বিএনপি সরকারের আমলে আইনশৃঙ্খলা ও রাজনৈতিক প্রতিহিংসার নতুন চ্যালেঞ্জ
আইনশৃঙ্খলা ও রাজনৈতিক প্রতিহিংসা: বিএনপি সরকারের চ্যালেঞ্জ

বিএনপি সরকারের আমলে আইনশৃঙ্খলা: প্রতিশ্রুতি বনাম বাস্তবতা

বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতির প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ খুব কড়া ভাষায় মব সহিংসতার দিন শেষ বলে ঘোষণা দিয়েছেন। পুলিশের শীর্ষ পদে রদবদল করা হয়েছে এবং মাঠপর্যায়েও কিছু পরিবর্তন আনা হয়েছে। উপপরিদর্শক ও কনস্টেবল পদে নতুন পুলিশ সদস্য নিয়োগের চিন্তাভাবনা চলছে। তবে হতোদ্যম পুলিশ বাহিনীতে উদ্যম ফেরাতে নতুন মুখের অন্তর্ভুক্তি জরুরি বলে মনে করা হচ্ছে।

অপরাধ প্রবণতা ও অর্থনৈতিক সংকট

গত সরকারের আমলে শিল্পকারখানা বন্ধ হওয়া এবং কাজের সুযোগ কমে যাওয়ায় চুরি, ছিনতাইয়ের মতো অপরাধের প্রবণতা বেড়ে যায়। গত কয়েক দিন আবারও ছিনতাইয়ের খবর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও গণমাধ্যমে পাওয়া যাচ্ছে। এর মধ্যে ঢাকার মোহাম্মদপুরে দুদকের একজন পরিচালকের আইফোন ও টাকা ছিনতাই এবং নারায়ণগঞ্জে মোটরসাইকেল থামিয়ে পুলিশ সদস্যের অস্ত্র ছিনতাইয়ের খবর বেশ আলোচিত হয়েছে। ডিসেম্বর, জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি মাসে এ ধরনের ছিনতাইয়ের খবর কম শোনা গেছে। এর একটা কারণ হতে পারে নির্বাচনী প্রচারণাকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন দল ও প্রার্থীর পকেট থেকে যে বিপুল অঙ্কের টাকা বের হয়েছে, তা মিছিল, মিটিংসহ নানা উপায়ে মানুষের পকেটে গেছে।

নারী ও শিশু নির্যাতনের ভয়াবহতা

সমাজের ওপর রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ শিথিল থাকায় প্রায় সব ধরনের অপরাধ বেড়েছিল। এ রকম একটি বাস্তবতায় অপরাধীদের সবচেয়ে সহজ লক্ষ্যবস্তু নারী ও শিশু তা পরিসংখ্যানই বলে দিচ্ছে। ২০২৪ সালের তুলনায় ২০২৫ সালে ধর্ষণ ও গণধর্ষণের মতো অপরাধে মামলা বেড়েছে প্রায় ২৭ শতাংশ। টার্গেট কিলিং বা লক্ষ্যবস্তু বানিয়ে হত্যাকাণ্ডও গত সরকারের শেষ সময়ে এসে ভয়াবহভাবে বেড়ে গিয়েছিল। বিএনপি সরকারের প্রথম মাসে টার্গেট কিলিংয়ের ঘটনা খুব একটা না ঘটলেও নারী ও শিশুদের ওপর নৃশংস অপরাধের ধারা অব্যাহত আছে।

নরসিংদীতে কিশোরীকে দলবদ্ধ ধর্ষণ ও সৎ বাবা কর্তৃক হত্যা; পাবনায় ডাকাতির সময় দাদিকে হত্যা ও নাতনিকে ধর্ষণের পর হত্যা; হাতিয়া থেকে ঢাকাগামী লঞ্চে শিক্ষার্থীকে ধর্ষণ; সীতাকুণ্ডে ধর্ষণচেষ্টার পর শিশুকে শ্বাসনালি কেটে হত্যার ঘটনাগুলো জনমনে ভয় ও উদ্বেগ তৈরি করেছে। এসব মামলায় দ্রুততম সময়ের মধ্যেই আসামিদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তবে অপরাধ কমাতে হলে বিচারের দৃষ্টান্ত স্থাপন করাটা সবচেয়ে জরুরি। কেননা, আমাদের এখানে নারী ও শিশু নির্যাতনের মামলাগুলোর সিংহভাগই নিষ্পত্তি হয় না।

