ভারতের তেলেঙ্গানা রাজ্যের রাঙ্গারেডি জেলায় এক নৃশংস হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। রাজকুমার (৩৫) নামে এক ব্যক্তি কারাগার থেকে জামিনে মুক্ত হয়ে নিজের স্ত্রী ও দুই সন্তানকে হত্যা করেছেন। এরপর তাঁর বিরুদ্ধে যৌন নিপীড়নের অভিযোগ আনা এক কিশোরী ও তার পরিবারের দুই সদস্যকেও হত্যা করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
ঘটনার বিবরণ
গতকাল শুক্রবার রাতে রাঙ্গারেডির শাবাদ এলাকায় নিজ বাড়িতে প্রথমে স্ত্রী পার্বতী সরিতা (৩০) এবং ৪ বছর ও ১ বছর বয়সী—দুই ছেলেকে হত্যা করেন রাজকুমার। এরপর রাজকুমার ১৭ বছর বয়সী এক কিশোরীর বাড়ির উদ্দেশে রওনা হন। ওই কিশোরী গত ১৬ মে রাজকুমারের বিরুদ্ধে পকসো আইনে যৌন হয়রানির মামলা করেছিল। রাজকুমার মেয়েটিকে গাড়িতে করে একটি নির্জন স্থানে নিয়ে হত্যা করে বলে জানা গেছে।
রাজকুমার ওই কিশোরীর মা (৪৫) ও তার নানিকেও (৬৫) খুন করেছেন। ঘটনার সময় ওই কিশোরীর ২০ বছর বয়সী এক প্রতিবন্ধী বোন বাড়িতে উপস্থিত থাকলেও তাঁকে কোনো আঘাত করা হয়নি।
আত্মহত্যার হুমকি ও পলাতক
এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের পর রাজকুমার নিজের বাবাকে ফোন করে খুনের বিষয়টি জানান। এ বিষয়ে পুলিশের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা তরুণ জোশী বলেন, ‘তিনি (রাজকুমার) তাঁর বাবাকে ফোন করে বলেন, ‘আমি এই কাজ করেছি। আমি এই মানুষদের খুন করেছি।’ এরপর তিনি নিজের ফোন বন্ধ করে দেন। তিনি আত্মহত্যা করতে যাচ্ছেন বলেও তাঁর বাবাকে জানিয়েছিলেন। তবে বিষয়টি এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।’
তরুণ জোশী আরও বলেন, ‘অভিযুক্ত ব্যক্তি বর্তমানে পলাতক। তাঁকে ধরার জন্য পুলিশের বিশেষ টিম গঠন করা হয়েছে এবং আমরা কিছু সূত্র পেয়েছি। দ্রুতই তাঁকে গ্রেপ্তার করা হবে।’
পূর্ব ইতিহাস ও জামিন
২০১৮ সালে প্রেমের বিয়ে করেন রাজকুমার ও পার্বতী। প্রথমে গ্রামের বাইরে থাকলেও পরে তাঁরা শাবাদ ও দেবালাগুড়াতে নিজেদের বাড়িতে থাকা শুরু করেন। গত মে মাসে ওই কিশোরীকে উত্ত্যক্ত ও যৌন হয়রানি করার অভিযোগে মামলা হওয়ার পর রাজকুমার গ্রেপ্তার হয়েছিলেন।
পুলিশ কর্মকর্তা জোশী বলেন, ‘অভিযুক্ত ব্যক্তি মেয়েটিকে তার কোচিং সেন্টার থেকে বাড়ি পর্যন্ত অনুসরণ করতেন এবং তাঁর প্রেমের প্রস্তাব মেনে নেওয়ার জন্য চাপ দিতেন।’ জোশী বলেন, মামলা হওয়ার পর রাজকুমার কিছুদিন পলাতক ছিলেন। পরে তিনি আদালত থেকে আগাম জামিন পান। কারণ, তাঁর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলোর শাস্তি সাত বছরের কম ছিল। এই চাঞ্চল্যকর হত্যাকাণ্ডের মাত্র এক সপ্তাহ আগে ২০ হাজার রুপির ব্যক্তিগত বন্ডে আদালত তাঁকে আগাম জামিন দেন।
মানসিক অবস্থা ও তদন্ত
পুলিশ জানায়, আগে থেকেই রাজকুমারের আচরণগত সমস্যা ছিল। পুলিশ তাঁকে দু-তিনবার কাউন্সিলিংয়ের জন্য ডেকেছিল। তাঁর পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন, তাঁর মানসিক অবস্থা স্থিতিশীল ছিল না। এ ছাড়া জুয়া খেলার অভ্যাসের কারণে তিনি অনেক ঋণে জর্জরিত ছিলেন।
ঘুমন্ত অবস্থায় সন্তানদের হত্যা করা হয়েছে বলে স্বজনরা জানান। ঘটনার পর তাঁর বাড়ি গিয়ে শিশুদের দেখে মনে হয়েছে, তাদের ঘুমের মধ্যেই হত্যা করা হয়েছে। তবে যে ঘরে পার্বতীর মরদেহ পাওয়া গেছে, সেখানে ধস্তাধস্তির স্পষ্ট চিহ্ন ছিল। স্বজনদের দাবি, ঘরের দরজা ভেতর থেকে বন্ধ ছিল এবং ফ্যান, এসি ও কুলার চালু ছিল। পরিবারের সদস্যরা জানান, ঘটনার আগে তাঁদের মধ্যে বড় কোনো ঝগড়া হয়নি। আগের দিন সন্ধ্যায়ও পার্বতী আত্মীয়দের সঙ্গে স্বাভাবিকভাবেই কথা বলেছিলেন।
ময়না তদন্তকারী দল ইতিমধ্যে অপরাধের স্থানগুলো পরীক্ষা করেছে। তদন্তকারীরা পুরো ঘটনার সূত্র মেলাতে এবং এই হত্যাকাণ্ডের আসল কারণ উদ্ঘাটনে কাজ করছেন।



