যুক্তরাষ্ট্রে খালিস্তানি নেতা হত্যার ষড়যন্ত্রে ভারতীয় নাগরিক নিখিল গুপ্তের দোষ স্বীকার
যুক্তরাষ্ট্রে খালিস্তানি নেতা হত্যার ষড়যন্ত্রে দোষ স্বীকার

যুক্তরাষ্ট্রে খালিস্তানি নেতা হত্যার ষড়যন্ত্রে ভারতীয় নাগরিকের দোষ স্বীকার

যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে বসবাসরত খালিস্তানি আন্দোলনের নেতা ও মার্কিন নাগরিক গুরপতবন্ত সিং পান্নুনকে হত্যার ষড়যন্ত্রের দায় স্বীকার করেছেন ভারতের নাগরিক নিখিল গুপ্ত। ম্যানহাটানের একটি ফেডারেল আদালতে তিনি নিজের অপরাধ মেনে নিয়েছেন, যা আন্তর্জাতিক মহলে ব্যাপক কূটনৈতিক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে। এই ঘটনাটি ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার সম্পর্কের ওপর গভীর প্রভাব ফেলতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।

মার্কিন আদালতে নিখিল গুপ্তের স্বীকারোক্তি

মার্কিন বিচার বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ৫৪ বছর বয়সী নিখিল গুপ্ত গত বৃহস্পতিবার ভাড়াটে খুনি নিয়োগ, খুনের ষড়যন্ত্র এবং অর্থ পাচারের ষড়যন্ত্রের অভিযোগ স্বীকার করে নিয়েছেন। আদালতে তাঁর এই স্বীকারোক্তির পর আগামী ২৯ মে তারিখে সাজা ঘোষণা করা হতে পারে। নিখিল গুপ্তের সর্বোচ্চ ৪০ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড হতে পারে, তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আদালতই নেবেন।

মার্কিন প্রসিকিউটরদের দাবি, নিখিল গুপ্ত ভারত সরকারের এক কর্মকর্তার নির্দেশে নিউইয়র্কভিত্তিক শিখ রাজনৈতিক কর্মী গুরপতবন্ত সিং পান্নুনকে হত্যার পরিকল্পনা করেছিলেন। আদালতের নথিতে সরাসরি নাম উল্লেখ না থাকলেও নিশানা যে পান্নুন ছিলেন, তা স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান। পান্নুন খালিস্তানপন্থী আন্দোলনের একজন পরিচিত মুখ হিসেবে বিবেচিত হন।

ভারত সরকারের অবস্থান ও তালিকাভুক্তি

ভারত সরকার গুরপতবন্ত সিং পান্নুনকে তাদের প্রধান সন্ত্রাসবিরোধী আইন (ইউএপিএ) এর অধীনে ‘সন্ত্রাসী’ হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছে। তাঁর সংগঠনকেও ভারতে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। ভারতের অভিযোগ, পান্নুন ‘খালিস্তান’ নামে একটি পৃথক রাষ্ট্র গঠনের নামে সহিংসতা ও বিচ্ছিন্নতাবাদী কার্যক্রম উসকে দিচ্ছেন। এই প্রেক্ষাপটে হত্যার ষড়যন্ত্রটি আরও জটিল আন্তর্জাতিক মাত্রা পেয়েছে।

ষড়যন্ত্রের পেছনের পরিকল্পনা ও তদন্ত

মার্কিন কৌঁসুলিদের অভিযোগ অনুযায়ী, ২০২৩ সালে নিখিল গুপ্তকে নিয়োগ করেছিলেন বিকাশ যাদব নামে এক ব্যক্তি, যিনি ভারতের মন্ত্রিপরিষদ সচিবালয়ে কর্মরত ছিলেন এবং সেখান থেকে ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’-এর কার্যক্রম পরিচালিত হয়। যাদবের নির্দেশেই নিখিল গুপ্ত যুক্তরাষ্ট্রে পান্নুনকে হত্যা করতে ভাড়াটে খুনি খুঁজছিলেন।

তবে নিখিল গুপ্ত জানতেন না যে, তিনি যাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন, তারা আসলে মার্কিন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হয়ে কাজ করছিলেন। তদন্তকারীদের দাবি, পান্নুনকে হত্যার জন্য ১ লাখ মার্কিন ডলারের চুক্তি হয়েছিল, যার মধ্যে ১৫ হাজার ডলার অগ্রিম দেওয়া হয়েছিল। নিখিল গুপ্ত পান্নুনের বাড়ির ঠিকানা ও ফোন নম্বরসহ ব্যক্তিগত তথ্য পাচার করেছিলেন, কিন্তু শেষ পর্যন্ত মার্কিন ড্রাগ এনফোর্সমেন্ট অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (ডিইএ) এবং এফবিআই এই ষড়যন্ত্র নস্যাৎ করে দিয়েছিল।

কূটনৈতিক প্রভাব ও ভারতের প্রতিক্রিয়া

পান্নুন হত্যাচেষ্টার এই মামলাটি ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক সম্পর্কের ওপর উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলেছে। ২০২৩ সালের নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্র এই অভিযোগ তোলার পর ভারত বিষয়টি খতিয়ে দেখতে একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করে। ভারত সরকার তখন জানিয়েছিল যে তারা অভিযোগটিকে গুরুত্ব দিচ্ছে, তবে সরকারিভাবে এই ষড়যন্ত্রে লিপ্ত থাকার দাবি প্রত্যাখ্যান করেছিল।

মার্কিন বিচার বিভাগ আরও জানিয়েছে, নিখিল গুপ্ত একজন ছদ্মবেশী কর্মকর্তাকে বলেছিলেন, ২০২৩ সালের জুনে ভারতের প্রধানমন্ত্রীর যুক্তরাষ্ট্র সফরের সময় যেন এই হত্যাকাণ্ড না ঘটানো হয়। তবে ওই মাসেই কানাডায় শিখ নেতা হরদীপ সিং নির্ঝর খুন হওয়ার পর নিখিল গুপ্ত জানিয়েছিলেন, ‘এখন আর অপেক্ষা করার দরকার নেই।’ ২০২৩ সালের জুনে চেক প্রজাতন্ত্র থেকে নিখিল গুপ্তকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং ২০২৪ সালে তাঁকে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে হস্তান্তর করা হয়।

নিখিল গুপ্তের দোষ স্বীকারের পর এখন ভারত সরকার কী প্রতিক্রিয়া জানায়, তা আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের নজর কেড়েছে। এই ঘটনাটি ভবিষ্যতে দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক আলোচনা ও সহযোগিতার গতিপথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।