রাজনৈতিক গ্রেপ্তার ও সন্ত্রাসবিরোধী আইনের ব্যবহার

৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভাষণ বাজানোকে কেন্দ্র করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শামসুন্নাহার হল সংসদের সাবেক ভিপি শেখ তাসনিম আফরোজ ইমি এবং ছাত্রলীগের সাবেক দুই নেতাকে আটকের পর সন্ত্রাসবিরোধী আইনে গ্রেপ্তার দেখায় পুলিশ। সন্ত্রাসবিরোধী আইনটি বাংলাদেশের অন্যতম নিবর্তনমূলক আইন। নিপীড়নের হাতিয়ার হওয়ায় এই আইনকে মানবাধিকারকর্মীরা কালো আইন বলেন।

২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ আমলে আইনটি পাস হয়েছিল। শেখ মুজিবের ৭ মার্চের ভাষণ বাজানোর সঙ্গে সন্ত্রাসের কী সম্পর্ক, সেটা বোধগম্য নয়। নিম্ন আদালত কেন তাঁদের জামিন দেননি, সেটারও রাজনৈতিক বিবেচনা ছাড়া বোধগম্য কারণ বা যুক্তি খুঁজে পাওয়া কঠিন। সবচেয়ে বড় বিষয় হচ্ছে, সাত মার্চের ভাষণ বাজানো আইনগত কোনো বিধিনিষেধ নেই। বরং শাহবাগে এই ভাষণ যখন তাঁরা বাজাচ্ছিলেন, তখন ডাকসুর কয়েকজন সদস্য ও ছাত্রশক্তির নেতা-কর্মীরা হামলা করেন এবং একজনকে মারধর করেন। এখানে প্রশ্নটা ওঠা স্বাভাবিক যে পুলিশের দায়িত্ব আসলে হামলাকারীদের পক্ষ নেওয়া নাকি হামলার শিকার যাঁরা, তাঁদের রক্ষা করা?

রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি

রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ সব সময়ই দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক হিসেবে বিবেচিত হয়ে এসেছে। আমাদের ক্ষমতাসীনদের মধ্যে এবং আমলাতন্ত্র ও পুলিশের মধ্যে এমন ধারণা গভীরভাবে গেড়ে বসে আছে যে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের ক্ষেত্রে মানবাধিকার ও আইনি সুরক্ষার বিষয়গুলো প্রযোজ্য নয়। মা-বাবা বা স্বজনদের মৃত্যু হলে প্যারোলে মুক্তি ও শেষকৃত্যে অংশ নেওয়ার বিধান রয়েছে। আওয়ামী লীগের আমলে বারবার সংবাদের শিরোনাম হয়েছে, হাতকড়া ও ডান্ডাবেড়ি পরে বিএনপি নেতা, ছাত্রদল নেতা, যুবদল নেতার মা-বাবার জানাজায় অংশ নেওয়ার খবর ও ছবি। এ নিয়ে মানবাধিকারকর্মীদের ব্যাপক সমালোচনা ছিল।

একটি রিট আবেদনে ২০২৪ সালের জানুয়ারি মাসে হাইকোর্ট আদেশ দেন, শীর্ষ সন্ত্রাসী, জঙ্গি, দুর্ধর্ষ প্রকৃতির বন্দী ছাড়া আটক অভিযুক্ত ব্যক্তিদের গণহারে ডান্ডাবেড়ি পরানো যাবে না। কিন্তু সেই আদেশ বাস্তবায়নে খুব একটা উৎসাহ দেখা যায়নি। ঝালকাঠির নলছিটিতে নিষিদ্ধঘোষিত ছাত্রলীগের কারাবন্দী এক নেতা প্যারোলে মুক্তি পেয়ে তাঁর বাবার জানাজায় অংশ নিয়েছেন। এ সময় তিনি পায়ে ডান্ডাবেড়ি পরানো অবস্থায় ছিলেন। ছাত্রলীগের ওই নেতার নাম রাকিবুল ইসলাম জোমাদ্দর (২৫)। তিনি উপজেলার সুবিদপুর ইউনিয়ন ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক।

