ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উচ্চতর মানববিদ্যা গবেষণাকেন্দ্র আয়োজিত সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বাংলা বিভাগের সাবেক অধ্যাপক নূরুর রহমান খান। রোববার সকালে বিশ্ববিদ্যালয়ের আর সি মজুমদার মিলনায়তনে এ সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়। সভাপতিত্ব করেন গবেষণাকেন্দ্রের সভাপতি অধ্যাপক আতাউর রহমান মিয়াজী।
বঙ্কিমচন্দ্রের রম্যরচনার বৈশিষ্ট্য
অধ্যাপক নূরুর রহমান খান তাঁর ‘বাংলা রম্যনিবন্ধের পথিকৃৎ বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়’ শীর্ষক প্রবন্ধে বলেন, বঙ্কিমচন্দ্র বাংলা সাহিত্যের প্রথম ও সফল রম্য নিবন্ধকার। তবে তাঁর রম্যরচনাকে ‘লঘু নিবন্ধ’ বলাই বেশি সংগত। তাঁর হাস্যরসের অন্তরালে ক্ষোভ ও বেদনার অনুভূতি কাজ করে। বক্তব্যের মধ্যে অকথিত কিছু থাকে, যা বুঝে নিতে হয়।
প্রবন্ধের প্রথম পর্যায়ে তিনি রম্যরচনার বৈশিষ্ট্য নিয়ে আলোচনা করেন। তিনি বলেন, রম্যরচনার কোনো ধরাবাঁধা রূপ নেই। লেখকের শক্তি, সামর্থ্য, মেজাজ ও বিষয়ের ওপর ভিত্তি করে এর বৈশিষ্ট্য তৈরি হয়। রম্যরচনা সব সময় চটুল হবে না, তাতে গুরুত্ব, গভীরতা ও সুদূরপ্রসারী ভাবনার খোরাক থাকতে পারে। এই আলোকে তিনি বহু উদ্ধৃতি ও সমালোচকদের মন্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে বঙ্কিমচন্দ্রের রচনার নানা দিক গভীরভাবে পর্যালোচনা করেন। পাশাপাশি বঙ্কিম পরবর্তী বাংলা সাহিত্যের খ্যাতনামা লেখকদের রম্যরচনার ক্রমবিকাশ ও বিশেষ দিকগুলো তুলে ধরেন।
‘লোকরহস্য’ ও ‘কমলাকান্ত’ অত্যুজ্জ্বল নিদর্শন
অধ্যাপক নূরুর রহমান খান বলেন, বঙ্কিমচন্দ্রের ‘লোকরহস্য’ ও ‘কমলাকান্ত’ রম্যনিবন্ধ ধারার অত্যুজ্জ্বল নিদর্শন। এ ছাড়া তাঁর ‘বিবিধ-প্রবন্ধ’র কিছু রচনা এবং ‘মুচিরাম গুড়ের জীবন চরিত’ও এই শ্রেণির। এসব রচনায় সামাজিক বিষয় নিয়ে ব্যঙ্গ যেমন আছে, তেমনি দার্শনিকতার আভাসও আছে। পরিশীলিত মনন ও বাগবৈদগ্ধ্যের কারণে বর্তমানকালের পাঠকদের কাছেও এসব রচনার আবেদন রয়েছে। বাংলায় রম্যসাহিত্যের যে ধারা তিনি সৃষ্টি করেছেন, তার রসস্রোত একবিংশ শতকেও বহমান।
আলোচকদের মতামত
প্রবন্ধের ওপর আলোচনার শুরুতেই জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক চঞ্চল কুমার বোস অশীতিপর বয়সেও গভীর বিশ্লেষণ ও গবেষণামূলক প্রবন্ধ উপস্থাপনার জন্য তাঁর সরাসরি শিক্ষক অধ্যাপক নূরুর রহমান খানকে অভিনন্দন জানান। বঙ্কিমচন্দ্র প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বঙ্কিমচন্দ্রকে নিয়ে উভয় বাংলাতেই নানা বিতর্ক আছে। তবে বাংলা সাহিত্য, ভাষা ও সমাজের উপকার করার সারাজীবনের চেষ্টা তাঁর মধ্যে ছিল। সে সময় যাঁরা ইংরেজি ভাষায় উচ্চতর শিক্ষা অর্জন করেছিলেন, তাঁদের মধ্যে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের প্রতি অবজ্ঞার ভাব ছিল। কিন্তু বঙ্কিমচন্দ্র তাঁর ‘বঙ্গদর্শন’ পত্রিকার জন্য বাংলায় লেখার জন্য একটি লেখক গোষ্ঠী সৃষ্টি করেছিলেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক হোসনে আরা বলেন, ঔপন্যাসিক বঙ্কিমচন্দ্র ও প্রাবন্ধিক বঙ্কিমের ভাবনা ও দৃষ্টিভঙ্গির বড় রকমের পার্থক্য আছে। উপন্যাসে তিনি রক্ষণশীল, কিন্তু প্রবন্ধে অনেকটা মুক্ত–উদার। এসব প্রবন্ধে রস আছে, তির্যকতা আছে, সমাজের সমালোচনা আছে। তবে রক্ষণশীলতা থেকে সর্বাংশে মুক্ত হতে পেরেছেন, এমন বলা যায় না। তিনি আরও বলেন, ইউরোপীয় রম্যরচনা ও আমাদের রম্যরচনার ধরন কিছুটা আলাদা। বাংলা সাহিত্যের রম্যধারার রচনায় হাস্যরসের সঙ্গে সমাজ ও বাস্তবতার নানা অসংগতির প্রতি বিদ্রূপ ও তির্যক সমালোচনা থাকে, যা ইউরোপীয় রম্যতে থাকে না। সেখানে এ ধরনের রচনা কেবল নির্মল হাস্যরসাত্মক।
উন্মুক্ত আলোচনা ও সভাপতির বক্তব্য
পরে উন্মুক্ত আলোচনায় অংশ নেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক মীজানুর রহমান এবং কবি ও সাংবাদিক নাসির আহমেদ। সভাপতির বক্তব্যে অধ্যাপক আতাউর রহমান মিয়াজী বলেন, অধ্যাপক নূরুর রহমান খানও একসময় এই গবেষণাকেন্দ্রের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন। প্রবীণ বয়সেও তিনি গবেষণায় সক্রিয় রয়েছেন, যা আনন্দের ও তরুণ গবেষকদের জন্য অনুপ্রেরণাদায়ক। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন গবেষণাকেন্দ্রের পরিচালক অধ্যাপক জসীম উদ্দিন।



