আল মাহমুদের কবিতায় প্রাচ্যের নন্দনতত্ত্বের অপূর্ব সমন্বয়
আল মাহমুদের কবিতায় প্রাচ্যের নন্দনতত্ত্বের সমন্বয়

বারবার ফিরে আসি। জেট প্লেন স্পর্শ করে পিচতুমি আছো এ শহরে শুধু এই স্মৃতির কিরিচবাতাসের বুক চিরে বিদ্ধ করে আমাকে একাকীমহাদেশ সমুদ্র ও নদী পার হয়ে কড়া ধরে ডাকিএ গৃহের।তোমার চটির শব্দে নড়ে ওঠে প্রাণ।জানি খুলে যাবে দ্বার। ক্লান্তির আহার দেবে তুমিসকালের প্রাতরাশে যেন উষ্ণ ডিমের কুসুমঘুম ঘুম ফোলা চোখ।হাত ভরা চুড়ির আওয়াজ (পুরানো ঢাকায়) — আল মাহমুদ তাঁর কবিতায় প্রাচ্যের নন্দনতত্ত্ব প্রকাশ করেছেন। তিনি দেশজ উপাদান, লোকজ ঐতিহ্য ও প্রাচ্যের মিথ বা পৌরাণিক কাহিনির অপূর্ব ও শিল্পিত সমন্বয় করে কবিতার আকার দিয়েছেন। তাঁর কাব্যে পূর্বসূরিকে অন্ধ অনুসরণ না করে এবং পাশ্চাত্য নন্দনতত্ত্বকে অনেকটা পাশ কাটিয়ে স্থানীয় চিরায়ত সৌন্দর্য প্রকাশ করেছেন। একইসঙ্গে তিনি যাপিত জীবন, প্রেম-ভালোবাসা ও স্বদেশভূমিকে প্রাধান্য দিয়েছেন। কবিতায় এসব বৈশিষ্ট্য তাকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছে।

লোকজ ঐতিহ্য ও প্রাচ্যের নন্দনতত্ত্বের সমন্বয়

আল মাহমুদ বাংলার লোকচেতনা, সংস্কৃতি, ধর্মীয় বিশ্বাস ইত্যাদি তুলে ধরে কবিতাকে নতুন ফর্মে ঢালতে চেয়েছেন। আবহমানকালের গভীর সংস্কৃতির বিশ্লেষণ ও প্রকাশ নন্দনতত্ত্বে এনেছে বৈপ্লবিক পরিবর্তন। আল মাহমুদ ‘মানবিকতা ও নন্দনতত্ত্ব’ নির্মাণ করেছেন আধুনিক কাব্যভাষার মাধ্যমে। চিত্রকল্প নির্মাণে সার্থকতার পরিমাপের উপর কবিতাশৈলী নির্ভর করে থাকে। আধুনিক কবিতায় ‘মানবিক সত্তা’ থাকতে হবে—‘মানুষ’ই হবে কবিতার প্রধান উদ্দেশ্য। আল মাহমুদ চিত্রকল্প নির্মাণে সার্থক। তিনি চিত্রকল্প নির্মাণে গ্রামীণ, লোকজ ও ঐতিহ্যের উপাদানসমূহ অনুষঙ্গ করেছেন। ‘মানুষ’-কে তিনি মধ্যমণি করেছেন। নারী, স্বদেশ ও প্রেমে প্রকৃতির মেলবন্ধন করেছেন। সর্বোপরি, সব বিষয়ে নন্দনত্তত্বকে আলোয় এনেছেন। তাঁর চিত্রকল্পই বলি কিংবা শব্দরাশির কথা বলি, বেশিরভাগ অংশ জুড়ে রয়েছে গ্রামীণ, লোকজ কিংবা প্রাচ্যের বিভিন্ন অনুষঙ্গ।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