পুলিশ নিয়োগ ও রাজনৈতিক প্রভাব

পুলিশের কিছু নিয়োগ নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। ২০০৬ সালে নিয়োগ বাতিল হওয়া ৬ শতাধিক উপপরিদর্শক (এসআই) ও সার্জেন্টকে পুনর্বহালের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এ ছাড়া গত বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে শামসুন্নাহার হল-কাণ্ডসহ নানা বিষয়ে আলোচিত পুলিশ কর্মকর্তা কোহিনূর মিয়াকে বরখাস্ত হওয়ার দেড় দশক পর বরখাস্ত আদেশ বাতিলের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এটা সেই অতি পরিচিত রাজনৈতিক চর্চা। এই চর্চার মধ্য দিয়ে পুলিশকে রাজনৈতিক পুলিশে রূপান্তর হতে আমরা বহুবার দেখেছি।

সরকারের পদক্ষেপ ও নাগরিকদের প্রত্যাশা

আইনশৃঙ্খলা উন্নতির প্রশ্নে সরকার কোন পথে এগোতে চায়, সেটা ঘোষিত নীতির চেয়ে বাস্তবায়নের কৌশল দেখেই নাগরিকদের মধ্যে ধারণা তৈরি হয়। সরকারের পদক্ষেপই এ ক্ষেত্রে একটি বড় সিগন্যাল। গত ২৪ ফেব্রুয়ারি কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সদস্যদের জামিন দেওয়াকে কেন্দ্র করে বরিশাল আদালতে এজলাস ভাঙচুর ও মব তৈরির ঘটনায় আইনজীবী সমিতির সভাপতিকে গ্রেপ্তার করা হয়। এটা নিঃসন্দেহে একটা আন্তরিক বার্তা।

অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে আদালত হয়ে উঠেছিল মবের অন্যতম কেন্দ্র। জুলাই অভ্যুত্থান-সংশ্লিষ্ট মামলায় আদালতে আসামিদের মারধর, মিছিল, ডিম নিক্ষেপের মতো ঘটনা ঘটেছে। হত্যা মামলা দিয়ে হরেদরে আসামি করা হয়েছে। জামিনযোগ্য ব্যক্তিরা মবের চাপে জামিন পাননি। মামলা-বাণিজ্য ও হয়রানির অসংখ্য ঘটনা ঘটেছে। অন্তর্বর্তীর আমলেও আদালতকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহারের আগের ধারা থেকে বের করে আনা যায়নি।

চব্বিশের অভ্যুত্থানে যারা হত্যাকাণ্ডসহ বিভিন্ন অপরাধে জড়িত, তাদের অবশ্যই বিচারের মুখোমুখি করা প্রয়োজন। কিন্তু রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে নির্দোষ কাউকে জেলে ভরে রাখার রাজনৈতিক প্রথার অবসান হওয়া জরুরি। প্রিয়জনের মৃত্যুর পর হাতকড়া আর ডান্ডাবেড়ি পরে জানাজায় অংশ নেওয়ার ঘটনাও বন্ধ হওয়া প্রয়োজন। এই চর্চা প্রতিহিংসার আরেকটি নতুন অধ্যায় খুলে দিতে পারে।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে সবচেয়ে বড় সংকট হচ্ছে, এখানে যে জিতবে, তারাই সবকিছু নিয়ে নিতে চায়। এই মানসিকতা থেকেই পুলিশ, প্রশাসন, বিচার বিভাগ—সবখানেই ‘আমাদের লোক’ খোঁজ করা হয়। এটা শেষ পর্যন্ত গোত্রতান্ত্রিক ও কর্তৃত্ববাদী শাসন ও স্বজনতোষী অর্থনীতির পথ খুলে দেয়। নতুন সরকারের বয়স এখনো এক মাস পার হয়নি। এখনই কিছু অনুমান করাটা অনেক বেশি আগাম হয়ে যায়। তবে সরকারের কিছু পদক্ষেপ, কিছু নিয়োগ, কিছু সিগন্যাল— নাগরিকদের মধ্যে বড় প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।