ইরান যুদ্ধে আমিরাতের 'লিবারেল' মুখোশ খুলে যাচ্ছে, সাইবার আইনে শত শত গ্রেপ্তার
ইরান যুদ্ধে আমিরাতের মুখোশ খুলছে, সাইবার আইনে গ্রেপ্তার

ইরান যুদ্ধে আমিরাতের 'লিবারেল' মুখোশ খুলে যাচ্ছে, সাইবার আইনে শত শত গ্রেপ্তার

সম্প্রতি ইরানি ড্রোন দ্বারা দুবাই বন্দরে কুয়েতের তেলবাহী জাহাজ আল সালমিতে হামলার ঘটনা বিশ্বজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। জাহাজটিতে প্রায় ২০ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল ছিল, যা আগুনে পুড়ে যায়। তবে আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই হামলার কোনো স্পষ্ট ভিডিও বা ছবি সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েনি। শুধুমাত্র দূর থেকে তোলা একটি ছবিতে ধোঁয়া উঠতে দেখা গিয়েছিল।

খবর নিয়ন্ত্রণে সরকারের কঠোর পদক্ষেপ

বর্তমান সময়ে যেকোনো হামলার ছবি মুহূর্তেই স্মার্টফোনের মাধ্যমে ভাইরাল হয়ে যায়। ইরান, ইসরায়েল ও লেবাননে এমনটি ঘটলেও দুবাইয়ে তা হয়নি। এর পেছনে মূল কারণ হলো সংযুক্ত আরব আমিরাত সরকার ইরান যুদ্ধ সংক্রান্ত খবর নিয়ন্ত্রণে কঠোর অবস্থান নিয়েছে। যে কেউ হামলার ছবি বা ভিডিও শেয়ার করলে তাকে গ্রেপ্তার করা হচ্ছে।

গত ১২ মার্চ দুবাইয়ের ক্রিক হারবার এলাকায় একটি আবাসিক ভবনে ইরানি ড্রোন আঘাত হানে। সেই ভবনের তিনজন বাসিন্দা শুধুমাত্র পরিবারকে জানানোর জন্য নিজেদের ক্ষতিগ্রস্ত ঘরের ছবি ব্যক্তিগত বার্তায় পাঠিয়েছিলেন। তাদেরকেও গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এর আগে একটি প্রাইভেট গ্রুপ চ্যাটে হামলার খবর শেয়ার করায় ২১ জনকে আটক করা হয়।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

সাইবার অপরাধ আইনের কঠোর শাস্তি

দেশটির সাইবার অপরাধ আইনে উল্লেখ আছে যে, 'মিথ্যা খবর, গুজব বা উত্তেজনামূলক কিছু প্রচার করলে' শাস্তি পেতে হবে। শাস্তির মধ্যে রয়েছে দুই বছরের কারাদণ্ড, দেশ থেকে বহিষ্কার এবং ২০ হাজার থেকে ২ লাখ দিরহাম পর্যন্ত জরিমানা।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

'ডিটেইনড ইন দুবাই' নামক সংস্থার প্রধান রাধা স্টার্লিং জানান, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে এই আইনে শত শত সাধারণ মানুষ গ্রেপ্তার হয়েছে। তিনি বলেন, 'নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা রাস্তায় মানুষকে থামিয়ে তাদের ফোন তল্লাশি করছে, এমনকি বাড়িতেও একই কাজ করছে। ফিলিপিনো গৃহকর্মী থেকে শুরু করে কোটিপতি পর্যন্ত সবাই এর শিকার হচ্ছেন।'

সাংবাদিকদের ওপর নিষেধাজ্ঞা

আমিরাতের অ্যাটর্নি জেনারেল হামাদ সাইফ আল শামসির মতে, হামলার ছবি শেয়ার করলে মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ছড়াতে পারে এবং 'দেশের আসল পরিস্থিতি সম্পর্কে ভুল ধারণা' তৈরি হতে পারে। তবে অনেক দেশি-বিদেশি সাংবাদিকও এই নিয়মের কারণে দীর্ঘদিন ধরে আটক রয়েছেন।

কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্টস-এর মধ্যপ্রাচ্য বিভাগের পরিচালক সারা কুদাহ বলেন, আমিরাতে কর্মরত সাংবাদিকরা গোপনে তাকে জানিয়েছেন যে 'তারা ঘটনাবলি প্রকাশ করতে বা কোনো মিডিয়ায় কথা বলতে পারছেন না—কঠোর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে।'

দুবাইয়ের 'নিরাপদ' ভাবমূর্তিতে আঘাত

দুবাই নিজেকে 'বিশ্বের নিরাপদতম শহর' হিসেবে পরিচয় দিলেও এই যুদ্ধে সেই ভাবমূর্তি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আমিরাতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে দেশটিতে ১,৯৭৭টি ড্রোন, ১৯টি ক্রুজ মিসাইল এবং ৪৩৩টি ব্যালিস্টিক মিসাইল আঘাত হেনেছে।

অনেক বিদেশি নাগরিক দুবাই ছেড়ে চলে গেছেন, স্কুল ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলো অনলাইনে চলছে এবং দুবাই বিমানবন্দর মাত্র ৬০% ক্ষমতায় পরিচালিত হচ্ছে।

বিশ্লেষকদের মতামত

শারজাহর আমেরিকান ইউনিভার্সিটির সহযোগী অধ্যাপক শ্রেয়া মিত্র বলেন, 'ভারত বা পাকিস্তান থেকে আসা মানুষের কাছে দুবাই এখনো অনেক বেশি নিরাপদ মনে হতে পারে।' তিনি উল্লেখ করেন যে দক্ষিণ এশিয়ার ইনফ্লুয়েন্সাররা রমজানের খাবার উৎসব থেকে পোস্ট করে বলছেন, 'আমি এখানে আছি, দিল্লিতে এটা সম্ভব হতো না।'

রাধা স্টার্লিং এই পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে বলেন, 'যদি তারা শুধু মিসাইল ও ড্রোন ঠেকানোর দিকে মনোযোগ দিত, তাহলে দীর্ঘমেয়াদে তাদের ভাবমূর্তি আরও উন্নত হতো। কিন্তু সাইবার অপরাধ আইনে মানুষ ধরে ধরে গ্রেপ্তার করায় দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি হয়ে গেছে।'

সারা কুদাহও একমত পোষণ করে বলেন, 'বিশ্বের প্রতিটি সরকারকে বুঝতে হবে যে সেন্সরশিপ ও নিষেধাজ্ঞায় কোনো কাজ হয় না। বরং এটা সেই দেশগুলোর ভাবমূর্তি নষ্ট করে দেয়।'