কথাসাহিত্যিক আশিক হোসেনের মৃত্যুর পর তাঁর পরিবারের প্রতি মানবিকতা দেখিয়েছে টাইম প্রকাশনী। প্রকাশনীর পক্ষ থেকে লেখকের স্ত্রীকে একটি সম্মানীর চেক পাঠানো হয়। এই ঘটনা প্রকাশ পেয়েছে এক সাংবাদিকের বর্ণনায়, যিনি নিজে ওই চেক পৌঁছে দিতে গিয়েছিলেন।
লেখকের বাড়িতে প্রথম সাক্ষাৎ
বছর কয়েক আগে আশিক হোসেনের বাসায় পাণ্ডুলিপি নিতে গিয়েছিলেন টাইম প্রকাশনীর কর্মী ইসমাইল হোসেন। তখন লেখকের স্ত্রীর সঙ্গে তাঁর প্রথম সাক্ষাৎ হয়। লেখকের স্ত্রী তখন অভিমান করে বলেছিলেন, তাঁর স্বামীর বইগুলো দেখলে তাঁর গায়ে জ্বালা করে। বইগুলোকে তিনি ইটের সঙ্গে তুলনা করেছিলেন।
সেদিন লেখকের বসার ঘর ছিল অত্যন্ত সাধারণ। পুরোনো সোফা, বেতের টি-টেবিল—কোনো জাঁকজমক ছিল না। লেখকের স্ত্রী জানিয়েছিলেন, তিনি লেখকের লেখালেখির বিষয়ে কিছুই জানেন না এবং বই দেখলেই তাঁর রাগ হয়।
লেখকের মৃত্যু ও পরিবারের দুর্দশা
কিছু বছর পর আশিক হোসেন ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। তাঁর চিকিৎসায় প্রচুর টাকা খরচ হয়। শেষ পর্যন্ত তাঁর পরিবার রংপুরে স্ত্রীর বাপের বাড়িতে আশ্রয় নেয়। লেখকের আদি বাসা বিক্রি করে দিতে হয় চিকিৎসার খরচ জোগাতে।
ইসমাইল হোসেন এখন টাইম প্রকাশনীর এরিয়া ম্যানেজার। প্রকাশক তাঁকে একটি খাম দিয়ে বলেন, ‘এই চেকটা আশিক হোসেনের পরিবারকে পৌঁছে দিয়ো। আর বোলো, প্রতিবছরই আমি চেক পাঠানোর চেষ্টা করব। লেখকের কাছে টাইম প্রকাশনী পরিবার কৃতজ্ঞ।’
দ্বিতীয় সাক্ষাৎ: জীর্ণ বাড়ি ও আবেগঘন মুহূর্ত
ইসমাইল হোসেন রংপুরে লেখকের শ্বশুরবাড়িতে গিয়ে দেখেন, বাড়িটা জীর্ণ। দেয়ালের প্লাস্টার খসে পড়ছে, সিঁড়ি নোংরা। দরজায় কড়া নাড়ার পর লেখকের স্ত্রী বেরিয়ে আসেন। প্রথমে তাঁকে চিনতে পারেননি ইসমাইল।
ভেতরে ঢুকে তিনি দেখেন, ঘরে কোনো সোফা নেই, শুধু একটি পুরোনো কাঠের চেয়ার ও ছোট টেবিল। কম আলোর বাতি জ্বলছে। লেখকের স্ত্রী জানান, চিকিৎসার খরচের জন্য সব বিক্রি করতে হয়েছে।
ইসমাইল চেকের খাম বের করে দেন। লেখকের স্ত্রী খাম নিয়ে অনেকক্ষণ চুপচাপ বসে থাকেন। পরে আবেগাপ্লুত হয়ে বলেন, ‘ভাবতেই পারিনি তার লেখা বইগুলোর জন্য এত দিন পরে কেউ টাকা দেবে।’
অভিমানের জবাব
চলে যাওয়ার সময় ইসমাইল লেখকের স্ত্রীকে প্রশ্ন করেন, ‘সেদিন আপনি বলেছিলেন, স্যারের বইগুলোকে দেখলে আপনার গা জ্বালা করে। বইগুলোকে একেকটা ইট মনে হয় আপনার। আজ এত দিন পরে সেই ইটগুলোর জন্য সম্মানীর চেক পেয়ে কেমন লাগছে আপনার?’
লেখকের স্ত্রী রাগ না করে বলেন, ‘সেটা তো ছিল আমার রাগের কথা। অভিমানের কথা। তোমার স্যার লেখক হিসেবে খ্যাতি পাওয়ার পর আমাকেই ভুলে গেল। দিনরাত শুধু লিখত। আর পত্রপত্রিকায়, টিভিতে সাক্ষাৎকার দিত—এসব নিয়েই ব্যস্ত থাকত। অথচ খ্যাতি পেয়ে আমাকেই সে ভুলে গেল! এ কেমন কথা!’
এই বলে তিনি দরজা বন্ধ করে দেন। ইসমাইল স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকেন।