কবিতা দর্শনের ভিত্তি

‘কবিতা এমন’ কবিতায় আল মাহমুদ কবিতা কেমন হবে, কবিতার ভাষায় কী থাকবে, শব্দভাণ্ডার কোথা থেকে সংগ্রহ করতে হবে তা বলার চেষ্টা করেছেন—যা মূলত তাঁর কবিতা দর্শনের প্রধান ভিত্তি: "কবিতা তো কৈশোরের স্মৃতি। সে তো ভেসে ওঠা ম্লানআমার মায়ের মুখ; নিম ডালে বসে থাকা হলুদ পাখিটিপাতার আগুন ঘিরে রাতজাগা ভাই-বোনআব্বার ফিরে আসা, সাইকেলের ঘণ্টাধ্বনি—রাবেয়া রাবেয়া—আমার মায়ের নামে খুলে যাওয়া দক্ষিণের ভেজানো কপাট!কবিতা তো ফিরে যাওয়া পার হয়ে হাঁটুজল নদীকুয়াশায়-ঢাকা-পথ, ভোরের আজান কিম্বা নাড়ার দহনপিঠার পেটের ভাগে ফুলে ওঠা তিলের সৌরভমাছের আঁশটে গন্ধ, উঠানে ছড়ানো জাল আরবাঁশঝাড়ে ঘাসে ঢাকা দাদার কবর।"

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

নন্দনতত্ত্ব হচ্ছে শিল্প ও সৌন্দর্য বিষয়ক ধারণা। এটি শুধু বাহ্যিকভাবে নয় আধ্যাত্মিক, প্রকৃতি ও মানুষের মধ্যে মেলবন্ধন করে গভীর উপলব্ধিকে পরিচালিত করে। প্রাচ্যের নন্দনতত্ত্ব হচ্ছে ভারতীয়, জাপানি ও চীনা দর্শনের উপর গড়ে ওঠা শিল্প ও সৌন্দর্য। প্রাচ্যের নন্দনতত্ত্বের প্রধান একটি বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, প্রকৃতি ও মানুষের মধ্যে যোগসূত্র স্থাপন। রস, তত্ত্ব ইত্যাদির মাধ্যমে আনন্দ লাভ করাও প্রাচ্যের নন্দনতত্ত্বের মহত্ত্ব। শিল্পকর্মে শূন্যস্থান পূরণ (White Space) ও নান্দনিক ব্যবহার প্রাচ্যরীতির অন্যতম বৈশিষ্ট্য। প্রাচ্য নন্দনতত্ত্বে প্রধান যে বিষয়টি বুঝে নিতে হয়, তা হচ্ছে প্রকৃতি ও মানুষের সম্পর্ক একাত্ম বা পরিপূরক। আল মাহমুদের কবিতায় এ দিকটি জোরালো হয়েছে। তাঁর কবিতায় গ্রামীণ বাংলার লোকজ উপাদান ও উপমা-অলংকারাদি প্রাচ্য নন্দন-ভাবনার এক সফল প্রয়োগ হয়েছে বলে মনে করা হয়।

প্রকৃতি ও নারীর অনুষঙ্গ

আল মাহমুদের কবিতা পাঠ করলে প্রাচ্যের নন্দনতত্ত্ব ফুটে ওঠার বিষয়টি আরও পরিষ্কার হয়। তাঁর কবিতায় ভারতীয় সংস্কৃতির জোরালো প্রভাব রয়েছে। এছাড়া এশীয় বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য, সৌন্দর্য, ধর্মীয় বিষয়াদি, ঐতিহ্য কিংবা ইতিহাসের বিভিন্ন অনুষঙ্গ কবিতায় চলে এসে নন্দনতত্ত্বকে আরও উঁচুতে নিয়ে গিয়েছে। এক্ষেত্রে আল মাহমুদের কবিতার বিশাল সার্থকতা। "আলোকে উসকে দিই? বললো সে। বললাম, থাক।আঁধারে কিসের গন্ধ আমাকে বুঝতে দাও জেগেএকটু নীরব থেকে দেখা যাক কিসের আবেগেমানুষের ঘুম পায়। যাও তুমি। পৃথিবী ঘুমাক।হাই তুলে হাসলো সে। তারপর সরে গেলো দূরে।তার দেহে লেগে বুঝি এই রাত্রি গাঢ় হলো আরোজমাট চুলের রং হাত দিয়ে যত তুমি নাড়ো। একটুও মুছবে না।" (রাত/ লোক লোকান্তর)

