আর্তুর র্যাঁবোর কবিতা: নরকের আগুনে পোড়া এক অসামান্য অভিজ্ঞতা
আর্তুর র্যাঁবোর কবিতা: নরকের আগুনে পোড়া অভিজ্ঞতা

মাসুক হেলালের আঁকা আর্তুর র‍্যাঁবোর প্রতিকৃতি অবলম্বনে গ্রাফিকস: প্রথম আলো

কবিতার কাছে আমার প্রত্যাশা বরাবরই অতি সামান্য। হয়তো একটা দীর্ঘশ্বাসই আমি প্রার্থনা করি। একটা শব্দ কিংবা ভাবনা আঁকড়ে ধরে কয়েকটা দিন নির্বিঘ্নে কাটিয়ে দেওয়া। এতই অল্প চাওয়া। কখনো তা না পেলে অবশ্য মন খারাপ করি না। সেই দীর্ঘশ্বাসের সন্ধানে কবিতা থেকে কবিতায় ভ্রমণের আনন্দটা কখনো কখনো লক্ষ্যে পৌঁছানোর চেয়ে অধিক আনন্দময়।

কিন্তু সেই কবিতাই মনোরম মনোটোনাস সকালে কিংবা গন্ডারের মতো দুলতে থাকা দুপুরে অপ্রত্যাশিত ঝড় নিয়ে আসে। জীবন কিংবা ভাবনার চেনা বিন্যাসকে একমুহূর্তে ওলট-পালট করে দিয়ে হারিয়ে যায়। আর অবিশ্বাস্য কোনো চিত্রকল্প, উপমা কিংবা দর্শনের সামনে দাঁড়িয়ে আমরা থরথর কাঁপতে থাকি। মনে হয়, ওহ কবিতা তাহলে এমনও হয়। এভাবেও বিপণ্নতা-বিষণ্নতা নিয়ে হাজির হতে পারে কবিতা। বলা বাহুল্য, খুব কম কবিতাই পারে বোধের জগতে এমন ঝড় বয়ে দিতে। কেউ চাইলে হাতেও গুনে ফেলতে পারেন।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

আর্তুর র‍্যাঁবোর কবিতা সেই বিরল কবিতাগুলোর অন্যতম। কবিতাকে ভিন্ন এক অভিজ্ঞতা ও দ্যোতনায় আমাদের সামনে হাজির করেন র‍্যাঁবো। কবিতার মহৎ হয়ে ওঠার যে আকাঙ্ক্ষা, তার পুরোটাই ধারণ করে র‍্যাঁবো নিজেও হয়ে ওঠেন অনন্য-অসামান্য একজন; যেখানে ব্যক্তি র‍্যাঁবোকে আর তাঁর কবিতা থেকে সরিয়ে রাখা যায় না। কখনো কখনো রক্ত-মাংসের সেই মানুষটা নিজেই হাজির অবিশ্বাস্য এক কবিতা হয়ে।

প্রথম কবে র‍্যাঁবো পড়েছিলাম, আজ আর মনে নাই। তবে র‍্যাঁবো পড়ার আগের ও পরের মানুষ একেবারেই আলাদা। বিশেষ করে নরকে এক ঋতু পড়ার পর কবিতাকে মনে হবে গমগমে কোনো আগুনে অনুভূতি, যা আপনার শরীরের মাংসের স্তর ভেদ করে পৌঁছে যায় অনেক দূর পর্যন্ত। তবে র‍্যাঁবোর জীবন সম্পর্কে জানার পর অবশ্য তাঁর কবিতাকে আলাদা করে বুঝতে সমস্যা হয়নি। র‍্যাঁবোর কবিতাই তাঁর জীবন কিংবা ভাইসা ভার্সা। কেমন সেই জীবন?

