গানের মঞ্চে ‘গণহত্যার’ ছায়া, ইউরোভিশনের ‘দ্বিমুখী নীতি’তে বিশ্বজুড়ে ক্ষোভ
গানের মঞ্চে ‘গণহত্যার’ ছায়া, ইউরোভিশনের ‘দ্বিমুখী নীতি’তে ক্ষোভ

ইউরোভিশন সং কনটেস্ট বা ইউরোভিশন গান প্রতিযোগিতা দীর্ঘদিন ধরে নিজেকে সম্পূর্ণ ‘রাজনীতিমুক্ত’ বলে দাবি করে আসছে। তবে চলতি বছর এই দাবি খোদ প্রতিযোগিতার মঞ্চেই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। শনিবার (১৬ মে) বিশ্বজুড়ে লাখ লাখ দর্শক চোখ রাখবেন ইউরোভিশনের চূড়ান্ত পর্বে। জমকালো পোশাক, আলোকসজ্জা আর ইউরোপীয় গানের এই উৎসবের মূল সুর ছিল কৌতুক ও বিনোদন। আয়োজক সংস্থা ইউরোপিয়ান ব্রডকাস্টিং ইউনিয়ন (ইবিইউ) একে সংহতি ও সঙ্গীতের উৎসব বলে দাবি করলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইসরাইলের অংশগ্রহণ সেই দাবিকে খাদের কিনারায় এনে দাঁড় করিয়েছে।

ইসরাইলের অংশগ্রহণ ও দ্বিমুখী নীতির অভিযোগ

গাজা ও লেবাননে ইসরাইলি আগ্রাসন চলাকালীন দেশটির এই অংশগ্রহণকে কেন্দ্র করে বিশ্বজুড়ে শিল্পী ও সম্প্রচার মাধ্যমগুলোর মধ্যে তীব্র ক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছে। ২০২২ সালে ইউক্রেনে পূর্ণমাত্রায় আগ্রাসন চালানোর পর রাশিয়াকে নিষিদ্ধ করেছিল ইবিইউ। অথচ ইসরাইলের ক্ষেত্রে একই পদক্ষেপ না নেওয়ায় সংস্থাটির বিরুদ্ধে ‘দ্বিমুখী নীতি’র অভিযোগ উঠেছে। সমালোচকদের প্রশ্ন—এমন ভূরাজনৈতিক সংঘাতের মধ্যে এই আয়োজনকে আর কতটা নিরপেক্ষ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান বলা চলে?

ইসরাইলের ‘সফট পাওয়ার’ ও ভোট জালিয়াতির অভিযোগ

ইউরোভিশন কেবল একটি গানের লড়াই নয়, প্রতি বছর ১৬ কোটি মানুষের কাছে পৌঁছানোর এক বিশাল ভূরাজনৈতিক মঞ্চ। আর এই ‘সফট পাওয়ার’ বা সাংস্কৃতিক প্রভাবকে কাজে লাগাতে মরিয়া ইসরাইল। নিউইয়র্ক টাইমসের এক অনুসন্ধানে জানা গেছে, ২০২৪ সালে সুইডেনের মালমোতে অনুষ্ঠিত আসরে নিজেদের প্রচারণার জন্য ইসরাইল ৮ লাখ ডলার খরচ করেছিল। এমনকি ২০২৫ সালের আসরেও ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর দপ্তর ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যুক্ত অফিশিয়াল চ্যানেলগুলো থেকে পেইড ডিজিটাল ক্যাম্পেইন চালানো হয়, যেখানে ইউরোপের দর্শকদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল যেন তারা ইসরাইলকে সর্বোচ্চ ২০টি করে ভোট দেয়। বিচারকদের কম নম্বর পাওয়া সত্ত্বেও দর্শকদের বিপুল ভোটে ইসরাইল দ্বিতীয় স্থান লাভ করে। ফলাফল ঘোষণার পর ভোট কারচুপির ব্যাপক অভিযোগ উঠলে ইবিইউ মাথাপিছু সর্বোচ্চ ভোটের সংখ্যা ২০ থেকে কমিয়ে ১০-এ নামিয়ে আনে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

‘গণহত্যার মঞ্চে গান নয়’

বার্লিনভিত্তিক সংগীতশিল্পী মলি নিলসন আল জাজিরাকে বলেন, ইসরাইল ভালো করেই জানে এই ধরনের আয়োজনের মাধ্যমে কীভাবে ‘কালচারাল হোয়াইটওয়াশিং’ বা সাংস্কৃতিক শুদ্ধিকরণ করা যায়। তিনি ‘নো মিউজিক ফর জেনোসাইড’ (গণহত্যার মঞ্চে গান নয়) শীর্ষক একটি খোলা চিঠিতে স্বাক্ষর করা এক হাজারেরও বেশি শিল্পীর একজন। এই চিঠির মাধ্যমে ইসরাইলকে বাদ না দেওয়া পর্যন্ত ইউরোভিশন বয়কটের আহ্বান জানানো হয়েছে। নিলসনের মতে, শিল্প যদি শুধু বিনোদনই হয়ে ওঠে যেখানে পৃথিবীর নিষ্ঠুর বাস্তবতা নিয়ে কথা বলা যাবে না, তবে এমন শিল্পের কোনো অর্থ নেই। যারা বয়কট করছেন না, তারাও আসলে পরোক্ষভাবে একটি রাজনৈতিক অবস্থান নিচ্ছেন।

