আজ ৪ জুন হলিউড অভিনেত্রী অ্যাঞ্জেলিনা জোলির জন্মদিন। অস্কারজয়ী এই অভিনেত্রী শুধু অভিনয়ের জন্য নয়, মানবিক কাজ, সাহসী সিদ্ধান্ত ও ব্যক্তিগত জীবনের নানা উত্থান-পতনের কারণেও বিশ্বজুড়ে আলোচিত। জন্মদিন উপলক্ষে তাঁর জীবন ও ক্যারিয়ারের জানা–অজানা ঘটনাগুলোকেই তুলে ধরা হলো।
১. রক্তে ছিল অভিনয়
১৯৭৫ সালের ৪ জুন যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ার লস অ্যাঞ্জেলেসে জন্মগ্রহণ করেন অ্যাঞ্জেলিনা জোলি। তাঁর জন্মের পাঁচ বছর আগেই তাঁর বাবা জন ভয়েট ‘মিডনাইট কাউবয়’ সিনেমা দিয়ে অস্কারে মনোনয়ন পান। জন্মের চার বছর পরে অ্যাঞ্জেলিনা জোলি দেখেছেন বাবার হাতে অস্কার। তাঁর মা মার্শেলিন বার্ট্রান্ড ছিলেন অভিনেত্রী। ছোটবেলা থেকেই চলচ্চিত্রের পরিবেশে বেড়ে ওঠেন তিনি। যে কারণে বহু সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ‘তাঁর রক্তেই ছিল অভিনয়।’
২. শৈশব মোটেও সুখের ছিল না
শৈশবের ছবিতে হাসিখুশি মনে হলেও আজকের বিশ্বতারকা জোলির কৈশোর সময়টা ছিল কঠিন। এর কারণ বাবা-মা জন ভইট ও মার্শেলিন বার্ট্রান্ডর বিচ্ছেদ। পরে একাকিত্বে কাটে এই তারকার অনেক সময়। এ ছাড়া আত্মবিশ্বাসের সংকট ও মানসিক অস্থিরতার সঙ্গে দীর্ঘ সময় লড়াই করতে হয়েছে তাঁকে। বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে তিনি স্বীকার করেছেন, কৈশোরে তিনি নিজেকে সমাজের মূলধারা থেকে বিচ্ছিন্ন মনে করতেন। তিনি ভ্যারাইটিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ‘একাকিত্ব থেকেই তাঁর জয়ের গল্পের শুরু হয়। সেই সময় তাঁকে অভিনয় টানে।’
৩. প্রথম দিকে সাফল্য আসেনি
মা ও বাবা পরিচিত অভিনয়শিল্পী হলেও অভিনয়ের শুরুটা সাধাসিধেভাবেই হয়েছে। ১৯৯৩ সালে তিনি হঠাৎ করেই নাম লেখান সিনেমায়। ‘সাইবর্গ টু’ নামের সেই সিনেমা দিয়ে চলচ্চিত্রে অভিষেক হলেও ছবিটি সাফল্য পায়নি। শুরুতেই থমকে যেতে হয়। এরপর কয়েক বছর ছোট বাজেটের ছবি ও টেলিভিশন প্রজেক্টে কাজ করেন। এই সময়ে ধীরে ধীরে অভিনয়ে দক্ষতা অর্জন করেন। বুঝতে পারেন হলিউডে জেনেবুঝে কাজ না করে টিকে থাকা কঠিন। নিজেকে যোগ্য করেই নির্মাতাদের নজরে আসেন।
৪. এবার অস্কার পাওয়ার গল্প
কিছুটা বিরতি নিয়ে আবার কাজ শুরু করেন অভিনয়। সুযোগের অপেক্ষায় থাকেন। ১৯৯৯ সালে সুযোগ আসে ‘গার্ল, ইন্টারাপ্টেড’ সিনেমায় অভিনয় করার। এই সিনেমায় মানসিকভাবে অস্থির তরুণী লিসা চরিত্রে অভিনয় করেন। সিনেমাটি মুক্তির পরে বিশ্বব্যাপী আলোচনায় আসে। এই ছবির জন্য তিনি সেরা পার্শ্বচরিত্রের অভিনেত্রী বিভাগে অস্কার জেতেন। অনেক সমালোচকের মতে, এটিই তাঁর ক্যারিয়ারের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। তবে তখনো সুপারস্টার হননি অ্যাঞ্জেলিনা জোলি।
৫. কীভাবে সুপারস্টার হলেন
অ্যাঞ্জেলিনা জোলিকে তারকাখ্যাতি এনে দেওয়া সিনেমা ‘লারা ক্রফট: টুম্ব রাইডার’। মুক্তি পায় ২০০১ সালে। ছবিটি ১৯৯৬ সালের ভিডিও গেম ‘লারা ক্রফট: টুম্ব রেইডার’-এর ওপর ভিত্তি করে নির্মাণ করা হয়। ছবিতে ভিডিও গেমের জনপ্রিয় চরিত্র লারা ক্রফটের ভূমিকায় অভিনয় করে তিনি আন্তর্জাতিক সুপারস্টার হয়ে ওঠেন। এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। ২০০৩ সালে আবার মুক্তি পায় ছবিটির সিক্যুয়েল ‘লারা ক্রফট টুম্ব রেইডার: দ্য ক্র্যাডেল অব লাইফ’। সেই ছবিতেও ছিলেন জোলি। দুটিই আলোচিত সিনেমা।
