লেবাননের বৈরুতের জেমাইজেহ এলাকার একটি ভাড়াবাড়ি এখন সিনেমার সেট। সেখানে জ্বলছে উজ্জ্বল স্টুডিও লাইট। এর মাঝখানে বসে আছেন মারিয়া এলিয়ান, তবে তাকে চেনা দায়। পরনে স্যুট, মাথায় ব্যাকব্রাশ করা চুল আর মুখে কৃত্রিম দাড়ি। আরবি ভাষায় নারীবাদী ব্যঙ্গাত্মক সিরিজ ‘স্মাতুহা মিননি’র (আমার কাছে যা শুনেছেন) তৃতীয় সিজনের শুটিং চলছে।
ব্যঙ্গের মাধ্যমে প্রতিবাদ
একজন উগ্র পুরুষতান্ত্রিক পডকাস্টারের নকল করে মারিয়া বলে উঠলেন, ‘আপনার স্ত্রী যদি বাচ্চার ডায়াপার পালটাতে বলে, তবে ডায়াপার নয়, স্ত্রীকেই বদলে ফেলুন’! এর ঘণ্টাখানেক পরেই তিনি আবার পোশাক বদলে হাতে চিৎকার করে উঠলেন, ‘মা খিদে পেয়েছে, একটা স্যান্ডউইচ বানিয়ে দাও না’!
মধ্যপ্রাচ্যে বর্তমানে পুরুষতান্ত্রিক যে বয়ান শক্তিশালী হচ্ছে, এ সিরিজটি মূলত সেটিরই একটি প্যারোডি বা ব্যঙ্গ। শো-টির প্রতিষ্ঠাতা, লেখক ও পরিচালক আমান্দা আবু আবদুল্লাহ বলেন, ‘পিতৃতান্ত্রিক মনোভাব সবসময়ই ছিল। কিন্তু এখন আমরা এর একটি নতুন ও উগ্র রূপ দেখতে পাচ্ছি—নারীদের স্বাধীনতা ও তাদের সরব হওয়ার বিরুদ্ধে এক ধরনের পালটা প্রতিক্রিয়া কাজ করছে’।
‘রেড পিল’ তত্ত্বের প্রভাব
আমান্দা জানান, এ উগ্র মতাদর্শের মূলে রয়েছে তথাকথিত ‘রেড পিল’ তত্ত্ব। অ্যান্ড্রু টেটের মতো ব্যক্তিদের প্রভাবে মধ্যপ্রাচ্যে এ ধারণা ছড়িয়ে পড়ছে, যেখানে পুরুষদের শেখানো হচ্ছে যে তারা নারীবাদী ব্যবস্থার ‘শিকার’ এবং আধিপত্য বিস্তারের মাধ্যমেই তাদের ক্ষমতা পুনরুদ্ধার করতে হবে। এমনকি কিছু সোশ্যাল মিডিয়া ইনফ্লুয়েন্সার পরামর্শ দিচ্ছেন যে, স্ত্রীকে ঘরের কাজে সাহায্য না করে দ্বিতীয় বিয়ে করা উচিত, যাতে দুই স্ত্রী মিলে ঘরের কাজ করতে পারেন!
আমান্দা আরও বলেন, ‘আমরা এ নারীবিদ্বেষী সংস্কৃতিকে নিয়ে বিদ্রূপ করতে চেয়েছি। যেসব পডকাস্টার নারীদের দেরি করে বিয়ে করা বা কম সন্তান নেওয়া নিয়ে সমালোচনা করেন, তাদের আচরণই যে নারীদের সংসারবিমুখ হওয়ার প্রধান কারণ—সেটিই আমরা তুলে ধরেছি।’
ইউটিউবে জনপ্রিয়তা
২০২০ সালে ‘খাতেরা’ নামক মিডিয়া হাউসের অধীনে এ সিরিজের যাত্রা শুরু। এর পেছনে কাজ করছে ‘ওম্যানিটি’ নামের একটি এনজিও। ইউটিউবকে প্ল্যাটফর্ম হিসেবে বেছে নেওয়ার কারণ ব্যাখ্যা করে আমান্দা বলেন, এখানে বিস্তারিতভাবে গল্প বলার সুযোগ থাকে। ইউটিউবে প্রতিটি পর্ব গড়ে আড়াই থেকে তিন লাখ বার দেখা হয়। মজার বিষয় হলো, এ শো-টির প্রায় ২৫ শতাংশ দর্শকই পুরুষ।
জার্মানিতে নিবন্ধিত এ প্রোডাকশন হাউসের মাধ্যমে তারা স্থানীয় সেন্সরশিপ এড়িয়ে কাজ করছেন। আমান্দা মনে করেন, সরাসরি উপদেশ দেওয়ার চেয়ে হাস্যরসের মাধ্যমে সমালোচনা করা বেশি কার্যকর। তিনি বলেন, ‘একবার যখন আমরা কাউকে হাসাতে পারি, তখন তার রক্ষণশীল মানসিকতার দেয়াল ভেঙে যায় এবং নতুন ধারণা গ্রহণ করা সহজ হয়’।
তৃতীয় সিজনের চ্যালেঞ্জ
সম্প্রতি ইরান-ইসরাইল উত্তেজনার প্রভাব লেবাননে পড়ায় শুটিং কিছুটা বাধাগ্রস্ত হয়েছে। তবুও গত ২২ এপ্রিল তারা তৃতীয় সিজনের পর্বগুলো মুক্তি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। এবারের সিজনে মা ও মেয়ের সম্পর্কের জটিলতা এবং কীভাবে মায়েরা অনেক সময় সুরক্ষার নামে নিজের মেয়ের ওপর পিতৃতন্ত্রের নিয়ম চাপিয়ে দেন, তা নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে।
আমান্দার মতে, তাদের চূড়ান্ত লক্ষ্য হলো নীতিগত পরিবর্তন আনা। তবে তার আগে সুস্থ আলোচনার পরিবেশ তৈরি করা জরুরি।



