সংগীতজ্ঞ আজাদ রহমানের ষষ্ঠ মৃত্যুবার্ষিকী আজ
সংগীতজ্ঞ আজাদ রহমানের ষষ্ঠ মৃত্যুবার্ষিকী

বহু বছর আগের কথা। বিটিভির সাদাকালো পর্দায় তখন ভেসে আসছে—‘জন্ম আমার ধন্য হলো মাগো...’। সামনে দাঁড়িয়ে কণ্ঠ দিচ্ছেন জনপ্রিয় এক শিল্পী, পেছনে সারি বেঁধে আরও অনেকে। সেই গানের ভেতরে ছিল অদ্ভুত এক আবেগ, এক গভীর মমতা। মুহূর্তে মনে দাগ কাটে সেই গান। গানটির সুরকার ছিলেন আজাদ রহমান।

সংগীতের ভাষা বদলে দেওয়া এক প্রতিভা

সংগীত গবেষকদের মতে, আজাদ রহমান শুধু গান তৈরি করেননি, বদলে দিয়েছেন বাংলা চলচ্চিত্রের সংগীতের ভাষা। উচ্চাঙ্গসংগীতের শুদ্ধতা, লোকজ আবেগ আর আধুনিক অর্কেস্ট্রেশনের অপূর্ব মেলবন্ধনে তিনি নির্মাণ করেছেন একের পর এক কালজয়ী গান। ‘ভালোবাসার মূল্য কত’ থেকে ‘বন্দী পাখির মতো’, ‘ও চোখে চোখ পড়েছে যখনি’ থেকে ‘ডোরাকাটা দাগ দেখে বাঘ চেনা যায়’—বাংলা গানের শ্রোতাদের আবেগ, প্রেম, বেদনা আর স্মৃতির সঙ্গে মিশে আছে তাঁর অসংখ্য সৃষ্টি।

আজ বরেণ্য এই সংগীতজ্ঞের ষষ্ঠ মৃত্যুবার্ষিকী। ২০২০ সালের এই দিনে হৃদ্‌রোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু হয় আজাদ রহমানের। মানুষ চলে যায়, কিন্তু কিছু সৃষ্টি সময়ের ভেতর থেকেই যায়—আজাদ রহমানের গানও তেমনই।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

তাঁর সুরে বাঁধা অসংখ্য গান এখনো কোটি শ্রোতার আবেগ, স্মৃতি ও ভালোবাসার অংশ হয়ে আছে। ষষ্ঠ মৃত্যুবার্ষিকীতে স্মরণ করা যাক এই গুণী সংগীতজ্ঞের জীবন, সংগীতচর্চা ও বাংলা গানে তাঁর অসামান্য অবদানকে।

বাংলা খেয়ালের জনক

বাংলা খেয়াল নিয়ে দীর্ঘ গবেষণার কারণে তাঁকে বাংলাদেশের বাংলা খেয়ালের জনক বলা হয়। শুধু গবেষণাই নয়, তিনি বাংলা ভাষায় খেয়াল গাওয়ার একটি স্বতন্ত্র ধারা গড়ে তুলেছিলেন। তাঁর লেখা ‘বাংলা খেয়াল’ গ্রন্থ বাংলা একাডেমি থেকে দুই খণ্ডে প্রকাশিত হয়েছে। সংগীতশিক্ষার্থীদের কাছে বইটি এখনো গুরুত্বপূর্ণ রেফারেন্স হিসেবে বিবেচিত।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

সংগীতের ভেতরে বেড়ে ওঠা

১৯৪৪ সালের ১ জানুয়ারি ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলায় জন্মগ্রহণ করেন আজাদ রহমান। দেশভাগের পর পরিবার নিয়ে চলে আসেন ঢাকায়। তখনকার ঢাকা ছিল সাংস্কৃতিকভাবে বদলে যাওয়া এক শহর। পুরোনো কলকাতাকেন্দ্রিক সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে নতুন এক পরিচয় খুঁজছিল পূর্ববাংলা। সেই সময়েই বড় হতে থাকেন আজাদ রহমান।