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

র‍্যাঁবোর মতো না হলেও কাছাকাছি যেসব কবি-সাহিত্যিকের জীবনের খোঁজ পাওয়া যায়, তাঁদের মধ্যে জীবনানন্দ, কাফকা ও দস্তয়েভস্কি অন্যতম। জীবনানন্দ ও কাফকার জীবনের সঙ্গে লড়াইটা যদিও র‍্যাঁবোর মতো দৃশ্যমান না, অনেক বেশি মনস্তাত্ত্বিক।

হেনরি মিলার র‍্যাঁবোর জীবনকে তুলনা করেছিলেন ভ্যান গঘের সঙ্গে। আর পার্থক্য হিসেবে বলেছেন, ভ্যান গঘের জীবন আপনাকে অনুপ্রাণিত করে, র‍্যাঁবোর জীবন তা করে না। এতটাই যন্ত্রণার জীবন সম্ভবত আর কোনো কবির জোটেনি।

মিলারের মতে, র‍্যাঁবো নিজের জন্য যে শাস্তি নির্ধারণ করেছিলেন, শয়তান নিজেও হয়তো নিজের জন্য তেমনটা করতেন না। এমনকি মৃত্যুর পর তুমুল কবিখ্যাতি পাওয়ার পরও র‍্যাঁবোর কবিসত্তাকে মানতে পারেননি তাঁর মা। র‍্যাঁবোর জীবন আমাকে এ–ও মনে করিয়ে দেয়, মানুষের জীবন একান্তই তাঁর নিজের। অনেক ঘাত-প্রতিঘাতের ভেতর দিয়ে সেটা নির্মিত হয়। যদিও র‍্যাঁবোর মতো কেউ কেউ সেই জীবন নিজেই নির্মাণ করেন। তবে জীবন যেমনই হোক, একটা জীবন কখনো আরেকটা জীবনের নকল নয়। এরপরও কোনো কোনো জীবনের তল পাওয়ার সাধ্য আমাদের নেই। আপনি–আমি র‍্যাঁবোর আপাত আত্মঘাতী জীবনকে ব্যাখ্যা করতে পারব, কিন্তু সেটার তল খুঁজে পাব না, পাওয়া সম্ভবও না।

র‍্যাঁবোর মতো না হলেও কাছাকাছি যেসব কবি-সাহিত্যিকের জীবনের খোঁজ পাওয়া যায়, তাঁদের মধ্যে জীবনানন্দ, কাফকা ও দস্তয়েভস্কি অন্যতম। জীবনানন্দ ও কাফকার জীবনের সঙ্গে লড়াইটা যদিও র‍্যাঁবোর মতো দৃশ্যমান না, অনেক বেশি মনস্তাত্ত্বিক। দস্তয়েভস্কি আবার তুলনামূলক অধিক দৃশ্যমান। তবু দস্তয়েভস্কির সাহিত্যিকজীবনের কোনো বিচ্যুতি ঘটেনি। সব ঝড়ের ভেতর সন্ত কিংবা শয়তানের মতো লিখে গেছেন দস্তয়েভস্কি। কিন্তু র‍্যাঁবোর সাহিত্যজীবন অতি সামান্য। তিনি বেঁচেই ছিলেন ৩৭ বছর, যার বেশির ভাগটাই ছিল রীতিমতো অমানুষিক।

মিলার বলেন, ‘র‍্যাঁবোর কাছে যদ্দিন না পৌঁছে গিয়েছি, আমার জীবনে ছিলেন দস্তয়েভস্কি এবং তার শাসনটা ছিল নিরঙ্কুশ। এক রকমভাবে দেখতে গেলে, তিনি সে রকমই থাকবেন আমার কাছে চিরকাল, ঠিক সেভাবে, যেভাবে বুদ্ধ খ্রিষ্টের চেয়ে প্রিয়তর আমার কাছে সব সময়। দস্তয়েভস্কি একেবারে গভীর অন্তঃপ্রদেশে নেমে গিয়েছিলেন এবং সেখানেই ছিলেন অপরিমেয় সময়কাল এবং একজন পূর্ণ মানবাত্মা হয়ে উঠে এসেছিলেন। আমি পূর্ণ মানুষ বেশি পছন্দ করি।’

