এমজিআইয়ের কুমিল্লা ইকোনমিক জোনে ‘দ্য ইন্ডাস্ট্রিয়াল ট্রি’ ভাস্কর্য উদ্বোধন
মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজ (এমজিআই)-এর কুমিল্লা ইকোনমিক জোনের (সিইজেড) প্রবেশপথে উন্মোচিত হয়েছে একটি অনন্য ভাস্কর্য, যা ইস্পাত ও কাঠামোর বাইরে গিয়ে শিল্পের পেছনে থাকা মানুষের শ্রম ও অবদানকে তুলে ধরেছে। একুশে পদকপ্রাপ্ত ভাস্কর হামিদুজ্জামান খান নির্মিত ‘দ্য ইন্ডাস্ট্রিয়াল ট্রি’ এমন একটি শিল্পকর্ম, যেখানে যন্ত্র, ইস্পাত এবং মানুষের শ্রম গাছের শিকড়ের মতো একে অপরের পরিপূরক হিসেবে জড়িয়ে থাকার দৃশ্য ফুটে উঠেছে।
এটি ছিল অধ্যাপক হামিদুজ্জামান খানের জীবনের শেষ পর্যায়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ। এমজিআই তাকে তাদের অর্থনৈতিক অঞ্চলের ভেতরে একটি ভাস্কর্য নির্মাণের আমন্ত্রণ জানায়। অধ্যাপক হামিদুজ্জামান একটি শর্তে কাজটি গ্রহণ করেন—ভাস্কর্যের রূপ হবে একটি গাছ। ২০২৪ সালে তিনি কাজ শুরু করেন। তিনি মডেল তৈরি, উপকরণ বাছাই এবং স্থান নির্ধারণ শেষে প্রবেশপথে নির্মাণকাজ শুরু করেন। কিন্তু ভাস্কর্যের পৃষ্ঠ সম্পূর্ণ হওয়ার আগেই ২০২৫ সালের ২০ জুলাই তিনি মৃত্যুবরণ করেন। তখন তার কল্পনার কাঠামোটিই দাঁড়িয়ে থাকে, তবে চূড়ান্ত রূপটি থেকে যায় অসম্পূর্ণ।
আইভি জামানের হাতে সম্পূর্ণতা
এরপর এমজিআই একটি বিশেষ সিদ্ধান্ত নেয়। শিল্পকর্মটি অন্য কাউকে না দিয়ে, পরিবর্তন না করে বা সরিয়ে না ফেলে, তারা তার সহধর্মিণী, চিত্রশিল্পী আইভি জামানের সঙ্গে যোগাযোগ করে—যিনি শুরু থেকেই পুরো প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তাকে নিজের দৃষ্টিভঙ্গিতে কাজটি সম্পন্ন করার অনুরোধ জানানো হয়। তিনি একটি শর্তে সম্মতি দেন—ভাবনাটি থাকবে তাঁর স্বামীর, আর কাজটি পূর্ণতা পাবে তাঁর দিকনির্দেশনায়। আজ যে ভাস্কর্যটি দাঁড়িয়ে আছে, তা কেবল একজন শিল্পীর মৃত্যুর পর সম্পন্ন হওয়া কাজ নয়; বরং এটি জীবন ও কর্মের এক গভীর সংযোগ।
আইভি জামান কয়েক মাস ধরে ভাস্কর্যের পৃষ্ঠ, রঙের স্তর ও ছাউনির অংশে সূক্ষ্মভাবে কাজ করে এর চূড়ান্ত রূপ সম্পন্ন করেন। তিনি শুধু ভাস্কর্যটিকে পূর্ণতা দেননি, একই সঙ্গে তার প্রয়াত স্বামীর শুরু করা শিল্পভাবনাকে অক্ষুণ্ন রেখেছেন। ‘দ্য ইন্ডাস্ট্রিয়াল ট্রি’ এমন একটি উল্লেখযোগ্য ভাস্কর্য, যা একজন শিল্পীর মৃত্যুর পর তার সহধর্মিণী সম্পন্ন করেছেন।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের বক্তব্য
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে আইভি জামান বলেন, ‘আমার প্রয়াত স্বামীর সহশিল্পী হিসেবে এই কাজটি সম্পন্ন করতে পেরে আমি সম্মানিত। এটি শুধু একটি স্থাপনা নয়। এটি তার শেষ দিকের কাজগুলোর একটি এবং আমাদের যৌথ সৃষ্টি। তার স্বপ্নকে এগিয়ে নিতে পেরে আমি গর্বিত। দেশে ও বিদেশে তার অনেক সৃষ্টিকর্ম রয়েছে, যেমন দক্ষিণ কোরিয়ার সিউলের অলিম্পিক পার্ক, কিন্তু আজ আমি বলতে চাই, এই শিল্পকর্মটিই (দ্য ইন্ডাস্ট্রিয়াল ট্রি) তার শ্রেষ্ঠতম।’
এমজিআই-এর পরিচালক তানভীর আহমেদ মোস্তফা বলেন, ‘আইভি জামান প্রফেসর হামিদুজ্জামান খানের শেষ ভাবনাটিকে পূর্ণ রূপ দিয়েছেন। তিনি না থাকলে এই কাজটি হয়তো অসম্পূর্ণই থেকে যেত।’ তিনি আরও বলেন, ‘কুমিল্লা ইকোনমিক জোন একটি দীর্ঘ ঐতিহ্যকে সামনে নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। এটি একটি পরিকল্পিত শিল্প এলাকা, যেখানে দেশি ও বিদেশি নির্মাতারা একই জায়গায়, একই অবকাঠামো ও সুবিধা ব্যবহার করে কাজ করেন। কিন্তু যেটি একে দেশের অন্য সব বাণিজ্যিক এলাকা থেকে আলাদা করে, সেটি হলো প্রবেশপথে থাকা এই সাংস্কৃতিক শিল্পকর্ম।’