৬. সর্বোচ্চ পারিশ্রমিক
২০০০ সাল–পরবর্তী ক্যারিয়ারের শীর্ষ সময়ে জোলি একটি ছবির জন্য ১৫ থেকে ২০ মিলিয়ন ডলার পর্যন্ত পারিশ্রমিক নিয়েছেন। কখনো সেটাই ছিল সর্বাধিক। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের হিসাব অনুযায়ী, তাঁর মোট সম্পদের পরিমাণ বর্তমানে প্রায় ১০০ থেকে ১২০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। অভিনয়ের পাশাপাশি প্রযোজনা, পরিচালনা ও বিভিন্ন ব্যবসায়িক উদ্যোগ থেকেও আয় করেন তিনি।
৭. প্রেম বিয়ে বিচ্ছেদের গল্প
অ্যাঞ্জেলিনা জোলির ব্যক্তিগত জীবনের সবচেয়ে আলোচিত অধ্যায় নিঃসন্দেহে ব্র্যাড পিটের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের দিনগুলো। ২০০৪ সালে ‘মিস্টার অ্যান্ড মিসেস স্মিথ’ সিনেমার শুটিংয়ের সময় তাঁদের ঘনিষ্ঠতা নিয়ে গুঞ্জন শুরু হয়। তখন ব্র্যাড পিটের সঙ্গে অভিনেত্রী জেনিফার অ্যানিস্টনের বৈবাহিক সম্পর্ক ছিল। পরে পিট ও অ্যানিস্টনের বিচ্ছেদ হলে জোলি ও পিট প্রকাশ্যে একসঙ্গে দেখা দিতে শুরু করেন। ২০১৪ সালে ফ্রান্সে বিয়ে করেন তাঁরা। সেই বিয়ে বেশি দিন টেকেনি। ‘ব্র্যাঞ্জেলিনা’ নামে পরিচিত এই জুটি একসময় হলিউডের সবচেয়ে ক্ষমতাধর ও জনপ্রিয় তারকা দম্পতি হিসেবে বিবেচিত হতো। একসময় যাঁদের প্রেমকাহিনি বিশ্বজুড়ে আলোচিত ছিল, সেই জোলি-পিট সম্পর্ক শেষ পর্যন্ত হলিউডের সবচেয়ে আলোচিত বিচ্ছেদগুলোর একটিতে পরিণত হয়। ২০১৬ সালে জোলি বিচ্ছেদের আবেদন করেন। বিচ্ছেদের পর এক সাক্ষাৎকারে জোলি বলেন, ‘এটি ছিল আমার জীবনের সবচেয়ে কঠিন সময়গুলোর একটি।’
৮. ক্যানসার নিয়ে সাহসী পদক্ষেপ
২০১৩ সালে তিনি জানান, জেনেটিক কারণে স্তন ক্যানসারের উচ্চ ঝুঁকি থাকায় প্রতিরোধমূলক অস্ত্রোপচার করিয়েছেন। এই অস্ত্রোপচারের তাঁর দুই স্তনই অপসারণ করা হয়। পরে একই কারণে আরও চিকিৎসা গ্রহণ করেন। নিজের অভিজ্ঞতা প্রকাশ করে তিনি বিশ্বজুড়ে নারীদের স্বাস্থ্যসচেতনতা নিয়ে নতুন আলোচনা তৈরি করেন।
৯. মানবিক কাজে জোলি
ক্যারিয়ারে পরিচিতি পাওয়ার পর থেকেই তিনি নিয়মিত মানবিক কাজে অংশ নিয়েছেন। ২০০১ সাল থেকে শরণার্থী ও যুদ্ধপীড়িত মানুষের জন্য কাজ শুরু করেন জোলি। জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআরের দূত হিসেবে তিনি আফগানিস্তান, সিরিয়া, সুদান, কম্বোডিয়াসহ বিশ্বের বিভিন্ন সংকটপূর্ণ অঞ্চল সফর করেছেন। অনেকের কাছে তিনি অভিনেত্রীর চেয়ে মানবাধিকারকর্মী হিসেবেই বেশি সম্মানিত।
১০. জোলির কিছু বিখ্যাত উক্তি
জোলির বক্তব্য প্রায়ই অনুপ্রেরণার উৎস হিসেবে উদ্ধৃত হয়। তাঁর কয়েকটি আলোচিত উক্তি—‘অন্য রকম হওয়া খারাপ নয়, বরং ভালো।’ এ ছাড়া তিনি একবার বলেছিলেন, ‘সাহসী সিদ্ধান্ত নাও, ভুল করো, সেখান থেকেই শেখা আসে।’ অন্যরা তাঁকে কে কীভাবে দেখছেন এটা নিয়ে তিনি কখনোই মাথা ঘামাননি। তিনি বলেছিলেন, ‘আমি যদি বোকাও বনে যাই, তাতে কী? অন্যরা আমাকে কীভাবে দেখছে, তা নিয়ে আমি ভীত নই।’
অ্যাঞ্জেলিনা জোলির জীবন কেবল একজন সফল অভিনেত্রীর গল্প নয়। তিনি ব্যক্তিজীবনে সংগ্রাম থেকে উঠে আসা এক নারী। ব্যক্তিগত সংকটকে মোকাবিলা করা, সাহসী সিদ্ধান্ত নেওয়া এবং খ্যাতিকে মানুষের কল্যাণে ব্যবহার করার এক অনন্য উদাহরণ। ৫১ বছরে পা দিয়েও তিনি বিশ্বের সবচেয়ে প্রভাবশালী নারীদের একজন হিসেবে সমানভাবে প্রাসঙ্গিক।