র‍্যাঁবো লিখছেন, ‘ডাকলাম জল্লাদদের, মরবার আগে তাদের খাঁড়ার বাঁটা কামড়ে ধরব বলে—জড়ো করলাম জাঁতার কল, তারা যেন দলে পিষে গুঁড়িয়ে দিতে পারে আমায় বালুর সঙ্গে, রক্তের সঙ্গে।’

র‍্যাঁবো থেকে দস্তয়েভস্কির এই যে দূরত্ব, এটা খুবই সামান্য ও সূক্ষ্ম। ফলে এর মাঝামাঝি দাঁড়িয়ে জীবনকে দেখার অন্য রকম একটা আনন্দ ও অভিজ্ঞতা আছে। দস্তয়েভস্কি আপনাকে নরকের দুয়ারে স্বর্গ দেখাবে, আর র‍্যাঁবো যা দেখাবে, তার পুরোটাই নরক কিংবা নরকসদৃশ কিছু একটা।

আর এই নরকের সবটাই উথলে ওঠে নরকে এক ঋতুতে। ইংরেজি অনুবাদে পড়ার আগে লোকনাথ ভট্টাচার্যের অনুবাদ পড়েছি। কেন জানি না, লোকনাথের অনুবাদটাই যেন বেশি কাছের মনে হয়। এটা কি ভাষার কারণে, নাকি অনুবাদের কারণে তা নিশ্চিত নই। তবে এই কবিতা পাঠে আগুন ছুঁয়ে দেখার উত্তাপ অনেকটাই টের পাওয়া যায়। র‍্যাঁবো লিখছেন, ‘ডাকলাম জল্লাদদের, মরবার আগে তাদের খাঁড়ার বাঁটা কামড়ে ধরব বলে—জড়ো করলাম জাঁতার কল, তারা যেন দলে পিষে গুঁড়িয়ে দিতে পারে আমায় বালুর সঙ্গে, রক্তের সঙ্গে।’ এসব লাইন একবার পড়লে তাড়া করে বেড়ায়। অনেক দিন পর্যন্ত মনে রয়ে যায়। ফলে উত্তাপটা নিতে আমাদের বারবার ফিরতে হয় এই কবিতার কাছে।

কিংবা এই লাইনগুলো, ‘প্রকৃতিকে কি জানি আমি? জানি কি নিজেকে? উত্তর নেই। মৃতদের লুকিয়ে ফেলেছি আমার পাকস্থলীতে। চেঁচাও, কাঁদো, বাজনা বাজাও, নাচো, নাচো, নাচো।’

এই কথাগুলো কোথায় গিয়ে যেন লাগে! প্রথমবার পাঠেই বিশাল এক ধাক্কা লাগে। যদিও প্রথম পাঠে ধরা দেবে না অনেক কিছুই। আপনাকে বারবার ফিরতে হয় এসব লেখার কাছে। প্রতিবারেই নতুন কোনো রোমাঞ্চের উন্মোচন। নতুন কোনো আলোর রেখা ভেদ করে যায় আমাদের সমস্ত অন্ধকার। অবশ্য উল্টোও হতে পারে। কবিতার কাছ থেকে আমরা যা চাই, তার বেশি কিছুও দিয়ে যায় এই লেখাগুলো। হয়তো চূড়ান্ত অর্থে পাঠকের কাছে এটাই কবিতার দায়। স্বাভাবিকভাবেই এমন আলোর ঝলকানি খুব কম সময়েই দেখা যায়।

