লন্ডনের পরিবহন ধসিয়ে দেওয়া হ্যাকার ব্রিটিশ-বাংলাদেশি তালহা জুবায়ের, উদ্ধার গোপন পাসপোর্ট
লন্ডনের পরিবহন ধসিয়ে দেওয়া হ্যাকার ব্রিটিশ-বাংলাদেশি তরুণ

যুক্তরাজ্যের ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ সাইবার হামলা চালিয়ে লন্ডনের পুরো পরিবহন ব্যবস্থা (টিএফএল) ধসিয়ে দেওয়া সেই দুর্ধর্ষ মাস্টারমাইন্ড হ্যাকার একজন ব্রিটিশ-বাংলাদেশি তরুণ। ২০ বছর বয়সী এই তরুণের নাম তালহা জুবায়ের। পূর্ব লন্ডনের টাওয়ার হ্যামলেটসের একটি সাধারণ ফ্ল্যাটে বসে বিশ্বজুড়ে আলোচিত এই হ্যাকারের অপরাধলব্ধ শত শত কোটি টাকার ক্রিপ্টোকারেন্সি লেনদেনের তথ্য মিলেছে। তবে চাঞ্চল্যকর তথ্য হলো, গ্রেফতারের পর ব্রিটিশ পুলিশ যখন তার পাসপোর্ট ও ভ্রমণ নথি জব্দ করতে যায়, তখন তার ঘরের সোফার নিচে লুকানো অবস্থায় একটি গোপন ‘বাংলাদেশি পাসপোর্ট’ পাওয়া যায়। গোয়েন্দাদের ধারণা, আইনি জটিলতা এড়াতে বা যেকোনও মুহূর্তে যুক্তরাজ্য ছেড়ে বাংলাদেশে পালিয়ে যাওয়ার একটি সূক্ষ্ম ছক ছিল তার।

অপরাধ স্বীকার ও ক্ষতির পরিমাণ

অনলাইন জগতে সে নিজেকে পরিচয় করিয়ে দিত নানা নামে। বিশেষ করে ‘@autistic’ নামটি তার মানসিক অবস্থার সঙ্গেও সম্পর্কিত। গত মাসে লন্ডনের উলউইচ ক্রাউন কোর্টে আকস্মিকভাবে নিজের অপরাধ স্বীকার করে নিয়েছে এই তরুণ। ২০২৪ সালের শেষের দিকে লন্ডনের পরিবহন নেটওয়ার্ক ‘ট্রান্সপোর্ট ফর লন্ডন’-এর কম্পিউটার সিস্টেমে সে যে হামলা চালিয়েছিল, তার ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে ব্রিটিশ সরকারের ব্য�় হয়েছে অন্তত ৩৯ মিলিয়ন পাউন্ড, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৬০০ কোটি টাকা।

তবে একা নয় এই তরুণ। তার সহযোগী ওয়েন ফ্লাওয়ার্স নামের ১৮ বছর বয়সী আরেক ব্রিটিশ নাগরিকও এই মামলায় দোষী সাব্যস্ত হয়েছে। ফ্লাওয়ার্স যুক্তরাজ্যের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের হাসপাতালের সিস্টেমে হ্যাক করার চেষ্টারও দোষ স্বীকার করেছে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

সাজার সম্ভাবনা ও আইনি প্রক্রিয়া

হতে পারে দীর্ঘ মেয়াদের জেল। লন্ডনের উলউইচ ক্রাউন কোর্টে আগামী জুলাইয়ের তৃতীয় সপ্তাহে তালহা জুবায়েরের চূড়ান্ত সাজা ঘোষণা করবেন বিচারক জাস্টিস টার্নার। যুক্তরাজ্যের ‘কম্পিউটার অপব্যবহার আইন’ এবং মানবকল্যাণকে মারাত্মক ঝুঁকির মুখে ফেলার অভিযোগে তার দীর্ঘ মেয়াদি কারাদণ্ড হতে পারে বলে মনে করছেন আইনি বিশেষজ্ঞরা।

