বরিশালে আবাসন কোম্পানির এমডিকে মারধর করে জোরপূর্বক সই আদায়ের অভিযোগ
বরিশালে এমডিকে মারধর করে জোরপূর্বক সই আদায়

বরিশাল নগরের সদর রোডে অগ্রণী হাউজিং কোম্পানি লিমিটেডের কার্যালয়ে প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) আবদুল আজিজ হাওলাদারকে মারধর ও লাঞ্ছিত করে চেক ও নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে জোরপূর্বক স্বাক্ষর নেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। গত ২৭ জুন সন্ধ্যায় এই ঘটনা ঘটে। এ ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে নগরজুড়ে ব্যাপক চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়।

ঘটনার বিবরণ

প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবদুল আজিজ হাওলাদার তাঁর কক্ষে বসে চা পান করার সময় আকস্মিক চার থেকে পাঁচজন ব্যক্তি ভেতরে ঢোকেন। এ সময় সবাইকে বের করে দিয়ে কালো জামা পরিহিত এক ব্যক্তি আজিজ হাওলাদারকে জাপটে ধরেন এবং তাঁকে চড়-থাপ্পড় মারাসহ শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করেন। পরে দুটি চেক ও দুটি স্ট্যাম্পে তাঁর সই নেওয়া হয়।

কালো জামা পরিহিত ওই ব্যক্তির নাম মোস্তাফিজুর রহমান (লিটু)। নগরের কাঠপট্টি এলাকার বাসিন্দা মোস্তাফিজুর রহমান বর্তমানে যুবদলের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত থাকলেও তাঁর কোনো পদ-পদবি নেই। তাঁর আরেক ভাই মাহবুবুর রহমান (পিন্টু) বরিশাল নগর স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক সভাপতি।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

ভুক্তভোগীর বক্তব্য

ভুক্তভোগী আবদুল আজিজের সঙ্গে আজ রোববার দুপুরে প্রথম আলোর কথা হয়। তিনি জানান, একসময় তাঁদের আবাসন ব্যবসার অংশীদার ছিলেন মোস্তাফিজুর রহমান। তিন বছর আগে বিনিয়োগের বিপরীতে তাঁর মূলধন ও লভ্যাংশ হিসাব করে সমপরিমাণ জমি তাঁকে হস্তান্তরের মাধ্যমে হিসাব নিষ্পত্তি করা হয়। ওই সময় কোনো পাওনা নেই—এমন অঙ্গীকারনামাও দেন মোস্তাফিজুর।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

আবদুল আজিজের দাবি, কয়েক মাস ধরে মোস্তাফিজুর রহমান এক কোটি টাকা দাবি করে আসছিলেন। কিন্তু তাঁর সঙ্গে সব ধরনের হিসাব আগেই চূড়ান্ত হয়ে যাওয়ায় ওই অর্থ দিতে অপারগতা প্রকাশ করা হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ২৭ জুন সন্ধ্যা সাড়ে সাতটার দিকে মোস্তাফিজুর তাঁর কয়েকজন সহযোগীকে নিয়ে অফিসে ঢুকে তাঁকে (আবদুল আজিজ) মারধর করেন এবং জোরপূর্বক ৭০ লাখ টাকার একটি চেক, একটি সাদা চেক ও দুটি সাদা স্ট্যাম্পে তাঁর স্বাক্ষর নেওয়া হয়।

আইনি ব্যবস্থা

আবদুল আজিজ আরও বলেন, ঘটনার পর তিনি ব্যাংকে অভিযোগ করায় ওই চেক থেকে টাকা তুলতে পারেননি মোস্তাফিজুর রহমান। এই ঘটনায় তিনি গত বৃহস্পতিবার বরিশাল অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে মামলা করেছেন। বিচারক এস এম শরিয়ত উল্লাহ মামলাটি এফআইআর হিসেবে গ্রহণের জন্য কোতোয়ালি মডেল থানার ওসিকে নির্দেশ দিয়েছেন।

অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের বেঞ্চ সহকারী রাজিব মজুমদার রোববার দুপুরে বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, আদেশের কপি আজ রোববার থানায় পাঠানোর প্রক্রিয়া চলছে।

ভিডিও ফুটেজ

আবদুল আজিজ বলেন, ওই ঘটনার সিসিটিভি ফুটেজ তিনিই দিন দুয়েক আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করেছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ৪ মিনিট ১৮ সেকেন্ডের ভিডিওতে দেখা যায়, অগ্রণী হাউজিং লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবদুল আজিজ হাওলাদার তাঁর কক্ষে বসে চা পান করছিলেন এবং দুই ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলছিলেন। এ সময় চারজন যুবক কক্ষে প্রবেশ করেন। তাঁদের মধ্যে কালো জামা পরা মোস্তাফিজুর রহমান সবার শেষে কক্ষে ঢুকে প্রথমে সেখানে উপস্থিত অন্যদের বাইরে বের করে দেন। এরপর তিনি আবদুল আজিজ হাওলাদারের কাছে গিয়ে হঠাৎ তাঁকে চেয়ারে বসা অবস্থায় জাপটে ধরেন। এতে দুজনের মধ্যে ধস্তাধস্তি শুরু হয়।

ভিডিওতে আরও দেখা যায়, একপর্যায়ে আবদুল আজিজ উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করলে উপস্থিত আরেক ব্যক্তি তাঁর পা টেনে ধরেন। পরে তিনি দাঁড়িয়ে গেলে মোস্তাফিজুর রহমান তাঁকে একাধিকবার চড় মারেন। এরপর দুজনের মধ্যে কথোপকথন হলেও তা স্পষ্টভাবে বোঝা যায় না।

ভিডিওতে আরও দেখা যায়, মারধরের একপর্যায়ে মোস্তাফিজুর রহমান আবদুল আজিজের শরীরের সংবেদনশীল স্থানে হাত দেন। ভুক্তভোগীর অভিযোগ, তখন তাঁর অণ্ডকোষ চেপে ধরা হয় এবং দুটি সাদা চেক ও দুটি নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর দিতে চাপ দেওয়া হয়। পরে তাঁকে ওই চেক ও স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর করতে দেখা যায়।

ঘটনার সময় আজিজ হাওলাদারকে ‘বাচ্চু, বাচ্চু’ বলে একজনকে ডাকতে শোনা যায়। কিছুক্ষণ পর আরেক ব্যক্তি কক্ষে প্রবেশ করলে তাঁকে অল্প সময়ের জন্য আটকে রেখে ধাক্কা দিয়ে বাইরে বের করে দেওয়া হয়। ভিডিওতে স্বাক্ষর নেওয়ার পর চেক ও স্ট্যাম্প গ্রহণের দৃশ্য মুঠোফোনে ধারণ করতে দেখা যায়। ছবি ও ভিডিও ধারণের সময় মোস্তাফিজুর রহমানকে বলতে শোনা যায়, ‘হাসেন... হাসেন।’

অভিযুক্তের বক্তব্য

এ বিষয়ে মোস্তাফিজুর রহমানের বক্তব্য জানতে তাঁর মুঠোফোনে একাধিকবার ফোন দেওয়া হলেও তিনি সাড়া দেননি। তবে তাঁর ভাই মহানগর স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক সভাপতি মাহবুবুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, ‘ঘটনাটি সম্পর্কে আমি বিস্তারিত কিছু জানি না। তবে শুনেছি আমার ভাই ওই প্রতিষ্ঠানে দীর্ঘদিন ধরে যৌথভাবে ব্যবসা করে এবং অনেক বিনিয়োগ রয়েছে। এর বাইরে আমি কিছু জানি না।’

পুলিশের অবস্থান

কোতোয়ালি মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. আল মামুন উল ইসলাম বলেন, ‘ভুক্তভোগী আবদুল আজিজ থানায় এসে বিষয়টি মৌখিকভাবে জানিয়েছেন।’ আদালতের আদেশের কাগজ রোববার থানায় পৌঁছাতে পারে বলে তিনি জানান।