আল মাহমুদের কবিতার প্রধান বিষয়বস্তু হচ্ছে প্রেম, প্রকৃতি ও স্বদেশভূমি। তাঁর কবিতায় নিসর্গমণ্ডল হয়েছে প্রধান আশ্রয়। প্রেম বলি কিংবা স্বদেশপ্রেমের ক্ষেত্রেও নিসর্গ ঢুকিয়ে দিয়েছেন সুবিন্যস্ত ও অপূর্ব শব্দচয়নে। তাঁর অন্ত্যমিলের কবিতা অনেক। সেখানে শব্দচয়নে চলে এসেছে প্রকৃতি আর আবহমান বাংলার সংস্কৃতি কিংবা ধর্মীয় শ্রদ্ধাবোধ। প্রাণের সাথে প্রকৃতির সমন্বয় ভাষা, বাস্তবতা ও কাব্যশৈলীকে জীবন্ত করেছে। গতিপ্রকৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ শব্দাবলি কবিতায় প্রয়োগ করেছেন অবলীলায়। উপমা কিংবা অলংকার প্রয়োগে কবি আল মাহমুদ এসব বিষয়াদি দিয়ে পাঠককে তৃপ্ত করতে চেয়েছেন। পাঠকগণ তৃপ্তি পেয়েছেন বলেই তিনি জনপ্রিয় কবি হয়েছেন। যতই দিন যাচ্ছে কবি হিসাবে জীবনানন্দ দাশের পরেই বাংলাদেশে আল মাহমুদের কবিতা পাঠক ও আলোচনার পরিমাণ বেড়ে যাচ্ছে। শব্দ প্রয়োগ ও ব্যবহারে দারুণ দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন। এখানেও প্রকৃতি ও নারী অন্যতম প্রধান অনুষঙ্গ হয়েছে। সবক্ষেত্রেই সৌন্দর্যকে প্রকাশ করতে চেয়েছেন, সৌন্দর্যকে ফুটিয়ে তুলতে বিষয়াদির গভীরে প্রবেশ করেছেন, সর্বোপরি নিজের অভিজ্ঞতাকে প্রয়োগ করেছেন কবিতায়।

প্রেমের কবিতায় নন্দনতত্ত্ব

আল মাহমুদের নন্দনতত্ত্ব নির্মাণকলা ও কৌশলে নতুনতর অনভূতির আবহ সৃষ্টি করেছে। তাঁর কবিতায় বড়ো অংশ জুড়ে আছে নারী ও প্রেম। প্রেমের বিভিন্ন আঙ্গিক। এছাড়া প্রকৃতি, নদী, ধর্মীয় অনুভূতি, দেশকাল, সমাজ, ঐতিহ্য, ইতিহাসের নানা মাত্রিক চিন্তার প্রতিফলনের নবতর ভাষার প্রয়োগ ও প্রকাশ কবিতায় ভাষায় এনেছে যৌবন ও শক্তি। কবিতার ভাষাকে নন্দনবোধে রূপায়িত করেছেন এবং যে শক্তি, স্বতঃস্ফূর্ততা, বোধ, জানা ও প্রকাশের পরিধির ব্যাপকতা আল মাহমুদের কবিতাকে অনন্য করেছে এবং উন্নত উচ্চতায় নিয়ে গেছে। তাঁর কবিতা পাঠ করে অনুসন্ধিৎসু পাঠক নতুন জগতে প্রবেশ করে নন্দনবোধের আটলান্টিক মহাসাগরের প্রবেশ করতে সক্ষম হবেন।