যুক্তরাজ্যের সাইবার অপরাধ আইনের ধারা অনুযায়ী, জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো অচল করার মতো অপরাধের জন্য সর্বোচ্চ শাস্তি যাবজ্জীবন কারাদণ্ড পর্যন্ত হতে পারে। তবে জুবায়ের শেষ মুহূর্তে আদালতে নিজের দোষ স্বীকার করায় সাজার মেয়াদ কিছুটা কমতে পারে। আইনি বিশেষজ্ঞদের মতে, অপরাধের গভীরতা, প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকার ক্রিপ্টোকারেন্সি লেনদেন এবং পূর্বের ২২টি অপরাধের রেকর্ড যার মধ্যে ১৩টি জালিয়াতি ও ব্ল্যাকমেইল- বিবেচনায় জুবায়েরের ১০ থেকে ১৫ বছরের কঠিন কারাদণ্ড হওয়ার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি। একই চক্রের মার্কিন সদস্য নোয়াহ আরবানকে গত বছর আমেরিকার আদালত ১০ বছরের কারাদণ্ড দিয়েছিল, তবে জুবায়েরের অপরাধের মাত্রা ও আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ তার চেয়েও অনেক বেশি।

একটি বিরিয়ানি বা পিৎজার অর্ডারে যেভাবে ধরা পড়ে

ভার্চুয়াল জগতে নিজেকে সম্পূর্ণ আড়ালে রাখতে জুবায়ের ব্যবহার করত ‘অ্যামনেসিয়াক অপারেটিং সিস্টেম’ এবং অত্যন্ত উচ্চমানের ভিপিএন। ব্রিটিশ পুলিশ ও মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা এফবিআই-এর চোখে ধুলো দিয়ে সে বিশ্বের অন্যতম কুখ্যাত সাইবার গ্যাং ‘স্ক্যাটার্ড স্পাইডার’-এর শীর্ষ আইটি বিশেষজ্ঞ হয়ে ওঠে। এই বেডরুম থেকেই সে আমেরিকার বড় বড় কর্পোরেট সংস্থাকে জিম্মি করে কোটি কোটি ডলার মুক্তিপণ আদায় করত।

কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি তার ক্ষুধার কারণে। মার্কিন প্রসিকিউটরদের তথ্য অনুযায়ী, নিজের ফ্ল্যাটে বসে অনলাইনের মাধ্যমে একটি খাবারের অর্ডার করতে গিয়েই জীবনের সবচেয়ে বড় ভুলটি করে বসে এই ব্রিটিশ-বাংলাদেশি। খাবার কেনার জন্য সে যে ডিজিটাল ওয়ালেট থেকে ভাউচার কিনেছিল, সেটি ছিল মূলত মার্কিন কোম্পানিগুলোর কাছ থেকে হাতিয়ে নেওয়া কোটি কোটি ডলার মূল্যের বিটকয়েন সংরক্ষণের মূল সার্ভার। শুধু তাই নয়, তার অপরাধের অর্থের যোগসূত্র স্থাপনে গোয়েন্দারা খাবারের অর্ডারের পাশাপাশি গেমিং প্ল্যাটফর্মে গিফট কার্ড কেনার প্রমাণও পেয়েছে।

গোয়েন্দারা সেই অর্ডারের সূত্র ধরে পূর্ব লন্ডনের বো রোড টিউব স্টেশনের কাছে একটি পুলিশ কন্ট্রোল সেন্টারের পাশেই অবস্থিত ফ্ল্যাটটি চিহ্নিত করে, যেখানে সে তার মা-বাবার সাথে থাকত।

গোপন বাংলাদেশি পাসপোর্ট উদ্ধার

লন্ডন সেন্ট্রিক-এর আদালত প্রতিবেদক তার প্রতিবেদনে জানান, গত প্রাক-বিচার শুনানিতে প্রসিকিউটররা আদালতকে এক চমকপ্রদ তথ্য দেন। জুবায়েরকে তার সাইবার ওয়ালেটের পিন ও পাসওয়ার্ড দিতে বলা হলে সে তা সম্পূর্ণ প্রত্যাখ্যান করে। একই সাথে আদালত তার ব্রিটিশ পাসপোর্টসহ সব ভ্রমণ নথি জমা দেওয়ার নির্দেশ দিলে তল্লাশিতে তার ঘরের সোফার কুশনের নিচ থেকে একটি সচল ‘বাংলাদেশি পাসপোর্ট’ উদ্ধার করা হয়, যা সে পুলিশের কাছে গোপন করেছিল।

