দেশের সর্ববৃহৎ নির্বাণশয্যা বুদ্ধমূর্তি নির্মাণাধীন
কক্সবাজারের রামুর রাংকুট বনাশ্রম বৌদ্ধ বিহারে নির্মাণাধীন ১৫০ ফুট দীর্ঘ নির্বাণশয্যা বুদ্ধমূর্তি দেশের সর্ববৃহৎ। ইতিমধ্যে মূর্তিটির ৮০ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে এবং খরচ হয়েছে এক কোটি টাকার বেশি।
রামুর দক্ষিণমিঠাছড়ির জোয়ারিয়ানালার পাহাড়চূড়ায় বর্তমানে ১০০ ফুট লম্বা সিংহশয্যা বুদ্ধমূর্তি রয়েছে, যা এত দিন পর্যটকদের প্রধান আকর্ষণ ছিল। এবার রাংকুট বনাশ্রম বৌদ্ধ বিহারের পাহাড়ের ঢালুতে নির্মিত হচ্ছে ১৫০ ফুটের নির্বাণশয্যা বুদ্ধমূর্তি।
নির্বাণশয্যা ও সিংহশয্যার পার্থক্য
বৌদ্ধধর্মগ্রন্থ অনুযায়ী, সিংহশয্যায় বুদ্ধকে প্রশান্ত বিশ্রামের ভঙ্গিতে দেখানো হয়, যেখানে তিনি সিংহের মতো শয়ন করতেন। অন্যদিকে নির্বাণশয্যা বুদ্ধের শেষ মুহূর্তের শয়নভঙ্গি ধারণ করে, যা জাগতিক মোহ ও দুঃখ থেকে পরম মুক্তি লাভের গভীর ও শান্ত রূপ প্রকাশ করে। মূর্তিতে বুদ্ধকে ডান দিকে কাত হয়ে শায়িত অবস্থায় দেখানো হয়, ডান হাত মাথার নিচে ভাঁজ করে এবং বাঁ হাত শরীরের ওপর লম্বালম্বিভাবে প্রসারিত থাকে।
মূর্তিটির উচ্চতা ২৫ ফুট। নির্মাণ শেষে এটি দেশের সর্ববৃহৎ নির্বাণশয্যা বুদ্ধমূর্তি হবে।
অর্থায়ন ও নির্মাণ অগ্রগতি
রাংকুট মহাবিহারের পরিচালক ও অধ্যক্ষ কে শ্রী জ্যেতিসেন থের প্রথম আলোকে জানান, মূর্তিটি বিভিন্ন ব্যক্তির অনুদানের টাকায় নির্মিত হচ্ছে। ইতিমধ্যে এক কোটি টাকার বেশি খরচ হয়েছে এবং ৮০ শতাংশ কাজ শেষ। অবশিষ্ট কাজ ও আশপাশের পরিবেশ উন্নয়নে আরও কোটি টাকা খরচ হবে।
মূর্তির ভেতরে ভিক্ষু সংঘের ধ্যানের পরিবেশ রাখা হচ্ছে, যেখানে অন্তত ১০০ জন ভিক্ষু ধ্যানে মগ্ন থাকবেন। ধ্যানের জন্য মূর্তির ভেতরে একাধিক দরজা রাখা হচ্ছে।
শিল্পী ও স্বকীয়তা
নির্বাণশয্যা বুদ্ধমূর্তির মূল কারিগর উখিয়ার পুরোনো রুমখাঁ গ্রামের বাসিন্দা কারুশিল্পী উত্তম বড়ুয়া। তিনি দেশের গণ্ডি পেরিয়ে ভারতেও শিল্পকর্ম করেছেন। শিল্পী উত্তম বড়ুয়া বলেন, মিয়ানমার, থাইল্যান্ড, চীন, জাপানসহ এশিয়ার দেশগুলোতে এর চেয়েও দীর্ঘ শায়িত বুদ্ধমূর্তি থাকলেও নির্মাণশৈলী ও প্রেক্ষাপটে রামুর নির্বাণশয্যা স্থাপনাটির পৃথক স্বকীয়তা রয়েছে। এটি কংক্রিট স্থাপত্যের নিদর্শন হিসেবে এশিয়ার বৌদ্ধ ভাস্কর্য শিল্পেও বিশেষ জায়গা করে নেবে।
রাংকুট বনাশ্রম বৌদ্ধ বিহারের ঐতিহ্য
বৌদ্ধ ভিক্ষুদের মতে, সম্রাট অশোকের সময়কালে রাংকুট বনাশ্রম বৌদ্ধ বিহার প্রতিষ্ঠিত হয়। বিহারে গৌতম বুদ্ধের পবিত্র অস্থি ধাতু বা বুকের হাড় সংরক্ষিত আছে, যা একে বৌদ্ধধর্মাবলম্বীদের পবিত্র তীর্থস্থানে পরিণত করেছে। বিহারের নামকরণের পেছনেও রয়েছে এই অস্থি ধাতু; ‘রাং’ অর্থ বুদ্ধের বক্ষাস্থি এবং ‘কূট’ অর্থ পর্বত বা চূড়া, মিলে ‘রাংকুট’ অর্থ ‘বুদ্ধের বক্ষাস্থিসংবলিত পর্বত’।
বিহারের প্রধান ফটকে লেখা আছে, প্রতিষ্ঠাতা সম্রাট অশোক, স্থাপিত ২৬৮ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ। মূল ফটক দিয়ে প্রবেশ করতেই ‘ঐতিহাসিক বুদ্ধনগর’, যেখানে গৌতম বুদ্ধের ৮৪ হাজার বাণী ধারণ করে ৮৪টি সারিবদ্ধ মূর্তি স্থাপন করা হয়েছে, যা দেশের অন্য কোথাও নেই। এছাড়াও রয়েছে জাদুঘর, বিশাল বটবৃক্ষ, ড্রাগন সিঁড়ি, বোধি মন্দির, ব্রিটিশ কেল্লা, অ্যাকুয়ারিয়াম, মাটির নিচে ধ্যান গুহা, রাংকুট মিরাকল গার্ডেন ও ঝুলন্ত সেতু ‘প্রজ্ঞাবংশ ফ্লাইওভার’।
ভ্রমণ তথ্য
কক্সবাজার শহর থেকে ২৭ কিলোমিটার দূরে রাংকুট বনাশ্রমের অবস্থান। প্রতিদিন সকাল ৭টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত মহাবিহার ভ্রমণের সুযোগ রয়েছে। টিকিটের মূল্য ২০ টাকা।



