জাপান সরকার রোহিঙ্গা শরণার্থী ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্যসেবা খাতে নতুন করে ৩.২ মিলিয়ন মার্কিন ডলার অনুদান প্রদানের ঘোষণা দিয়েছে। এই অর্থায়ন জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিলের (ইউএনএফপিএ) মাধ্যমে বাস্তবায়িত হবে, যা কক্সবাজার ও ভাসানচর এলাকায় নারী ও কিশোর-কিশোরীদের জন্য অত্যাবশ্যকীয় স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করবে।
জাপানের অর্থায়নে কী পরিবর্তন আসবে?
এই দুই বছর মেয়াদী প্রকল্পের আওতায় প্রায় ১.৮ লাখ মানুষ সরাসরি স্বাস্থ্যসেবা পাবেন। বিশেষ করে ২৪ ঘণ্টা জরুরি প্রসূতি সেবা চালু থাকবে, জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতা মোকাবিলা ও মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা কার্যক্রম জোরদার করা হবে। সাম্প্রতিক তহবিল সংকটের কারণে বন্ধ হয়ে যাওয়া সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলো পুনরায় চালু হতে পারবে।
রোহিঙ্গা সংকটের বর্তমান চিত্র
রোহিঙ্গা সংকট বিশ্বের অন্যতম দীর্ঘস্থায়ী মানবিক সংকট হিসেবে রয়ে গেছে। কক্সবাজারে বর্তমানে ১০ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা শরণার্থী বসবাস করছেন। ২০২৪ সাল থেকে নতুন করে প্রায় ১ লাখ ৫০ হাজার রোহিঙ্গার আগমন ঘটেছে, যাদের অর্ধেকের বেশিই নারী ও কন্যাশিশু। এই ক্রমবর্ধমান চাহিদার মুখে সাম্প্রতিক সময়ে তহবিলের সংকট প্রকট আকার ধারণ করেছে।
তহবিল সংকটের প্রভাব
সাম্প্রতিক মাসগুলোতে তহবিলের তীব্র ঘাটতির কারণে রোহিঙ্গাদের সেবায় নিয়োজিত ছয়টি সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্র বন্ধ হয়ে গেছে। এর ফলে মিডওয়াইফের সংখ্যা ১৬ শতাংশ এবং জেন্ডার ভিত্তিক সহিংসতা মোকাবিলায় নিয়োজিত কর্মীদের সংখ্যা ৫০ শতাংশের বেশি হ্রাস পেয়েছে। জাপানের এই সময়োপযোগী অনুদান এই সংকটকালীন পরিস্থিতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ লাইফলাইন হিসেবে কাজ করবে।
ইউএনএফপিএ প্রতিনিধির বক্তব্য
ইউএনএফপিএ-র প্রতিনিধি ক্যাথরিন ব্রিন কামকং বলেন, ‘নারী ও মেয়েদের জন্য সংকটময় সময়ে জাপানের এই সহায়তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটি ইউএনএফপিএ-কে সেই সকল জীবন রক্ষাকারী সেবা সচল রাখতে সহায়তা করবে, যা নারী ও কিশোরীদের স্বাস্থ্য সুরক্ষা ও মর্যাদা নিশ্চিত করে। জাপানের এই নীতিগত ও ধারাবাহিক সহায়তার জন্য আমরা তাদের কাছে গভীরভাবে কৃতজ্ঞ।’
জাপানের পূর্ববর্তী সাফল্য
জাপানের অর্থায়নে ইতিপূর্বে পরিচালিত উদ্যোগগুলোর দৃশ্যমান সাফল্যের ওপর ভিত্তি করেই এই নতুন ধাপটি শুরু হয়েছে। কক্সবাজার ও ভাসানচরে ইউএনএফপিএ সমর্থিত সেবা কেন্দ্রগুলো থেকে ইতোমধ্যে ৩৮ হাজারেরও বেশি নারী ও কন্যাশিশু প্রয়োজনীয় সেবা গ্রহণ করেছেন। জাপানের সহায়তায় ভাসানচরে একটি ২০ শয্যার হাসপাতাল চালু করা সম্ভব হয়েছে, যা জীবনঝুঁকি রয়েছে এমন রোগীদের অন্য হাসপাতালে স্থানান্তরের হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে এনেছে।
দীর্ঘমেয়াদী অংশীদারিত্ব
২০১৭ সাল থেকে জাপান সরকার ইউএনএফপিএ-সহ বিভিন্ন জাতিসংঘ সংস্থা এবং এনজিওর মাধ্যমে বাংলাদেশে রোহিঙ্গা মানবিক সহায়তা কার্যক্রমে ২৫০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারেরও বেশি প্রদান করেছে। বাংলাদেশে নিযুক্ত জাপানের রাষ্ট্রদূত সাইদা শিনিচি বলেন, ‘বাস্তুচ্যুত হওয়ার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত এবং সবচেয়ে অসহায় মানুষ, বিশেষ করে নারী ও কিশোর-কিশোরীদের সুরক্ষায় জাপান দৃঢ়ভাবে অঙ্গীকারবদ্ধ। ক্রমবর্ধমান মানবিক ও অর্থায়নের চ্যালেঞ্জ থাকা সত্ত্বেও, ইউএনএফপিএ-র সাথে আমাদের অংশীদারিত্বের মাধ্যমে আমরা অপরিহার্য স্বাস্থ্য ও সুরক্ষা সেবাগুলোর নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করতে চাই।’
ভবিষ্যৎ লক্ষ্য
ইউএনএফপিএ এবং জাপান সরকারের এই অংশীদারিত্বের মূল লক্ষ্য হলো আন্তর্জাতিক সংহতিকে অনুপ্রাণিত করা এবং রোহিঙ্গা সংকটে ক্ষতিগ্রস্ত নারী ও কন্যাশিশুদের সুরক্ষা, স্বাস্থ্য ও মর্যাদা রক্ষায় বিনিয়োগ অব্যাহত রাখা। এই উদ্যোগের মাধ্যমে কিশোর-কিশোরীদের ক্ষমতায়ন সংক্রান্ত কার্যক্রমও জোরদার করা হবে, যা দীর্ঘমেয়াদে জেন্ডার ভিত্তিক সহিংসতা প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