তিনি আরও বলেন, ‘শুরু থেকেই আমরা কোনো স্মৃতিস্তম্ভ, সাইনবোর্ড বা করপোরেট গেট নয়—একটি ভাস্কর্য বেছে নিয়েছিলাম। কারণ গাছ স্থায়িত্বের একটি প্রাচীন প্রতীক, আর একটি ইকোনমিক জোনও একটি জায়গার প্রতি দীর্ঘমেয়াদি অঙ্গীকারের প্রতিচ্ছবি। ‘দ্য ইন্ডাস্ট্রিয়াল ট্রি’ শিল্পের শক্তি আর সংস্কৃতির সৌন্দর্যকে একসঙ্গে তুলে ধরে—একটিকে বেছে নিয়ে অন্যটিকে বাদ দেয় না। প্রফেসর হামিদুজ্জামান খান এই কাজ শুরু করেছিলেন, আর আইভি জামান তা সম্পূর্ণ করেছেন—এটি শুধু দায়িত্ব হস্তান্তর নয়, বরং একসঙ্গে সৃষ্টি করার গল্প। আজ যা দাঁড়িয়ে আছে, তা শুধু একটি স্থাপনা নয়, এটি একটি যৌথ স্বপ্ন—যার শিকড় বৃহত্তর কুমিল্লায়, যেখানে এমজিআই-এর প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যানের জন্ম এবং যেখান থেকেই এই শিল্পযাত্রার শুরু।’
ভাস্কর্যের শৈল্পিক বৈশিষ্ট্য
যারা হামিদুজ্জামান খানের ছয় দশকেরও অধিক সময় ধরে চলা শিল্পজীবনের সঙ্গে পরিচিত, তারা এই ভাস্কর্যে তার স্বতন্ত্র মিনিমালিস্ট ও জ্যামিতিক শৈলী দেখতে পাবেন। এর ভিত্তি দৃঢ় ও স্থির, যা স্থায়িত্ব ও দীর্ঘমেয়াদি অঙ্গীকারের প্রতীক। উল্লম্ব অংশটি সরলভাবে উপরের দিকে উঠেছে, দেখে মনে হয় যেন শক্তি বহন করছে। উপরের ছাউনির অংশটি আলো ও বাতাসের দিকে উন্মুক্ত, যেখানে আইভি জামান তার চূড়ান্ত শিল্পীসত্তার স্পর্শ দিয়েছেন। পুরো ভাস্কর্যটি নিরবচ্ছিন্ন শ্রম, অগ্রগতি এবং শিল্পের পেছনে থাকা মানুষের অবদানকে একসঙ্গে তুলে ধরে।
ভাস্কর্যটি কোনো নগর চত্বর বা সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানে অবস্থিত নয়; বরং এটি দাঁড়িয়ে আছে সেই স্থানে, যেখানে শ্রমিকরা কাজে যোগ দেন এবং প্রতিদিন শিল্পের কার্যক্রম শুরু হয়। এর দর্শক সেই মানুষগুলো, যারা প্রতিদিন অর্থনীতিকে গড়ে তোলে ও এগিয়ে নিয়ে যায়।
এমজিআইয়ের ভিশন
শুরু থেকেই এমজিআই চেয়েছিল কুমিল্লা ইকোনমিক জোনের (সিইজেড) প্রবেশপথে এমন কিছু থাকুক, যা অর্থবহ—শুধু একটি চিহ্ন বা কাঠামো নয়। গাছ, যা স্থায়িত্বের প্রতীক, দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ ও ভবিষ্যৎ অগ্রগতির ধারণার সঙ্গে সুন্দরভাবে মিলে যায়। এমজিআই-এর কাছে এই ভাস্কর্য শুধু সৌন্দর্য নয়, বরং এটি একটি বার্তা যে শিল্পের ভেতরেও শিল্পচর্চার জায়গা থাকতে পারে।
৫১ বছরেরও বেশি অভিজ্ঞতা নিয়ে মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজ বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ শিল্পগোষ্ঠী। খাদ্য, ভোগ্যপণ্য, রাসায়নিক, জ্বালানি এবং লজিস্টিকসসহ বিভিন্ন খাতে তারা কাজ করে। তাদের শিকড় বৃহত্তর কুমিল্লায়, যেখানে তারা পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে সক্রিয়। ‘দ্য ইন্ডাস্ট্রিয়াল ট্রি’ এর মাধ্যমে সেই শিকড় এখন শিল্পের মাধ্যমে প্রকাশ পেয়েছে।
মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজ (এমজিআই) বাংলাদেশের একটি শীর্ষস্থানীয় শিল্পগোষ্ঠী। ৫০ বছরেরও বেশি সময় ধরে শিল্পগ্রুপটি এফএমসিজি, জ্বালানি, উৎপাদন ও অবকাঠামোসহ নানা খাতে কার্যক্রম পরিচালনা করছে। ১৯৭৬ সালে প্রতিষ্ঠিত এমজিআই বর্তমানে ৫৭টিরও বেশি শিল্প ইউনিট পরিচালনা করছে। এসব প্রতিষ্ঠানে ৬৫ হাজারেরও বেশি মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে। ‘ফ্রেশ’সহ বিভিন্ন জনপ্রিয় ব্র্যান্ডের মাধ্যমে এমজিআই দেশ ও বিদেশের লাখো ভোক্তাকে পণ্য ও সেবা দিয়ে দেশের অর্থনীতি ও শিল্প উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।



