প্রথম আলোর অগ্নিদগ্ধ ভবনে 'আলো' প্রদর্শনী: সাবেক উপদেষ্টারা দেখলেন ধ্বংস ও পুনরুত্থানের শিল্পকথন
প্রথম আলোর পুড়ে যাওয়া ভবনে 'আলো' প্রদর্শনী, দেখলেন সাবেক উপদেষ্টারা

প্রথম আলোর অগ্নিদগ্ধ ভবনে 'আলো' প্রদর্শনী: ধ্বংসের স্মৃতি ও পুনরুত্থানের বার্তা

সংঘবদ্ধ উগ্রবাদীদের হামলা ও অগ্নিসংযোগে দগ্ধ প্রথম আলো ভবনে চলছে ব্যতিক্রমী শিল্পকর্ম প্রদর্শনী 'আলো'। গতকাল বৃহস্পতিবার প্রদর্শনীর দ্বিতীয় দিনে সকাল ও বিকেলে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশা ও বয়সের প্রচুর দর্শক আসেন এই শিল্প-আয়োজন দেখতে। তাঁদের মধ্যে ছিলেন সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দুই উপদেষ্টা হোসেন জিল্লুর রহমান ও মেজর জেনারেল (অব.) গোলাম কাদের।

ধ্বংসের ভয়াবহতা ও জেগে ওঠার প্রাণশক্তি

দর্শকেরা এই শিল্প-আয়োজনে দেখছেন পুড়ে যাওয়া কম্পিউটার, যন্ত্রাংশ, টেবিল, চেয়ার, বই, নথিপত্রের মাধ্যমে ধ্বংসের ভয়াবহতা। একই সঙ্গে সেখান থেকে জেগে ওঠার প্রাণশক্তিরও প্রতিফলন ঘটেছে শিল্পীর কাজে। ধ্বংসের চিত্র দেখে তাঁরা বিস্ময় ও গভীর দুঃখ প্রকাশ করেছেন। পাশাপাশি এমন উগ্রবাদী হামলা যেন আর না হয়, দোষীদের বিচার এবং সাংবাদিকতা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে সরকারের প্রতি জোরালো আহ্বান জানান তাঁরা।

হোসেন জিল্লুর রহমানের মূল্যায়ন

বিকেলে প্রদর্শনী দেখতে এসেছিলেন সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা হোসেন জিল্লুর রহমান। তিনি বলেন, 'প্রথম আলোতে হামলার এ ঘটনা অত্যন্ত দুঃখজনক ও গহিন ক্ষত সৃষ্টিকারী। এমন একটি প্রদর্শনী খুবই গুরুত্বপূর্ণ, কারণ স্মৃতিগুলো ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য জানা জরুরি। দেশ ও জাতির জন্য এ ধরনের ঘটনার স্মৃতিকে ইতিহাসের উপকরণ হিসেবে ধরে রাখা অত্যন্ত প্রয়োজন।'

হোসেন জিল্লুর আরও বলেন, 'প্রথম আলোর ওপর হামলার ক্ষেত্রে দুটো ঘটনা রয়েছে। প্রথমত, প্রতিষ্ঠানটি মব সন্ত্রাসের শিকার হয়েছে। দ্বিতীয়ত, বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ঘটে যাওয়া এ ঘটনায় বিস্ময়করভাবে রাষ্ট্রীয় নিস্পৃহতা দেখা গেছে। এই দুই ঘটনার ওপর ভিত্তি করে এখন আমরা এর ব্যাখ্যা পেতে চাই। এর পুনরাবৃত্তি যেন আর কখনোই না ঘটে, তার জন্যই প্রশ্নগুলোর সমাধান দরকার।'

প্রদর্শনীর পটভূমি ও সময়সূচি

গত বছরের ১৮ ডিসেম্বর রাতে প্রতিহিংসায় উন্মত্ত একদল উগ্রবাদী প্রথম আলো কার্যালয়ে হামলা চালায়। তারা ব্যাপক ভাঙচুর ও লুটপাটের পর ভবনে আগুন ধরিয়ে দেয়। হামলার শিকার ভবনটিতে শিল্পকর্ম করেছেন বিশিষ্ট শিল্পী মাহ্‌বুবুর রহমান। 'আলো' নামের এই শিল্পকর্ম প্রদর্শনী শুরু হয়েছে ১৮ ফেব্রুয়ারি। ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত প্রতিদিন বেলা ১১টা থেকে ১টা ও বেলা ৩টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত সর্বসাধারণের জন্য প্রদর্শনী খোলা থাকবে।

