মহাকাশে দীর্ঘদিন ধরে একটানা থাকার ফলে জীবন একঘেয়ে হয়ে উঠতে পারে। ২০১৫ ও ২০১৬ সালের দিকে নাসার মহাকাশচারী স্কট কেলি প্রায় এক বছর ধরে আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনে অবস্থান করছিলেন। তাঁর এই একঘেয়েমি দূর করতে এবং মন ভালো রাখতে এক অদ্ভুত পরিকল্পনা করেছিলেন তাঁর যমজ ভাই মার্ক কেলি, যিনি নিজেও নাসার সাবেক একজন মহাকাশচারী।
গরিলা স্যুট পাঠানোর পরিকল্পনা
বর্তমানে স্কট কেলির বয়স ৬২ বছর। ২০২২ সালে এক সাক্ষাৎকারে তিনি সেই ঘটনার স্মৃতিচারণ করে বলেন, ‘একদিন আমি মহাকাশ স্টেশন থেকে ফোনে ভাইয়ের সঙ্গে কথা বলছিলাম। হঠাৎ মার্ক বলল, “শোনো, আমি তোমাকে মহাকাশে একটা গরিলার স্যুট পাঠাচ্ছি।” আমি অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করলাম, কেন? ও হাসতে হাসতে উত্তর দিল, কারণ এর আগে মহাকাশে তো কখনো কোনো গরিলা যায়নি।’
মার্ক কেলি বর্তমানে অ্যারিজোনার একজন সিনেটর। তিনি সেই গরিলার পোশাকটি ভ্যাকুয়াম প্যাক করে বাতাস বের করে ছোট করেছিলেন। ২০১৫ সালের জুনে স্পেসএক্সের একটি মনুষ্যবিহীন কার্গো রকেটে করে তা মহাকাশে পাঠান। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত, সেই রকেটটি মাঝ আকাশেই বিস্ফোরিত হয়ে ধ্বংস হয়ে যায়।
স্কট কেলি সেই সময়ের কথা মনে করে বলেন, ‘রকেট দুর্ঘটনার পর যখন ভাইয়ের সঙ্গে আমার আবার ফোনে কথা হলো, সে বলল, “দমে যেয়ো না, আমি তোমাকে আরও একটা গরিলা স্যুট পাঠাচ্ছি।”’ মার্কের দ্বিতীয় চেষ্টাটি সফল হয় এবং পোশাকটি ঠিকঠাক মহাকাশ স্টেশনে পৌঁছায়।
গরিলা সেজে মজা
পোশাকটি হাতে পেয়ে স্কট কেলি সেটি পরে একটি বাক্সের ভেতরে লুকিয়ে পড়েন। ২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে টুইটারে একটি ভিডিও পোস্ট করা হয়। ভিডিওতে দেখা যায়, স্কট একটি বড় সাদা ব্যাগ থেকে গরিলার বেশে আচমকা বেরিয়ে আসেন এবং ব্রিটিশ মহাকাশচারী টিম পিককে তাড়া করেন। শূন্য অভিকর্ষের কারণে টিম পিক তখন ভয়ে ভেসে ভেসে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছিলেন, যা দেখতে বেশ মজার ছিল।
এক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারী এই মজার ভিডিওর ১৫ সেকেন্ডের একটি অংশ শেয়ার করেন। তবে তিনি ভুলবশত লিখেছিলেন, গরিলার পোশাকটির ভেতরে স্কট নন, বরং তাঁর ভাই মার্ক কেলি ছিলেন। ইন্টারনেটে শেয়ার করার পর থেকে ভিডিওটি ৯০ লাখের বেশিবার দেখা হয়েছে। একই সঙ্গে এটিতে সাড়ে ৩ লাখের বেশি লাইক এবং ৭৫ হাজারের বেশি রিটুইট পড়েছিল। এ ছাড়া আরও অনেক সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্টেও ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়ে।