আল মাহমুদের প্রেমের কবিতাগুলোতে মূলত কবির প্রেমিক সত্তা প্রধান হয়ে উঠেছে। নর-নারীর যাপিত জীবন কখনো শরীরী প্রেম, কখনো প্লেটনিক প্রেম নন্দন হয়ে উঠেছে। আল মাহমুদ প্রেমের কবিতাগুলিতে নান্দনিকভাবে ব্যবহার করেছেন বিভিন্ন লোকজ ও গ্রামীণ উপাদান। নারীদেহের বর্ণনায় তিনি প্রকৃতির বিভিন্ন উপাদান ব্যবহার করেছেন। বিভিন্ন প্রাণী, ফল, গাছপালা, নদী, আকাশ ইত্যাদি প্রসঙ্গ চলে এসেছে অবলীলায়। ‘প্রাচ্যের নন্দন ভাবনা’ কবিতার ভাষাকে করেছে আরও মোহনীয়, আরও সুন্দর ও নন্দন। প্রাচ্যের নন্দনতত্ত্ব নিজের শেকড়ের কাছেই বেঁধে দিয়েছেন। আল মাহমুদের প্রেম ও নারীর প্রকাশের ক্ষেত্রে পাবলো নেরুদার নন্দনতত্ত্ব লক্ষ্য করা যায়। প্রকাশের ভাষার ক্ষেত্রে বৈচিত্র্যময়তা ও ভঙ্গি বিশ্বকবিতার আলোচনায় নিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছে। প্রেম ও নারীর প্রতি সম্পর্ক কীরূপ হবে (কবির ক্ষেত্রে) তা বলে দিয়েছেন বিভিন্ন কবিতায়—বিশেষকরে সনেটগুচ্ছে তা জোরালো হয়েছে।

সোনালি কাবিন: নন্দনের অনন্য উদাহরণ

বিয়ের সময় দেনমোহর নারীর হক এবং ইসলাম ধর্মীয় মতে আবশ্যিক কাজ। কিন্তু, বাংলার অনেক পুরুষের প্রেম আছে, নারীর প্রতি অগাধ টান আছে; কিন্তু আর্থিক অনটন আছে। কবি নারীকে বলতে চান যে, তাঁর প্রেম আছে মন আছে। ভালোবাসায় ভরিয়ে দিতে চান আজীবন। কিন্তু তাঁর আর্থিক কমতি আছে, কিন্তু প্রেমে কোনো ঘাটতি থাকবে না! ‘সোনালি কাবিন’ সনেটগুচ্ছের ০১ নম্বর সনেটে অকপটে, কী নান্দনিকতায় বলে দিলেন অস্ফুট কথা, মনের কথা, নিজের সীমাবদ্ধতা! "সোনার দিনার নেই, দেনমোহর চেয়ো না হরিণীযদি নাও, দিতে পারি কাবিনবিহীন হাত দু’টি,আত্নবিক্রয়ের স্বর্ণ কোনোকালে সঞ্চয় করিনিআহত বিক্ষত করে চারিদিকে চতুর ভ্রুকুটি;ভালোবাসা দাও যদি আমি দেব আমার চুম্বন,ছলনা জানিনা বলে আর কোনো ব্যবসা শিখিনি;দেহ দিলে দেহ পাবে, দেহের অধিক মূলধন?আমার তো নেই সখি, যেই পণ্যে অলংকার কিনি।" (সোনালি কাবিন-০১/আল মাহমুদ)

আল মাহমুদ বাংলা কবিতায় শক্তিমান ও স্বতন্ত্র কণ্ঠস্বর হিসাবেই আবির্ভূত হয়েছেন। কবিতার ভাষা, বিষয়বস্তু ও আঙ্গিকে নতুনভাবে উপস্থাপন করেছেন। আল মাহমুদ তিরিশের কবিতা থেকেও নিজেকে আলাদা করতে সক্ষম হয়েছেন। তাঁর কবিতার প্রধান একটি গুণ হচ্ছে নতুন চিন্তার বহিঃপ্রকাশের মাধ্যমে নন্দনতত্ত্বের অনন্য প্রকাশ বা প্রতিফলন। পঞ্চাশোত্তর কবিতায় তিনি নতুন মাত্রা যোগ করতে সক্ষম হয়েছেন। যাপিত জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ের চিত্র ও মনস্তত্ত্বকে কবিতার ভাষায় রূপ দিয়েছেন। আবহমান গ্রামীণ পরিবেশ ও সংস্কৃতি এবং তাদের সৌন্দর্য আল মাহমুদের কবিতায় প্রগাঢ়ভাবে ফুটে উঠেছে।