসার কোনো হাত।

সেই মাঠে কোনো জাতীয় পতাকা ছিল না। দুজোড়া স্যান্ডেল ছিল গোলপোস্ট। বিকেল ফুরিয়ে সন্ধ্যা নেমে আজানের শুরু হলো শেষ বাঁশি। ওই মাঠে যে দৌড়াতে পারত না, তাকে গোলকিপার বানানো হতো। আর যে হারলে ঠোঁট ফুলিয়ে বাড়ির দিকে হাঁটত, তাকে ফিরিয়ে আনত সবাই। সে চলে গেলে একটা জায়গা তো ফাঁকা পড়ে থাকে।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

বন্ধুত্বের প্রথম ভাষা

ওই মাঠেই হয়তো আমরা প্রথম শিখেছিলাম, বল একা নিয়ে বেশি দূর যাওয়া যায় না। সামনে কেউ দাঁড়িয়ে থাকলে পাস দিতে হয়। কেউ পড়ে গেলে হাত বাড়াতে হয়। কেউ ভুল করলে তার ওপর রাগ করা যায়; কিন্তু পরের বলটা তাকেই দিতে হয়। আর হারার পর বাড়ি ফিরতে হয় একই পথে। অন্ধকার নামলে কেউ একা একা ফিরতে পারে না।

বন্ধুত্বের প্রথম ভাষা সম্ভবত—‘তোকে বলটা দিচ্ছি, কারণ বন্ধু আমি তোকে বিশ্বাস করছি!’

বয়স বাড়ার সঙ্গে বন্ধুত্বের পরিবর্তন

তারপর বয়স বাড়ে। জাম্বুরা বদলে সত্যিকারের বল আসে; পাড়ার মাঠ সরে গিয়ে বসে টেলিভিশনের পর্দায়। বন্ধুরা ছড়িয়ে যায়—কেউ চাকরিতে, কেউ অন্য শহরে, কেউ অন্য দেশে, কেউ সংসারে। পুরোনো মেসেঞ্জার গ্রুপগুলোতেও আর নোটিফিকেশন আসে না। কিন্তু বিশ্বকাপ এলে কোনো এক গভীর রাতে সেখানে হঠাৎ একটি মেসেজ! ‘চল, আজ খেলা দেখি একসঙ্গে।’

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

এই ছোট্ট ডাকে পেরিয়ে যায় কতগুলো বছর, বহুদিনের না দেখা হওয়ার দূরত্ব ঘুচে যায় লহমায়। কেউ জার্সি পরে আসে, কেউ চা বানায়, কেউ বিরিয়ানি আনতে ভুলে যায়, কেউ বলে এবার আর রাত জাগবে না। তারপর শেষ বাঁশি পর্যন্ত সবার চোখ পর্দায় আটকে থাকে। যে বন্ধু শৈশবে সবচেয়ে বেশি অফসাইডে দাঁড়িয়ে থাকত, সে এখন হয়তো ব্যাংকের কর্মকর্তা; যে গোলকিপার হতে রাজি হতো না, সে হয়তো সন্তানকে ঘুম পাড়িয়ে খেলা দেখতে আসে। বিশ্বকাপ তাদের আবার একই সোফায় বসায়। খেলাটি দূরের কোনো দেশে হয়, কিন্তু হঠাৎ আমাদের এই ছোট্ট ঘরে ফিরে আসে সেই পাড়ার মাঠ, সেই ধুলো, সেই বিকেল, চিরচেনা সেই বন্ধুরা।

বিশ্বকাপের মঞ্চে বন্ধুত্বের অমর উদাহরণ

২০১০ সালের ১১ জুলাই, জোহানেসবার্গের শীতের রাত। বিশ্বকাপ ফাইনাল অতিরিক্ত সময়ে ঢুকে গেছে। চারদিকে এত আলো, এত মানুষ, এত অপেক্ষা—মনে হচ্ছিল একটি গোটা দেশের শ্বাস যেন আটকে আছে মাঠের ঘাসে। সেস ফ্যাব্রেগাসের পাস থেকে আন্দ্রেস ইনিয়েস্তা বলটি নিয়ন্ত্রণ করলেন, তারপর নেদারল্যান্ডসের জালে পাঠিয়ে দিলেন স্পেনের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় গোলটি।

স্টেডিয়ামের সব আলোর নিচে সতীর্থরা ইনিয়েস্তাকে ঘিরে ধরেছেন, স্পেন উন্মত্ত হয়ে উঠছে। প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপ জিতে ইতিহাসে লেখা হয়ে গেল স্পেন আর ইনিয়েস্তার নাম। কিন্তু ইনিয়েস্তা! তিনি জার্সি খুলে বুকের কাছে দেখালেন আরেকটি নাম: ‘দানি হারকে, তুমি সব সময় আমাদের সঙ্গে।’