শিক্ষাবিদ ও শিল্পীদের প্রতিক্রিয়া

স্টামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশের পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক আহমেদ কামরুজ্জামান মজুমদার বললেন, 'এটি শুধুই প্রদর্শনী নয়। উগ্রবাদী তাণ্ডব, মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ওপর হামলা, পরিবেশ ধ্বংস—এমন সবকিছুর বিরুদ্ধেই এটি একটি দারুণ শৈল্পিক প্রতিবাদ। শিল্পীর ভাষা অত্যন্ত শক্তিশালী হয়ে এই প্রদর্শনীতে প্রকাশিত হয়েছে।'

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের কারুশিল্প বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক শিল্পী ফারহানা ফেরদৌসী বললেন, 'এই অনুভূতি ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। শিল্পী মাহ্‌বুবুর রহমানের কাজ সম্পর্কে আমরা অনেক দিন থেকেই জানি। এমন একটি পরিবেশে এত বিশাল কাজ তাঁর পক্ষেই করা সম্ভব। ভিন্নমত থাকতে পারে, কিন্তু প্রত্যেকের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা থাকতে হবে।'

তরুণ শিক্ষার্থী ও সাধারণ দর্শকের মতামত

অনেক তরুণ শিক্ষার্থী এসেছিলেন প্রদর্শনী দেখতে। তাঁদের মধ্যে সাউথইস্ট ইউনিভার্সিটির স্থাপত্য বিভাগের ছাত্র শুআইব ত্বাসীন, বিইউপির গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের হুমায়রা তাবাসসুম, নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির পরিবেশবিজ্ঞানের রাহাত এহসান উল্লেখযোগ্য। তাঁরা প্রদর্শনী নিয়ে মুগ্ধতার কথা বলেন। পাশাপাশি দেশে একটি মুক্ত স্বাধীন পরিবেশ সৃষ্টির জন্য উগ্রপন্থা, মব সন্ত্রাস এবং উসকানিমূলক বিদ্বেষ ছড়ানো বন্ধ করতে সরকারের দৃঢ় অবস্থানের প্রয়োজনীয়তার কথাও বলেন।

বনানীতে আকিজ বশির গ্রুপে চাকরিরত মিঠুন কাজী বিকেলে বাসায় ফেরার পথে এসেছিলেন প্রদর্শনীতে। ভবনের ভেতরে এসে এর ভয়াবহতা দেখে বিস্মিত হয়ে তিনি বললেন, 'হামলার ঘটনাটি খুবই মর্মান্তিক। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কিছু লোক তাদের হীনস্বার্থে সাধারণ মানুষকে উসকানি দিয়ে অনেক নাশকতামূলক কাজ করিয়েছে। তারই নগ্ন প্রকাশ ঘটেছে সংবাদপত্র অফিসের ওপর এমন হামলায়।'

আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া ও অন্যান্য দর্শক

প্রদর্শনী দেখতে এসেছিলেন বাংলাদেশে নিযুক্ত ইতালির রাষ্ট্রদূত আন্তোনিও আলেসান্দ্রোর স্ত্রী পাওলা বেলফিউরে। তিনি ব্যতিক্রমী প্রদর্শনীর স্থাপত্য ও পুড়ে অঙ্গার বিভিন্ন জিনিসের ছবি তোলেন। পাওলা বলেন, 'গত বছরের ডিসেম্বরে যা ঘটেছিল, তা স্মরণে রাখা, স্মৃতিকে ধরে রাখার খুব সুন্দর উপায় এই প্রদর্শনী।'

ডয়চে ভেলের বাংলাদেশ প্রতিনিধি হারুন-উর রশিদ এসেছিলেন প্রদর্শনীর ওপর রিপোর্ট তৈরি করতে। তিনি বললেন, 'এই প্রদর্শনী একদিকে যেমন যন্ত্রণাময়, তেমনি অন্যদিকে অনুপ্রেরণাদায়ক।'

ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস-এর সাংবাদিক এনামুল হক ছেলেকে নিয়ে এই শিল্প-আয়োজন দেখতে আসেন। তিনি বলেন, 'এটি একটি বীভৎস ও ধ্বংসাত্মক ঘটনা। দেশের ইতিহাসে সংবাদপত্রের ওপর এ ধরনের ঘটনা আগে ঘটেনি। এটি প্রতিরোধে সে সময়ের সরকার যথাযথ পদক্ষেপ নেয়নি।'

প্রদর্শনী দেখতে আরও এসেছিলেন সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব.) গোলাম কাদের, নির্বাচন পর্যবেক্ষণে আসা ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রতিনিধি আগনেস দোকা প্রমুখ। বেলা ১১টায় প্রদর্শনী খোলার পর থেকেই দর্শক সমাগম হতে থাকে, যা গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও মতপ্রকাশের অধিকার নিয়ে সামাজিক সচেতনতার প্রতিফলন ঘটাচ্ছে।