তবে এত বিশাল চাপ নিয়ে যিনি পৃথিবীকে দেখছেন, সেই চাপে তার তাল হারানোটাই ছিল স্বাভাবিক, হয়েছেও তা–ই। এর ফলাফলস্বরূপ র‍্যাঁবোর পুরো জীবনটা ঢুকে গেল এক গোলকধাঁধায়। কবি থেকে হয়ে গেলেন ‘কুখ্যাত’ এক ব্যবসায়ী।

র‍্যাঁবো অবশ্য নিজেকে কবির চেয়ে বড় কিছু কল্পনা করেছেন। নিজের ওপর স্বর্গীয় দায়িত্ববোধ চাপিয়ে দিয়েছিলেন। তিনি ভাবতেন, তাঁকে ঈশ্বর ও শয়তানের সমন্বয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। প্রকৃতিও তার বশ মানবে। এর মধ্য দিয়ে সৃষ্টি হবে নতুন ফুল, রং কিংবা নতুন এক বিশ্বের। ফলে সমুদ্র দেখার আগেই তিনি লিখেছিলেন সমুদ্রনির্ভর অসামান্য কবিতা।

তবে এত বিশাল চাপ নিয়ে যিনি পৃথিবীকে দেখছেন, সেই চাপে তার তাল হারানোটাই ছিল স্বাভাবিক, হয়েছেও তা–ই। এর ফলাফলস্বরূপ র‍্যাঁবোর পুরো জীবনটা ঢুকে গেল এক গোলকধাঁধায়। কবি থেকে হয়ে গেলেন ‘কুখ্যাত’ এক ব্যবসায়ী। এমনকি কবিদের দলেও র‍্যাঁবো যেন এক নোংরা আগন্তুক। এ কারণে প্যারিসও তাঁকে নিতে পারেনি। আবার অদ্ভুত সব বিশেষণ জুড়ে দিয়ে ছুড়ে ফেলেছে তাকে। ভাগ্যিস দিয়েছিল। এসব অবজ্ঞা, তির্যক জীবনবোধ ও দর্শনই তাঁকে দিয়ে লিখিয়ে নিয়েছে নরকে এক ঋতু কিংবা ‘মাতাল তরণী’সহ অবিশ্বাস্য সব কবিতা। কবিতা নামের অসংখ্য জঞ্জালেও যা নক্ষত্রের মতো জ্বলজ্বল করছে।

লেখাটায় মিলারের কাছ থেকে অনেক ঋণ করেছি। শেষটাতেও আবার মিলারকে স্মরণ করছি। মিলার লিখেছিলেন, ‘আমি মনে করি, এই পৃথিবীতে অনেক র‍্যাঁবো রয়ে গেছেন এবং যত সময় যাবে র‍্যাঁবোদের সংখ্যাও বাড়বে। আমি এ-ও মনে করি, যে পৃথিবী আসছে, তাতে র‍্যাঁবো ধরনের চরিত্ররা বেশি বেশি করে হ্যামলেট বা ফাউস্ট ধরনের চরিত্রদের জায়গা নিয়ে নেবে।’ মিলার রূপকার্থে এই কথা বলেছিলেন প্রায় ৭০ বছর আগে। এরপর পৃথিবীর যাত্রাটা এমন একটা পথে হয়েছে, র‍্যাঁবোর মতো স্বভাবের অসংখ্য নকল মানুষের জন্ম হয়েছে। কিন্তু দুঃখজনকভাবে তাঁরা কেউ র‍্যাঁবোর মতো কবি হতে পারেননি। ফলে পৃথিবী নানা ধরনের ব্যবসায়ীতে ভরে গেলে কবির মৃত্যু হয়েছে সেই ১৮৯১ সালে।

বইপত্র

  • ঘাতকদের সময়-র‍্যাঁবো অধ্যয়ন: হেনরি মিলার: ভাষান্তর ও ভাষ্য: ভূমেন্দ্র গুহ
  • রচনাবলী ৮: লোকনাথ ভট্টাচার্য
  • জাঁ আর্তুর র‍্যাঁবো : মলয় রায়চৌধুরী