মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচারণ: কর্নেল (অব.) তৌফিকুর রহমানের বর্ণনায় ১৯৭১-এর বিভীষিকা
মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি: কর্নেল তৌফিকুর রহমানের বর্ণনায় ১৯৭১

মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচারণ: কর্নেল (অব.) তৌফিকুর রহমানের বর্ণনায় ১৯৭১-এর বিভীষিকা

বীর মুক্তিযোদ্ধা কর্নেল (অব.) তৌফিকুর রহমান সম্প্রতি একটি সভায় তার মুক্তিযুদ্ধের অভিজ্ঞতা শেয়ার করেছেন। তিনি বলেন, "আমি খুব একটা ভালো বক্তা নই। তবে চেষ্টা করব তোমাদেরকে বলতে আমি কী কারণে মুক্তিযুদ্ধে যোগদান করেছিলাম।" তার বয়স তখন মাত্র ১৫ বছর, এবং তিনি শাহীন স্কুলে পড়তেন। ১৯৭১ সালের ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণ শোনার জন্য তিনি বাংলা একাডেমিতে গিয়েছিলেন, যেখানে তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে দেশের জন্য কিছু বড় ঘটনা ঘটতে যাচ্ছে।

২৫ মার্চের বিভীষিকাময় রাত

২৬ মার্চ সকালে মাখন কিনতে বের হয়ে তিনি চানখাঁরপুলে এক থমথমে পরিবেশ দেখতে পান। রাস্তায় কোনো রিকশা বা মানুষ ছিল না, যা আগের হরতালের দিনগুলোর চেয়ে ভিন্ন ছিল। তিনি বলেন, "আমি রেললাইনের কাছাকাছি গিয়েছি, ঠিক এই সময় কার্জন হলের দিক থেকে পাকিস্তানি আর্মির একটি গাড়ি এলএমজি ফায়ার করতে করতে আসছে।" জীবনে প্রথমবারের মতো গুলির আওয়াজ শুনে তিনি দৌড়ে বাসায় ফিরে যান এবং পরিবারের সদস্যদের সাথে মেঝেতে শুয়ে থাকেন।

পরের দিন তিনি শহীদ মিনার ও জগন্নাথ হলের দিকে যান, যেখানে তিনি জীবনে প্রথম মৃতদেহ দেখেন। শিক্ষার্থীদের লাশ দেখে তার হাত-পা কাঁপতে শুরু করে। তিনি বর্ণনা করেন, "দেখি শিক্ষার্থীদের লাশ পড়ে আছে। কারও মাথায় গুলি লেগেছে, কারও বুকে গুলি লেগেছে, কারও রানে গুলি লেগেছে। সব মৃত, একেকজন একেকভাবে পড়ে আছে।" এই দৃশ্য তাকে গভীরভাবে নাড়া দেয় এবং তিনি প্রতিশোধ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

বস্তিতে ফসফরাস গ্রেনেড হামলা

সন্ধ্যায় আরেকটি মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে। রেললাইনের পাশের একটি বস্তিতে পাকিস্তানি আর্মি ফসফরাস গ্রেনেড নিক্ষেপ করে। তিনি বলেন, "চিন্তা করতে পারো? ওই বস্তির মধ্যে বাচ্চা, বয়স্ক নারী, তারা যাতে পুড়ে মরে, কেউ যদি দৌড়ে পালাতে চেষ্টা করে, তাদের গুলি মারছে।" এই ঘটনা দেখার পর তিনি সারারাত ঘুমাতে পারেননি, এবং তার মাথায় ক্রমাগত মৃতদেহের ছবি ভাসতে থাকে।

পরের দিন সকালে তিনি একটি টংদোকানে গিয়ে দেখেন যে দুই ভাইয়ের মাথায় গুলি করে তাদের মেরে ফেলা হয়েছে। এই শকিং ঘটনাগুলো তাকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করে। তিনি চার বন্ধুকে নিয়ে মুক্তিযুদ্ধে যোগদানের জন্য বাসা থেকে পালিয়ে যান, যদিও রাস্তায় আরও দুজন ধরা পড়ে যান।

মুক্তিযুদ্ধের প্রশিক্ষণ ও যুদ্ধ অভিজ্ঞতা

মুক্তিযুদ্ধে যোগদানের পর তিনি ভারতে প্রশিক্ষণ নেন এবং পরে বাংলাদেশে ফিরে আসেন। তিনি মন্দবাগে ক্যাপ্টেন গাফফারের অধীনে এবং ফোর ইস্ট বেঙ্গলে যুদ্ধ করেন। তাদের ক্যাম্প প্রায়ই পরিবর্তন করতে হতো, কারণ পাকিস্তানি আর্মি যদি অবস্থান জানতে পারে, তাহলে তারা সঙ্গে সঙ্গে সৈন্য পাঠাত। তিনি বলেন, "আমরা এক জায়গায় কখনো ক্যাম্প করতাম না। আমার মনে হয় দেড় মাসে আমরা ১২টা ক্যাম্প চেঞ্জ করেছি।"

তিনি মুক্তিযুদ্ধকে জনযুদ্ধ হিসেবে বর্ণনা করেন, কারণ গ্রামবাসীদের সাহায্য ছাড়া তারা সফল হতে পারতেন না। এক ঘটনায় তিনি বর্ণনা করেন কীভাবে তারা পাকিস্তানি আর্মির একটি কনভয়ের উপর অতর্কিত হামলা চালায়। এই যুদ্ধে তার সহযোদ্ধা টিটো গুরুতর আহত হন এবং পরে মারা যান। তিনি বলেন, "টিটোর এত বেশি ব্লিডিং হচ্ছিল যে সে শুয়ে ছিল। একটা মানুষ মারা যাওয়ার আগে যে কী শক্তিশালী হয়, সেটা নিজের চোখে না দেখলে বোঝা যায় না।"

নারীর উপর অত্যাচারের মর্মান্তিক ঘটনা

তিনি আরেকটি হৃদয়বিদারক ঘটনার কথা শেয়ার করেন, যেখানে একজন নারীকে পাকিস্তানি আর্মি বাংকারে তুলে নিয়ে যায় এবং পরে ছেড়ে দেয়, কিন্তু তিনি পাগল হয়ে যান। তিনি বলেন, "মহিলাটা কিছু বোঝেন না, পুরোপুরি শেষ। পাগল হয়ে গেছেন। তিনি খালি একটা জিনিস চেনেন, তাঁর বাড়ি।" এই ঘটনাগুলো দেশের জন্য তার ভালোবাসা আরও গভীর করে তোলে।

তরুণ প্রজন্মের প্রতি বার্তা

কর্নেল তৌফিকুর রহমান তরুণ প্রজন্মকে দেশকে ভালোবাসার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, "দেশ নিয়ে গর্ব করো। ভুলে যাও ওই টেন পারসেন্ট লোকদের, যারা আমাদের যুদ্ধের বিরুদ্ধে কাজ করেছিল, রাজাকার ছিল, আলবদর ছিল।" তিনি তার তিন মেয়েকে এই ইতিহাস জানিয়েছেন, কিন্তু ঘৃণা ছড়াতে নয়, বরং দেশপ্রেম জাগ্রত করতে। তিনি শেষ করেন এই বলে, "তোমাদের প্রথম দায়িত্ব হলো দেশকে ভালোবাসা। দেশকে ভালোবাসো, দেশ উন্নতি করবে। কোনো বাধাই বাধা হয়ে দাঁড়াবে না।"