ভারতের পশ্চিমবঙ্গে আবারও নির্বাচনী হাওয়া বইতে শুরু করেছে। রাজনৈতিক প্রচার, সভা-সমাবেশ আর নানা দলের প্রস্তুতিতে সরগরম রাজ্য। আগামী বিধানসভা নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে ২০২৬ সালেই। এই আবহের মধ্যেই ভারতীয় গণমাধ্যমে নিজের পুরনো ভোট-অভিজ্ঞতা ও রাজনৈতিক ভাবনার কথা স্মরণ করলেন সংগীতশিল্পী কবীর সুমন।
ধূসর স্মৃতি আর মরচে পড়া অভিজ্ঞতা
জীবনের নানা পর্যায়ে ভোটের সঙ্গে যুক্ত অভিজ্ঞতা থাকলেও সেগুলো এখন অনেকটাই ধূসর হয়ে গেছে বলে জানিয়েছেন তিনি। তার ভাষায়, “স্মৃতিতে এখন আর সব পরিষ্কার নেই, অনেক কিছুতেই যেন মরচে ধরেছে।”
ছোটবেলার স্লোগান আর এক সতর্কবার্তা
তবে ভোটের স্মৃতি বলতে সবচেয়ে আগে তার মনে পড়ে সেই সময়কার রাজনৈতিক স্লোগান। “ভোট দেবেন কিসে, কাস্তে ধানের শিসে”—সিপিআইয়ের এই স্লোগান তখন পাড়ার বড়দের মুখে মুখে ফিরত। ছোটবেলায় সেই স্লোগানই তাকে আকর্ষণ করত, পিছু নিয়ে উচ্চারণ করতেন তিনি ও তার বন্ধুরা। তবে একবার স্থানীয় এক ব্যক্তি সতর্ক করে বলেছিলেন, “ওদের স্লোগান বলবি না, ওরা ভগবানে বিশ্বাস করে না।”
প্রথম ভোটের অভিজ্ঞতা
প্রথম ভোটের অভিজ্ঞতা নিয়েও স্মৃতিচারণা করেন তিনি। কবে, কোন নির্বাচনে ভোট দিয়েছিলেন তা স্পষ্ট না থাকলেও বৈষ্ণবঘাটা লেনে থাকাকালীন সময়ের এক ঘটনা আজও মনে আছে তার। ভোটকেন্দ্রে প্রবল ভিড়, চেঁচামেচি আর ধাক্কাধাক্কির মধ্যে আঙুলে কালি লাগলেও শেষ পর্যন্ত বুথে পৌঁছাতে না পেরে তিনি ফিরে এসেছিলেন বলে জানান।
পরিবারে রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব
পারিবারিক রাজনৈতিক পরিবেশও ছিল ভিন্নমুখী। বাবা ছিলেন কংগ্রেস সমর্থক, মা কট্টর বামপন্থী। দাদার মুখে “হাত রুখতে যাচ্ছি”—এ ধরনের মন্তব্যও মনে আছে তার। তবে এই রাজনৈতিক মতবিরোধ থাকলেও পরিবারে তা বড় কোনো বিরোধে রূপ নেয়নি বলেই জানান তিনি।
নকশালপন্থী ভাবনা থেকে ভোটের গুরুত্ব বোঝা
নিজের রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে সুমন বলেন, এক সময় তার মধ্যে নকশালপন্থী ভাবনা ছিল এবং ভোট ব্যবস্থার প্রতি অনাস্থাও ছিল। তার ভাষায়, “মনে হতো ভোট দিয়ে কিছু হবে না, পরিবর্তন আসবে বিপ্লব বা গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে।”
পরবর্তীতে সেই অবস্থান বদলেছে বলেও জানান তিনি। প্রথমবার সক্রিয়ভাবে নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় যুক্ত হওয়ার পর ভোট দেওয়ার গুরুত্ব বুঝতে শুরু করেন। যদিও ছাত্রজীবনের কিছু ভাবনা তখনও ছিল, তবু শেষ পর্যন্ত কোনো রাজনৈতিক দলে যোগ দেননি এবং প্রচারেও অংশ নেননি।
বাবার পোলিং অফিসারের অভিজ্ঞতা
একটি পারিবারিক ঘটনার কথাও তুলে ধরেন তিনি। একবার তার বাবা, যিনি সরকারি চাকরিজীবী ছিলেন, পোলিং অফিসারের দায়িত্ব পান। সেই সময় ব্যালট বাক্সের গন্ধ আজও তার মনে রয়েছে বলে জানান সুমন।
ইচ্ছাকৃতভাবে ভোট নষ্টের ঘটনা
আরেকটি ঘটনার কথা বলতে গিয়ে তিনি জানান, একবার ভোট দিতে গিয়ে তার বাবা ব্যালট পেপারে ইচ্ছাকৃতভাবে সিল না দিয়ে নষ্ট করে দেন। আশপাশের লোকজন অবাক হলে তিনি হাসতে হাসতে বলেছিলেন, “আমি ইচ্ছে করেই ভোটটা নষ্ট করেছি।” কেন এমন করেছিলেন, তা আজও অজানা বলে জানান সুমন।
উপসংহার
সব মিলিয়ে, তার জীবনের ভোট-অভিজ্ঞতা কখনও স্মৃতির ঝাপসা ছবি, কখনও পারিবারিক রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব, আবার কখনও ব্যক্তিগত ভাবনার পরিবর্তনের গল্প হয়ে ধরা দেয়—যেখানে ভোটের চেয়ে বড় হয়ে ওঠে এক সময়কার বিপ্লবের স্বপ্ন।



