কান, ফ্রান্স — বিশ্বের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ চলচ্চিত্র উৎসব কান ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল ২০২৬ এখন মাঝপথে এসে পৌঁছেছে। ১২ মে শুরু হওয়া এ আসর চলবে ২৩ মে পর্যন্ত। শুরু থেকেই রেড কার্পেট, ওয়ার্ল্ড প্রিমিয়ার, স্ট্যান্ডিং ওভেশন এবং নির্মাতাকেন্দ্রিক সিনেমার শক্ত উপস্থিতিতে কান আবারও বিশ্ব চলচ্চিত্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চে পরিণত হয়েছে।
আর্টহাউস ও অট্যুর-ড্রিভেন সিনেমার দাপট
এবারের আসরে সবচেয়ে বড় প্রবণতা হলো আর্টহাউস ও অট্যুর-ড্রিভেন সিনেমার দাপট। পাশাপাশি যুদ্ধ, অভিবাসন, পরিচয় সংকট, মানবিক টানাপোড়েন এবং ব্যক্তিগত সম্পর্কভিত্তিক জটিল গল্পগুলোই আলোচনায় বেশি জায়গা পাচ্ছে।
স্ট্যান্ডিং ওভেশন ও আলোচিত প্রিমিয়ার
উৎসবের শুরু থেকেই একাধিক চলচ্চিত্র প্রিমিয়ারের পর দীর্ঘ স্ট্যান্ডিং ওভেশন পেয়েছে। গিলিয়ান অ্যান্ডারসন অভিনীত “ক্যাম্প মায়াসমায় কিশোর বয়সের যৌনতা ও মৃত্যু” প্রিমিয়ারের পর প্রায় ৯ মিনিটের করতালি পেয়েছে বলে আন্তর্জাতিকভাবে আলোচিত হয়েছে। একইভাবে “প্যান’স ল্যাবিরিন্থ”–এর রিস্টোরড ভার্সন কান ক্লাসিকস বিভাগে প্রদর্শনের সময়ও দর্শকদের আবেগঘন প্রতিক্রিয়া তৈরি করেছে।
প্রতিযোগিতা বিভাগে “জেন্টল মনস্টার”, “হঠাৎ একদিন”, “আরেকটি দিন” এবং “কঙ্গো বয়”–এর মতো চলচ্চিত্রগুলোও ৬–১০ মিনিটের স্ট্যান্ডিং ওভেশন পেয়েছে বলে রিপোর্ট রয়েছে। আউট-অফ-কম্পিটিশন বিভাগে প্রদর্শিত “কর্মা” নিয়েও দর্শক আগ্রহ দেখা গেছে।
এখন পর্যন্ত প্রদর্শিত সিনেমার ধারা
এবারের কানে স্পষ্টভাবে আর্টহাউস ও নির্মাতাকেন্দ্রিক সিনেমার আধিপত্য দেখা যাচ্ছে। ইউরোপীয় ড্রামা, যুদ্ধ ও রাজনৈতিক বাস্তবতা, অভিবাসন সংকট এবং ব্যক্তিগত সম্পর্কের ভাঙা-গড়া—এই বিষয়গুলোই অধিকাংশ চলচ্চিত্রে ঘুরে ফিরে এসেছে। বড় স্টুডিওর উপস্থিতি তুলনামূলক কম থাকায় স্বাধীন সিনেমার প্রভাব এবারের আসরে আরও শক্তিশালী হয়েছে বলে চলচ্চিত্র বিশ্লেষকদের মত।
জুরি ও বিচারপ্রক্রিয়া
এবারের জুরি বোর্ডের নেতৃত্ব দিচ্ছেন দক্ষিণ কোরিয়ার নির্মাতা পার্ক চান-উক। তার নেতৃত্বে আন্তর্জাতিক জুরি সদস্যরা প্রতিদিন প্রতিযোগিতামূলক সিনেমাগুলো দেখছেন এবং উৎসব শেষে পাম দ’অরসহ প্রধান পুরস্কার নির্ধারণ করবেন।
রেড কার্পেটে তারকাদের উপস্থিতি
রেড কার্পেটে এবারের আসরে ডেমি মুর, কেট ব্ল্যানচেট, ইসাবেল হুপার, ভিনসেন্ট ক্যাসেল, ভার্জিনি এফিরা, পিয়ের নিনে, আডাম বেসা এবং ক্যাথরিন দ্যনুভসহ একাধিক আন্তর্জাতিক তারকার উপস্থিতি দেখা গেছে। ভারত থেকে এবারের আসরে রেড কার্পেটে অংশ নিয়েছেন ঐশ্বরিয়া রাই বচ্চন, দীপিকা পাড়ুকোন, আলিয়া ভাট এবং করণ জোহর। তাদের উপস্থিতি ফ্যাশন ও গ্ল্যামার সেগমেন্টে বিশেষ আকর্ষণ তৈরি করেছে।
সামনে কী থাকছে উৎসবে
উৎসবের শেষ অংশে এখন সবচেয়ে বেশি নজর রয়েছে কিছু বহুল প্রতীক্ষিত বিশ্ব প্রিমিয়ারের দিকে। প্রতিযোগিতা বিভাগে এখনো কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ চলচ্চিত্র প্রদর্শনের অপেক্ষায় আছে, যেগুলো পুরস্কার দৌড়ে বড় ভূমিকা রাখতে পারে। এর মধ্যে সবচেয়ে আলোচনায় রয়েছে ওয়েস অ্যান্ডারসনের নতুন চলচ্চিত্র “দ্য ফিনিশিয়ান স্কিম”, যা এবারের কান প্রতিযোগিতা বিভাগের অন্যতম হাই-প্রোফাইল প্রিমিয়ার হিসেবে ধরা হচ্ছে। তার স্বাক্ষরধর্মী ভিজ্যুয়াল স্টাইল ও অল-স্টার কাস্ট নিয়ে ছবিটি ঘিরে শুরু থেকেই ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়েছে।
এছাড়া জর্জ মিলারের সম্ভাব্য নতুন প্রকল্প “ফিউরিওসা: দ্য মাদ ম্যাক্স সাগা”–এর বিশেষ প্রদর্শনী নিয়েও উৎসবে বাড়তি উত্তেজনা রয়েছে, যেখানে অ্যাকশন ও পোস্ট-অ্যাপোক্যালিপটিক ভিজ্যুয়াল অভিজ্ঞতা নিয়ে নতুন আলোচনা তৈরি হচ্ছে। মিডনাইট স্ক্রিনিং ও আউট-অফ-কম্পিটিশন বিভাগে আরও কয়েকটি জেনার-ফিল্ম, থ্রিলার ও ডার্ক ড্রামার প্রিমিয়ার বাকি আছে, যেগুলো শেষ মুহূর্তে দর্শক প্রতিক্রিয়ায় বড় প্রভাব ফেলতে পারে।
উৎসবের শেষ দিনে, ২৩ মে ঘোষণা করা হবে পাম দ’অরসহ প্রধান পুরস্কারগুলো, যা পুরো কান ২০২৬-এর চূড়ান্ত ফল নির্ধারণ করবে। এবারের কান ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল ২০২৬ স্পষ্টভাবে দেখাচ্ছে—এটি শুধু রেড কার্পেটের গ্ল্যামার নয়, বরং বিশ্ব সিনেমার শিল্পভাষা, রাজনৈতিক বাস্তবতা এবং নির্মাতার স্বাধীনতার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক মঞ্চগুলোর একটি।