আদালতে প্রসিকিউশন পক্ষ জানায়, এই বাংলাদেশি পাসপোর্ট জুবায়েরকে যেকোনও মুহূর্তে যুক্তরাজ্য থেকে পালিয়ে যাওয়ার বা আত্মগোপন করার একটি বড় ‘ফ্লাইট রিস্ক’ তৈরি করেছিল।

ওত পেতে আছে আমেরিকার এফবিআই

যুক্তরাজ্যের আদালতে সাজা হওয়াটাই জুবায়েরের জন্য শেষ কথা নয়। তার বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের ডিপার্টমেন্ট অব জাস্টিস ইতোমধ্যেই ১১২টিরও বেশি সাইবার অনুপ্রবেশ এবং ৪৭টি মার্কিন প্রতিষ্ঠানকে ব্ল্যাকমেইল করে ১১৫ মিলিয়ন ডলার মুক্তিপণ হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগে মামলা করে রেখেছে।

আরও গুরুতর বিষয় হলো, নিজেদের ও ‘স্ক্যাটার্ড স্পাইডার’-এর বিরুদ্ধে কোনও আদালতের সমন আছে কিনা, তা দেখার জন্য তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল কোর্টের নেটওয়ার্কেও হ্যাক করেছিলেন, এমনকি একাধিক ফেডারেল বিচারকের অ্যাকাউন্টও বুঝে নিয়েছিলেন। এই ঘটনা তার অপরাধের মাত্রাকে আরও গুরুতর করেছে।

লন্ডনের আদালতে সাজা ঘোষণার পর, মার্কিন সরকার তাকে যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে এনে বিচারের জন্য প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়া জোরদার করতে পারে। যদি তাকে আমেরিকার হাতে তুলে দেওয়া হয়, তবে সেখানে তার সর্বোচ্চ ৯৫ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড হতে পারে, যা যুক্তরাজ্যের শাস্তির চেয়ে অনেক বেশি কঠিন।

জব্দকৃত ও নিখোঁজ অর্থ

তদন্তকারীরা একটি সার্ভার থেকে প্রায় ৩৬ মিলিয়ন ডলার জব্দ করতে সক্ষম হয়েছে। কিন্তু জব্দের সময় জুবায়ের আরও ৮.৪ মিলিয়ন ডলার অন্য ওয়ালেটে ট্রান্সফার করে, যা এখনও উদ্ধার হয়নি। যুক্তরাজ্যের আদালতকে আরও জানানো হয়েছে যে, এই কিশোরের নিয়ন্ত্রণাধীন ওয়ালেটগুলোর মধ্য দিয়ে তার কৈশোরকালে ২০০ মিলিয়ন পাউন্ডেরও বেশি অর্থ প্রবাহিত হয়েছে।

জুবায়েরের হ্যাক করা সার্ভারে এখনও প্রায় কয়েক মিলিয়ন ডলার মূল্যের ক্রিপ্টোকারেন্সি রয়েছে গেছে, যার সন্ধান এখনও করতে পারেনি আন্তর্জাতিক গোয়েন্দারা।

পরিবারের আহাজারি

আদালতে যখন চশমা পরা ও ঢিলেঢালা ধূসর স্যুটের এই জুবায়েরকে ডক-এর কাঁচের আড়ালে দাঁড়ানো হয়, তখন তাকে দেখে চেনার উপায় ছিল না যে সে বিশ্ব কাঁপানো কোটিপতি হ্যাকার। সে তীব্র বিষণ্ণতা ও অটিজমে ভুগছে। জুবায়েরের এই অপরাধের যাত্রায় অন্য ব্রিটিশ সহযোগীদের পরিবার পাশে না থাকলেও, প্রতিটি শুনানিতে হাজির ছিলেন জুবায়েরের বাংলাদেশি মা-বাবা। শুনানির সময় জুবায়েরের বাবাকে অত্যন্ত উদ্বিগ্ন এবং মাকে প্রকাশ্যেই কান্নায় ভেঙে পড়তে দেখা গেছে।