ছোটবেলা থেকেই সংগীতের প্রতি তাঁর আকর্ষণ ছিল প্রবল। তবে শুধু গানের প্রতি ভালোবাসা নয়, সংগীতকে তিনি দেখতেন সাধনা হিসেবে। পরবর্তী সময়ে কলকাতার রবীন্দ্র ভারতী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উচ্চাঙ্গসংগীতে উচ্চতর ডিগ্রি অর্জন করেন এবং প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হন। সংগীতের শাস্ত্রীয় দিক নিয়ে তাঁর এই গভীর পড়াশোনাই পরে তাঁকে আলাদা উচ্চতায় নিয়ে যায়।

চলচ্চিত্রে আসা, নতুন সুরের ভাষা

চলচ্চিত্রে আজাদ রহমানের পথচলা শুরু ১৯৬৩ সালে কলকাতার ‘মিস প্রিয়ংবদা’ ছবির মাধ্যমে। তবে বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে তাঁর প্রকৃত যাত্রা ‘আগন্তুক’ সিনেমা দিয়ে। এই সিনেমাতেই তিনি নতুন শিল্পী মোহাম্মদ খুরশীদ আলমকে দিয়ে গাওয়ান—‘বন্দী পাখির মতো মনটা কেঁদে মরে’। গানটি প্রকাশের পর শ্রোতাদের মধ্যে দারুণ সাড়া পড়ে যায়।

সেই সময় বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের গান অনেকটাই সরল ধারার ছিল। কিন্তু আজাদ রহমান সেখানে ভিন্ন এক আবহ তৈরি করেন। সমালোচকদের মতে, তাঁর সুরে ছিল বিষণ্নতা, শাস্ত্রীয় ঘরানার পরিশীলন, আবার একই সঙ্গে ছিল চলচ্চিত্রের আবেগ। ফলে তাঁর গান শুধু সিনেমার অংশ হয়ে থাকেনি, আলাদা করেও শ্রোতার হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছে।

ভালোবাসার মূল্য কত

বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের গানের ইতিহাসে ‘ভালোবাসার মূল্য কত’ এক বিশেষ নাম। ১৯৭৫ সালে মুক্তি পাওয়া ‘এপার ওপার’ ছবির এই গান শুধু জনপ্রিয় হয়নি, বাংলা চলচ্চিত্রের গানের ধরনও বদলে দিয়েছিল। এই গান নিয়ে রয়েছে দারুণ এক গল্প। প্রথমে গানটি গাওয়ার কথা ছিল আবদুল জব্বারের। কিন্তু দ্বিগুণ পারিশ্রমিক ছাড়া গানটি গাইবেন না বলে জানিয়ে দেন তিনি। পরে পরিচালক সোহেল রানার অনুরোধে আজাদ রহমান নিজেই গানটি গেয়ে ফেলেন। আর সেখান থেকেই চলচ্চিত্রে প্লেব্যাক শিল্পী হিসেবেও তাঁর নতুন পরিচয়ের জন্ম হয়।

অনেকের মতে, গানটির ভেতরে ছিল একধরনের নরম বিষাদ, যা বাংলা চলচ্চিত্রের গানে আগে খুব কম শোনা গেছে। ‘এ জীবন তুল্য কি তা আমি সে তো বুঝি না’—এই লাইন শুধু প্রেমের নয়, যেন জীবনেরও এক গভীর অনিশ্চয়তার কথা বলে।

মধ্যবিত্তের আবেগের সুর

আজাদ রহমানের গান নিয়ে আলোচনা করতে গেলে একটা বিষয় বারবার সামনে আসে—তাঁর গানে মধ্যবিত্ত জীবনের আবেগ খুব প্রবলভাবে উপস্থিত। তাঁর গানের প্রেম অতিনাটকীয় নয়, বরং চুপচাপ। তাঁর বিষাদও উচ্চকণ্ঠ নয়, নিঃশব্দ। এই কারণেই তাঁর গান শ্রোতাদের ব্যক্তিগত স্মৃতির অংশ হয়ে গেছে।

‘ডোরাকাটা দাগ দেখে বাঘ চেনা যায়’ গানে যেমন ছিল দার্শনিক ভাবনা, তেমনি ‘ও চোখে চোখ পড়েছে যখনি’-তে ছিল প্রেমের ধ্রুপদি আবহ। আবার ‘মনেরও রঙে রাঙাব’-এ ছিল রোমান্টিক উচ্ছ্বাস। সব মিলিয়ে তাঁর সুর করা গানগুলো শুনলে বোঝা যায়, তিনি শুধু সুরকার ছিলেন না—গানের আবহ নির্মাণেও ছিলেন অসাধারণ দক্ষ।