হারকে তখন প্রায় এক বছর ধরে নেই। হৃদ্‌রোগে আকস্মিক মৃত্যুর আগে তিনি ছিলেন ইনিয়েস্তার ঘনিষ্ঠতম বন্ধু ও স্পেনের বয়সভিত্তিক দলের সতীর্থ। গোলটি ছিল স্পেনের, ট্রফিটিও স্পেনের; কিন্তু জার্সির নিচে লেখা এই বাক্যটি দুই বন্ধুর গোপন কথোপকথন। পৃথিবীর সবচেয়ে উজ্জ্বল রাতেও ইনিয়েস্তা তাঁর হারিয়ে যাওয়া বন্ধুর জন্য একটি জায়গা রেখে দিয়েছিলেন, বুকের খুব কাছে!

পর্তুগালের ‘২৭+১’ দর্শন

এবারের বিশ্বকাপে পর্তুগাল! রোনালদোরা প্রতি ম্যাচে অদৃশ্য একজনকে সঙ্গে করে মাঠে নামছে। দিয়োগো জোতা। ২০২৫ সালের জুলাইয়ে সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যান জোতা আর তাঁর ভাই। বেঁচে থাকলে এই দলটাতে থাকতেই পারতেন। হারিয়ে যাওয়া জোতাকে তাই ফেলে আসেনি পর্তুগাল, বুকের মধ্যে করে নিয়ে এসেছে বিশ্বকাপে। পর্তুগিজ ফুটবল ফেডারেশন বলছে, এই দলটি ‘সব সময় ২৭+১’। খেলোয়াড়দের কবজিতে থাকা স্মারকবন্ধনীতেও আছে জোতার নাম।

এই +১ ফুটবলের অঙ্ক নয়। এটি বন্ধুত্বের অঙ্ক। কোনো মানুষ চলে গেলে তার চেয়ার ফাঁকা থাকে; কিন্তু তার জায়গা সব সময় ফাঁকা হয় না। জোতা আর ড্রেসিংরুমে ঢুকবেন না, অনুশীলনের শেষে হাসবেন না, গোল করে দৌড়ে যাবেন না কারও দিকে। তবু পর্তুগাল মাঠে নামলে তাঁর বন্ধুরা কবজির কাছে তাঁর নাম নিয়েই দৌড়াবেন। হয়তো ক্লান্তির শেষ মিনিটে কেউ একজন মনে করবেন—আজও আমরা একজন বেশি।

বন্ধুত্বের চিরন্তন ভাষা

আমাদের জীবনেও এমন মানুষ থাকে। কেউ শৈশবের প্রথম মাঠের বন্ধু, যে আজও জানে কোন পায়ে শট নিলে বল পাশের বাড়ির জানালায় লাগত। কেউ নতুন—অফিসের সহকর্মী, পাশের ফ্ল্যাটের মানুষ, বিশ্ববিদ্যালয়ের ছোট ভাই কিংবা নতুন কোনো আড্ডার সঙ্গী—যার সঙ্গে এখনো শুধু ম্যাচের স্কোর নিয়েই কথা হয়। বিশ্বকাপ তাদেরও এক টেবিলে বসানোর সময়।

বন্ধুত্ব কোনো পুরোনো ছবির মতো শুধু তুলে রাখার বিষয় নয়। নতুন মানুষ এলে পুরোনো কেউ বাদ পড়ে না; দলের বেঞ্চটা শুধু একটু লম্বা হয়। কেউ পুরোনো জার্সির মতো পরিচিত, কেউ নতুন সাইনিংয়ের মতো অচেনা; কিন্তু খেলা জমতে হলে দুজনেরই দরকার হয়।

এই বিশ্বকাপে তাই প্রথম যে বন্ধুর সঙ্গে জাম্বুরায় লাথি মেরেছিলাম, তাকে একবার বলা যাক—‘আজ রাতে চলে আয়, খেলা আছে।’ আর নতুন যে মানুষটিকে এখনো শুধু পরিচিত বলে জানি, তাকেও বলা যাক—‘তুমিও এসো।’

হয়তো আমাদের হাতে কোনো ট্রফি উঠবে না। তবু একটি গোলের পর, একটি হারের পর, অথবা শহর ঘুমিয়ে পড়া কোনো ভোরে, আমরা যেন কারও কাঁধে হাত রাখার মতো মানুষ হয়ে থাকি। কারণ, ট্রফি একজন হাতে তোলে। কিন্তু জয়ের মঞ্চে কেউ একা দাঁড়িয়ে থাকে না। জীবনের সবচেয়ে বড় পাসটিও হয়তো তাই গোলপোস্ট নয়, বন্ধুর দিকে—‘তোর টিমে, তোর পাশে।’