মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা আলী খামেনিছবি: কোলাজ। সমঝোতা স্মারক সই হতে না হতেই আবারও পাল্টাপাল্টি হামলায় জড়িয়েছে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান। এতে এই সমঝোতা চুক্তি কতটা নাজুক অবস্থায় রয়েছে, তা প্রকাশ পেয়েছে। একই সঙ্গে এটা স্পষ্ট হয়েছে, যুদ্ধ বন্ধের পেছনে উভয় পক্ষেরই বড় জাতীয় স্বার্থ রয়েছে।
সংঘাতের পটভূমি ও কৌশলগত যৌক্তিকতা
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র মূলত অস্পষ্ট সমঝোতা স্মারক সুনির্দিষ্ট করতে এবং ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিসহ আসন্ন আলোচনায় নিজেদের অবস্থান সুবিধাজনক করতেই এই সংঘাতে জড়িয়েছিল। ট্রাম্প প্রশাসনের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, সংঘাত বন্ধ করে আজ মঙ্গলবার কাতারে বৈঠকে বসতে দুই পক্ষ সম্মত হয়েছে।
হরমুজ প্রণালি সংকট
বাণিজ্যিক জাহাজে ইরানের হামলা এবং মার্কিন ঘাঁটি ও উপসাগরীয় মিত্রদের ওপর তেহরানের পাল্টা হামলার কারণে পরিস্থিতি বড় সংঘাতের দিকে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছিল, যা বৈশ্বিক অর্থনীতি ও তেল পরিবহনকেও বাধাগ্রস্ত করছিল। ইরান তার নতুন কৌশলগত সুবিধা—বিশ্ব অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে চাইছিল। একই সঙ্গে তেহরান ট্রাম্পের ওপর রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি করতে এবং তাঁর ধৈর্যের পরীক্ষা নিতে চেয়েছিল।
ওয়াশিংটন কোনোভাবেই হরমুজ প্রণালির ওপর ইরানের নিয়ন্ত্রণ মেনে নেবে না বলে জানিয়েছে। হরমুজে ইরানের নিয়ন্ত্রণ মেনে নিলে যুক্তরাষ্ট্রের শুরু করা যুদ্ধে তাদের পরাজয়ই মেনে নেওয়া হতো। এতে ইরান যেকোনো মুহূর্তে বিশ্ব অর্থনীতিকে জিম্মি করার ক্ষমতা পেয়ে যেত এবং অঞ্চলে মার্কিন প্রভাব দুর্বল হতো।
ট্রাম্পের হুমকি ও ইরানের প্রতিক্রিয়া
গত সপ্তাহে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর উপসাগরীয় সফরের পর ইরানের এই আগ্রাসী মনোভাব দেখা যায়। ওই সফরে যুক্তরাষ্ট্র ও মিত্ররা ইরানের টোল বা নিয়ন্ত্রণ ছাড়াই মুক্ত নৌ চলাচলের পক্ষে সমর্থন জানায়। তবে এই পাল্টাপাল্টি হামলার চক্রটি ছিল অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। গত রোববার ট্রাম্প হুমকি দিয়ে বলেন, ইরান যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করলে তার ‘কোনো অস্তিত্ব থাকবে না’। তবে ইরান ট্রাম্পের এমন বক্তব্যকে খুব একটা গুরুত্ব দেয়নি।
উভয় পক্ষের লাভ ও ভবিষ্যৎ আলোচনা
তা সত্ত্বেও এই উত্তেজনার পেছনে সব সময়ই একটি কৌশলগত যৌক্তিকতা ছিল, যা পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ আটকে দিয়েছে। ইরান এই সমঝোতা থেকে বিপুল সুবিধা পাচ্ছে। চূড়ান্ত চুক্তির অপেক্ষায় যুক্তরাষ্ট্র নিষেধাজ্ঞা শিথিল করায় তেহরান আবারও তেল রপ্তানি শুরু করেছে। এদিকে হরমুজ প্রণালিতে নৌ চলাচল বৃদ্ধি পাওয়ায় বৈশ্বিক বাজারে তেলের দাম কমেছে, যা মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ট্রাম্পের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
অবশ্য হরমুজ প্রণালি নিয়ে এই তীব্র মতবিরোধ ট্রাম্পের পদক্ষেপ নিয়ে নতুন প্রশ্ন তুলছে। বর্তমানের এই অচলাবস্থা ইঙ্গিত করছে, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির মতো জটিল বিষয়ে ভবিষ্যৎ আলোচনা আরও কঠিন হবে। জাতিসংঘে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত মাইক ওয়ালৎস সতর্ক করে বলেছেন, ইরানের যেকোনো আগ্রাসনের উপযুক্ত জবাব ট্রাম্প দেবেন।
বিশেষজ্ঞদের মতামত ও রাজনৈতিক প্রভাব
সাবেক জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা জ্যাক সুলিভান ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন, এই আলোচনা চলাকালে একটি উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে। তিনি বলেন, ইরানিরা হরমুজ প্রণালির ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে। আবার ট্রাম্প প্রশাসন যখন তীব্র আপত্তি জানাচ্ছে, তখন তারা পিছু হটছে।
কংগ্রেসে এই চুক্তি নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে কাদা-ছোড়াছুড়ি আবার বাড়ছে। মূল প্রশ্ন হলো, এই সংঘাত নিয়ন্ত্রণযোগ্য পর্যায়ে থাকবে, নাকি পুরো কূটনৈতিক প্রক্রিয়াকে ধ্বংস করে অঞ্চলটিকে আবারও পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধের দিকে ঠেলে দেবে। একটি নাজুক শান্তি ফিরে এলেও ট্রাম্পের জন্য এই যুদ্ধ থেকে সহজে বেরিয়ে আসার কোনো সহজ পথ নেই।