সম্প্রচার মাধ্যমগুলোর ঐতিহাসিক বয়কট

ইসরাইলের অংশগ্রহণ নিশ্চিত হওয়ার পর নেদারল্যান্ডস, স্লোভেনিয়া, স্পেন, আইসল্যান্ড এবং আয়ারল্যান্ডের মতো দেশের সরকারি বা প্রধান সম্প্রচার মাধ্যমগুলো এবারের প্রতিযোগিতা বয়কটের ঘোষণা দিয়েছে। স্লোভেনিয়ার আরটিভির প্রেসিডেন্ট নাতালিজা গোরাচাক বলেন, এটি আমাদের বছরের অন্যতম জনপ্রিয় অনুষ্ঠান ছিল, কিন্তু স্লোভেনীয় শিল্পী ও জনগণের দাবির মুখে এবং গাজা-লেবাননের মানুষের প্রতি মানবিক সমবেদনা থেকে আমরা এটি বয়কট করেছি। এ ছাড়া ইসরাইলি হামলায় নিহত শত শত সাংবাদিকদের প্রতি সংহতি জানাতে তারা ইউরোভিশনের স্লটে ‘ভয়েস অব প্যালেস্টাইন’ নামের বিশেষ অনুষ্ঠান প্রচারের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ডাচ ব্রডকাস্টার এভরোট্রস ইসরাইলের বিরুদ্ধে গত বছরের প্রতিযোগিতায় ‘প্রমাণিত হস্তক্ষেপ’ এবং গাজা যুদ্ধে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা লঙ্ঘনের অভিযোগ এনেছে। আয়ারল্যান্ডের আরটিইও গাজার মানবিক সংকটের কথা উল্লেখ করে নিজেদের প্রত্যাহার করে নিয়েছে।

আর্থিক ধাক্কা ও প্রতিবাদের সুর

এই বয়কটের ফলে বড় আর্থিক ধাক্কার মুখে পড়েছে ইবিইউ। শুধু স্পেনই এই প্রতিযোগিতায় ৩ লাখ ইউরোর বেশি ফি দেয়। সব মিলিয়ে বড় ৫টি দেশের প্রত্যাহারে প্রায় ১০ লাখ ইউরোর (১১ লাখ ৬০ হাজার ডলার) তহবিল হারিয়েছে আয়োজক কমিটি। এ ছাড়া বিতর্কের ভয়ে প্রথম সারির অনেক তারকাও এবার অংশ নিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন। যেমন, পর্তুগালের প্রতিনিধি বাছাইয়ের মূল প্রতিযোগিতা থেকে ১৬ জন প্রতিযোগীর মধ্যে ১৩ জনই নাম প্রত্যাহার করে নেন।

বর্ণবাদ ও দ্বিমুখী নীতির অভিযোগ

রাশিয়াকে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে নিষিদ্ধ করা ইবিইউর যুক্তি হলো—ইসরাইলি ব্রডকাস্টার ‘কান’ সরকারি নিয়ন্ত্রণমুক্ত একটি স্বাধীন সংস্থা। তবে স্লোভেনিয়ার গোরাচাক এই দাবি নাকচ করে মনে করিয়ে দেন, নেতানিয়াহুর সরকারই আগের সংস্থা বন্ধ করে এটি চালু করেছিল। তীব্র বৈষম্যের চিত্র ফুটে ওঠে ফ্ল্যাগ পলিসিতেও। প্রতিযোগিতার ভেন্যুতে ইসরাইলি পতাকা বা রেইনবো পতাকার অনুমতি থাকলেও ফিলিস্তিনি পতাকা বা ফিলিস্তিনপন্থী কোনো প্রতীক সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এডওয়ার্ড সাঈদ ন্যাশনাল কনজারভেটরি অব মিউজিকের কর্মকর্তা এলেনি মুস্তাকলেম ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, যে রাষ্ট্রটি লাইভ টিভিতে দুই বছর ধরে গণহত্যা চালাচ্ছে, তাদের প্রতিনিধি মঞ্চে এসে পরিবারের ভালোবাসার গল্প শোনায়, আর ওদিকে গাজায় পুরো পরিবার মাটির সাথে মিশে যাচ্ছে। এই ভণ্ডামি অত্যন্ত বেদনাদায়ক।

ভিয়েনায় প্রতিবাদের ঝড়

ইতিমধ্যেই ভিয়েনায় চলমান সেমিফাইনালের মঞ্চে বিক্ষোভের ঘটনা ঘটেছে। ইসরাইলি প্রতিযোগী নোয়াম বেটান যখন তার গান ‘মিশেল’ শুরু করেন, ঠিক তখনই অডিটোরিয়াম থেকে ‘স্টপ দ্য জেনোসাইড’ এবং ‘ফ্রি প্যালেস্টাইন’ স্লোগান লাইভ ব্রডকাস্টে ছড়িয়ে পড়ে। নিরাপত্তাকর্মীরা দ্রুত চারজন দর্শককে হল থেকে বের করে দেয়। ২০২৪ সালে মালমোতে বা ২০২৫ সালে জুরিখে যে উত্তেজনা ছিল, অস্ট্রিয়ার রাজধানী ভিয়েনায় পরিস্থিতি হয়তো ততটা সহিংস নয়। তবে ইউরোভিশন বিশেষজ্ঞ উইলিয়াম লি অ্যাডামসের মতে, এবারের আসরে দর্শক, শিল্পী ও প্রতিনিধি দলগুলোর মধ্যে এক ধরনের গভীর ‘অস্বস্তি ও অসন্তোষ’ বিরাজ করছে, যা উৎসবের মূল আনন্দটাকেই পুরোপুরি ম্লান করে দিয়েছে।

সূত্র: আলজাজিরা