অলংকরণ: মাসুক হেলাল
একসময় চা-সিগারেটের প্রতি আসক্তি থাকলে ও বর্তমানে সিগারেটকে বিদায় দিয়ে শুধু চা পানের অভ্যাসটাই জিইয়ে রেখেছি। ন্যূনতম প্রতিদিন তিনবার চা খেতে হয়। যেদিন আমার প্রফেশনাল কাজের একাগ্রতায় ডুবে থাকি, সেদিন সংখ্যা আরও ছাড়িয়ে যায়। যাক, সেদিন দুপুরে বিরতির পর প্রতিদিনের মতো ভাতঘুম দিয়েই কর্মস্থলের উদ্দেশে রওনা হলাম। ঢুলু ঢুলু চোখ। ঘুমের রেশ যেন কিছুতেই কাটছে না। সোজা অফিসে না গিয়ে অতিপরিচিত মাড়োয়ারি ক্যাফেটেরিয়ার দিকে এগোলাম। আমার বাসা থেকে নিচে নামতেই মেইন স্ট্রিটেই ক্যাফেটেরিয়া। বেশ সাজানো–গোছানো, পরিষ্কার–পরিচ্ছন্ন পরিবেশ, খাবারের মানের জন্য এ এলাকায় বেশ সুখ্যাতি রয়েছে।
কাক ফাটা দুপুর। গরমের তীব্রতাও বেশি, না, নাতিশীতোষ্ণ আবহাওয়া বলা চলে। এ সময় তেমন ঝামেলা থাকে না বলে বেশ আয়েশ করে চা পান করা যায়। অবিন্যস্ত টেবিলের মাঝেমধ্যে দু–চারজন এদিক–ওদিক থাকলেও আমার দৃষ্টি নিবন্ধ হলো অন্য পাশে। চেয়ারের ওপর দাঁড়িয়ে ফুটফুটে চেহেরার ৪-৫ বছরের এক শিশুকন্যা। খঞ্জনা পাখির মতোই চঞ্চল চাহনি। নিষ্পাপ হাস্যোজ্জ্বল ফুলের মতো পাপড়িগুলো যেন আছড়ে পড়ছে। স্বভাবতই এ রকম নান্দনিক মুহূর্তের লোভ সামলাতে না পেরে আমি অন্যদিকে না বসে একদম সে টেবিলের মুখোমুখি চেয়ারে বসলাম। কন্যা–পিতার খুনসুটি আর মাঝেমধ্যে শিশুটির আড়চোখে তাকানোর মায়াময় দৃশ্য কিছুক্ষণের জন্য আমাকে ভাবনার রথে সুদূর মরুভূমির ছেড়ে স্বদেশে আমার আঙিনায় নিয়ে গেল।
নাগরিক সংবাদে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]
আমার ভাইঝি নাম আদৃ। সবার খুব আদরের তবে সব সময় আমার আশপাশেই ঘুরঘুর করত। যতক্ষণ আমি ঘরে থাকি, আমাকে ছুঁয়ে ছুঁয়ে থাকে। ঠিক এই শিশুর বয়সেই আমি বাড়ি ছেড়ে প্রবাসে ফেরত আসি। আমি যা খেতাম, সেটাও তার খেতে হতো। এমন কি ওষুধ হলেও সেটা তার চায়। ওষুধ তেতো হলে মুখ ভেংচিয়ে ফেলে দিত, আবার যখন কোনো খাবার খেতে মন চাইত না, অথবা পরিতৃপ্তির পর উচ্ছিষ্ট খাবার থাকত, তা নিয়ে আমাকে এমনভাবে জোর করত, যেন আদর করে খাওয়াচ্ছে ,আমি খেতে না চাইলে আমার কাঁধের ওপর এক হাত রেখে বিড়ালের মতো আহ্লাদ দিয়ে বলত, ‘আমার পুষোপুষো খাও।’ আমি আসল ঘটনা বুঝতে পারলে মুচকি হেসে ভাব জমাত।
এ রকম খুনসুটিগুলোই যেন এখন আমার সামনে। বাবাকে বারবার সাধছে আর বাবা ‘না, না’ করছে। আমি একদৃষ্টিতে দেখে আছি। চোখাচোখি হতেই লজ্জায় ফিক করে হেসে দিল। বিনিময়ে আমিও হাসলাম। বাবা তার মেয়ের সাধাসাধিতে বিব্রত হয়ে শেষ পর্যন্ত ক্যাফেটেরিয়ান টিস্যু দিয়ে মুডিয়ে নিল। ইচ্ছে করছিল, আমার আদৃর মতো আদর করি। পিঠে তুলে নিয়ে কতক্ষণ ঘুরে বেড়ায়। কিন্তু হাজারো মন চাইলেও তা তো সম্ভব নয়।
খাওয়া শেষ করে বাবা–মেয়ে দুজনেই উঠে গেল। বাবা মেয়েকে টেনে চেয়ার থেকেই ওঠাতেই হতবিহ্বল হয়ে গেলাম। মেয়েটা খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাটছে—একটু দূরে যেতেই স্পষ্ট হলো। এক পা কৃত্রিম। চিনচিনে ব্যথায় ভেতরে মোচড় দিয়ে উঠল। অনেকক্ষণ নির্বাক দৃষ্টিতে তাকিয়েছিলাম। আহারে! ফুলের মতো নিষ্পাপ চেহারার এত সুন্দর মেয়েটি কী কম বয়সেই না তার পা হারাল। না জানি কী দুর্ঘটনার শিকার হয়েছিল। মনকে প্রশ্ন করতে করতে হঠাৎ বেয়ারা সামনে দাঁড়িয়ে ‘আপকা চায়ে’...শব্দে সংবিৎ ফিরে পেলাম।
*লেখক: সেলিম আহমেদ, মধ্যম বুড়িশ্চর, হাটহাজারী-৪৩৩৭, চট্টগ্রাম
পাঠক থেকে আরও পড়ুন: স্মৃতিচারণ, নাগরিক সংবাদ, পাঠকগল্প, দুর্ঘটনা