দেশাত্মবোধক গানের অনন্য উদাহরণ

আজাদ রহমানের দেশাত্মবোধক গানগুলোর মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ‘জন্ম আমার ধন্য হলো মাগো’। বরেণ্য একাধিক শিল্পীর কণ্ঠে গানটি পেয়েছিল কালজয়ী মর্যাদা। গানটির বিশেষত্ব ছিল এর আবেগে। এখানে দেশ যেন মায়ের রূপে এসেছে। ফলে গানটি শুধু দেশাত্মবোধক গান হয়ে থাকেনি, বাঙালির ব্যক্তিগত অনুভূতির অংশ হয়ে গেছে।

আধুনিক অর্কেস্ট্রেশনে অবদান

সংগীতবোদ্ধাদের মতে, আজাদ রহমান বাংলা চলচ্চিত্রের সংগীতকে আধুনিক রূপ দিতে বড় ভূমিকা রেখেছেন। তাঁর আগে চলচ্চিত্রের গানে যন্ত্রসংগীতের ব্যবহার তুলনামূলকভাবে সীমিত ছিল। কিন্তু তিনি সেখানে নতুনত্ব নিয়ে আসেন। তাঁর গানে একসঙ্গে শোনা যেত তবলা, বাঁশি, সেতার, হারমোনিয়ামের সঙ্গে গিটার, পিয়ানো, কিবোর্ড ও আধুনিক পারকাশনের ব্যবহার। এই মেলবন্ধন বাংলা গানে নতুন এক সাউন্ড তৈরি করেছিল। তাই তাঁর গান একই সঙ্গে ধ্রুপদি ও আধুনিক হয়ে উঠেছিল।

গীতিকার, গবেষক ও সংগঠক

শুধু সুরকার বা কণ্ঠশিল্পী নন, আজাদ রহমান ছিলেন গীতিকারও। আবার সংগীত গবেষণাতেও ছিল তাঁর গভীর মনোযোগ। দীর্ঘদিন তিনি বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালকের দায়িত্ব পালন করেছেন। বাংলাদেশে উচ্চাঙ্গসংগীতের চর্চাকে জনপ্রিয় করতে তিনি কাজ করেছেন নিবিড়ভাবে। টেলিভিশনে তাঁর উপস্থাপিত অনুষ্ঠান সুর মঞ্জুরি উচ্চাঙ্গসংগীতকে সাধারণ দর্শকের কাছেও পৌঁছে দিয়েছিল।

আজাদ রহমানের আলোচিত ১০ গান

  1. জন্ম আমার ধন্য হলো মাগো
  2. ভালোবাসার মূল্য কত
  3. ডোরাকাটা দাগ দেখে বাঘ চেনা যায়
  4. মনেরও রঙে রাঙাব
  5. ও চোখে চোখ পড়েছে যখনি
  6. আকাশ বিনা চাঁদ থাকিতে পারে না
  7. এক বুক জ্বালা নিয়ে বন্ধু
  8. বন্দী পাখির মতো মনটা কেঁদে মরে
  9. অলিরা গুনগুন গুনগুন গুনগুনিয়ে
  10. ওই মধু চাঁদ আর এই জোসনা

যে কারণে তিনি এখনো প্রাসঙ্গিক

সময় বদলেছে। গান শোনার মাধ্যম বদলেছে। সিনেমার ভাষাও বদলেছে। ক্যাসেট, সিডি বিদায় নিয়ে শতভাগ ডিজিটাল যুগে এখন বিনোদন দুনিয়া। কিন্তু আজাদ রহমানের গান পুরোনো হয়ে যায়নি। কারণ, তাঁর গান শুধু সময়ের জন্য তৈরি হয়নি, মানুষের অনুভূতির জন্য তৈরি হয়েছিল। তাঁর সুরে প্রেম আছে, কিন্তু কৃত্রিমতা নেই। বিষাদ আছে, কিন্তু বাড়াবাড়ি নাটকীয়তা নেই। দেশাত্মবোধ আছে, কিন্তু স্লোগান নেই। আর এ কারণেই তাঁর গান এখনো এত আধুনিক মনে হয়।