এই কাণ্ড দেখে এত বছর পর মানুষ আবার মেতে ওঠায় বেশ অবাক হয়েছেন স্কট। তিনি হাসতে হাসতে বলেন, ‘মানুষ তো এটা পছন্দ করবেই। মহাকাশের গরিলাকে কে না ভালোবাসে? তবে এত বছর পর এটি যে আবার নতুন করে ইন্টারনেটে ভাইরাল হবে, তা আমি ভাবিনি।’ ভিডিওতে ব্রিটিশ নভোচারী টিম পিককে যেভাবে ভয় পেয়ে পালাতে দেখা গেছে, আসলে তিনি কিন্তু মোটেও অবাক বা ভীত হননি।
স্কট বলেন, ‘পুরো ব্যাপারটা আগে থেকেই সাজানো ছিল। টিম পিক যেন বাতাসে ভেসে ভেসে পালিয়ে যাচ্ছেন বলে মনে হয়, সেই জন্য আমরা আগে থেকেই পরিকল্পনা করে রেখেছিলাম। আমরা শুধু চেয়েছিলাম, ভিডিওটি দেখতে যেন বেশ মজার হয়।’
মহাকাশে আরও মজার ঘটনা
২০১৬ সালে মহাকাশ থেকে পৃথিবীতে ফিরে আসার পরপরই অবসর নেন স্কট। মহাকাশের সেই দিনগুলোর কথা মনে করে তিনি বলেন, ‘মহাকাশে একটানা এক বছর কাটানোর একদম শেষ সময় চলছিল ওটা। মন ভালো রাখতে এবং একঘেয়েমি কাটাতে তখন আমাদের একটু এমন রসিকতার খুব প্রয়োজন ছিল।’
ব্রিটিশ নভোচারী টিম পিকের সঙ্গে করা ভিডিওটি সাজানো হলেও মহাকাশ স্টেশনের বাকি সদস্যদের সঙ্গে স্কট কিন্তু আসলেই বড় ধরনের মজা করেছিলেন। কারণ, বাকিদের কোনো ধারণাই ছিল না যে মহাকাশযানে একটি গরিলার পোশাক লুকিয়ে রাখা হয়েছে। এক সুযোগে স্কট গরিলা সেজে নিয়ে এক ক্রু সদস্যের শোবারঘরে গিয়ে লুকিয়ে থাকেন।
স্কট হাসতে হাসতে সেই ঘটনার কথা মনে করে বলেন, ‘সে যখনই নিজের ঘরের দরজা খুলতে গেল, আমি ভেতর থেকে একঝটকায় হুড়মুড় করে বেরিয়ে এলাম। তার অবস্থা দেখে পরে আমার নিজেরই একটু ভয় লাগছিল। কারণ, ভয়ের চোটে তার আবার হার্ট অ্যাটাক বা ওই–জাতীয় বড় কোনো বিপদ যদি হয়ে যায়।’
শুধু তা–ই নয়, গরিলার বেশেই স্কট হঠাৎ একদিন মহাকাশ স্টেশনের রুশ অংশেও হাজির হয়েছিলেন। তিনি বলেন, ‘আমি ভেসে ভেসে রুশ নভোচারীদের এলাকায় চলে গেলাম। তারা যখন হঠাৎ করে মহাকাশে এক জ্যান্ত গরিলাকে ভেসে আসতে দেখল, এমন জোরে হেসে উঠেছিল, যা আপনারা বিশ্বাসই করতে পারবেন না।’
শিক্ষামূলক উদ্যোগ
মজার ছলে করা এই কাণ্ডের পাশাপাশি স্কট গরিলার পোশাকটি পরে বাচ্চাদের জন্য একটি শিক্ষামূলক ভিডিও তৈরি করেছিলেন মহাকাশ স্টেশনে। এই ব্যাপারে স্কট বলেন, ‘আমার এই পাগলামি করার পেছনে একটি বড় কারণও ছিল। ছোট বাচ্চাদের বিজ্ঞান ও মহাকাশের প্রতি আগ্রহী করতে এই ধরনের ভিডিও দারুণ কাজ করে। কারণ, মহাকাশ স্টেশনে একটা গরিলা ঘুরে বেড়াচ্ছে, এমন দৃশ্য সহজেই সবার চোখে পড়ে।’
সূত্র: পিপল ডটকম, ইয়াহু এন্টারটেইনমেন্ট



