বাংলার যুবকরা বিদেশের রণাঙ্গনে বলি: রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতার নগ্ন দলিল
বিদেশের রণাঙ্গনে বাংলাদেশি যুবকের মৃত্যু: রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতা

বড়ই অমানবিক ও পরিহাসের বিষয়! যেই যৌবন হইবার কথা ছিল দেশ গড়িবার হাতিয়ার, আজ তাহা বিদেশের রণাঙ্গনে ক্ষেপণাস্ত্র বা ড্রোন হামলায় নিঃশেষিত হইয়া যাইতেছে! কবির ভাষায় বলিতে হয়- ‘বাংলার এই শ্যামল আঙিনায় যাহার জন্ম,/ বিদেশের তপ্ত বালুকা কি তাহার শেষ শয্যা?’ আবার এই পরিস্থিতিতে কবির সেই হাহাকারও যেন আজ সত্য হইয়া বাজিতেছে- ‘পৃথিবী অমোঘ এক মৃত্যুপুরী, তবু মানুষের আশা অফুরান।’ সেই অন্তহীন আশার ছলে পড়িয়া আজ বাংলার মায়ের দামাল ছেলেরা বেঘোরে প্রাণ দিতেছে সুদূর ইউক্রেন-রাশিয়ার যুদ্ধে!

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে বাংলাদেশিদের জড়াইয়া পড়া

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে বাংলাদেশিদের জড়াইয়া পড়া এবং একের পর এক মৃত্যুর খবর আসিলেও আমাদের নীতিনির্ধারকদের টনক নড়িতেছে না। সর্বশেষ রাশিয়ার সীমান্তে ইউক্রেনের ড্রোন হামলায় কিশোরগঞ্জের যুবক মো. রিয়াদ রশীদ (২৮) নিহত হইয়াছেন। একটি কোম্পানিতে চাকুরির প্রলোভনে পড়িয়া রাশিয়ায় যান তিনি; কিন্তু সেইখানে গিয়া তাহাকে শেষ পর্যন্ত রুশ সেনাবাহিনীতে যোগদান করিতে বাধ্য করা হয়। এই সংক্রান্ত নানা প্রতারণার অভিযোগ পাওয়া যাইতেছে, যাহা তদন্ত করিয়া দেখা প্রয়োজন। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে এখনই এই ব্যাপারে উদ্যোগ গ্রহণ করিতে হইবে।

মানবাধিকার সংগঠনের তথ্য

গত মার্চে ফর্টিফাই রাইটস ও ট্রুথ হাউন্ডস নামে দুইটি বিদেশি মানবাধিকার সংগঠন জানায়, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে জড়াইয়া পড়িয়াছে ১০৪ বাংলাদেশি এবং গত ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত মারা গিয়াছেন ৩৪ জন। সংশ্লিষ্টদের ধারণা, প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি। তাহাদের অনুসন্ধানে উঠিয়া আসিয়াছে যে, মানব পাচারকারীরা প্রথমে ভুয়া কাজের কথা বলিয়া ভুক্তভোগীদের রাশিয়ার সশস্ত্র বাহিনীতে যোগ দিতে প্রলুব্ধ করে। তাহারা রুশ ভাষায় লিখিত চুক্তিপত্রে তাহাদের স্বাক্ষর করায়, যাহা তাহারা পড়িতেও পারে না।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

শুধু বাংলাদেশি নহে, শ্রীলঙ্কা, নেপাল ও ভারত হইতে যথাক্রমে ৭৫১, ৮৫১ ও ১৭০ জন রাশিয়ার হইয়া যুদ্ধে অংশ লইয়াছে। তাহার মধ্যে শ্রীলঙ্কার ২৭৫, নেপালের ১১৬ ও ভারতের ২৩ জন নিহত হইয়াছে। ২ লক্ষ হইতে আড়াই লক্ষ টাকার বেতনের চাকুরির প্রলোভন দেখাইয়া এই সকল যুবককে জোরপূর্বক যুদ্ধে নিয়োজিত করা মানবাধিকার লঙ্ঘনের শামিল। ইহা খুবই উদ্বেগজনক পরিস্থিতি।

একজন ভুক্তভোগীর লোমহর্ষক অভিজ্ঞতা

গতকাল ইত্তেফাকের অনলাইনে প্রকাশিত এক সংবাদে জনৈক মোহন মিয়াজির যে লোমহর্ষক অভিজ্ঞতা ফুটিয়া উঠিয়াছে, তাহা কেবল একজন ব্যক্তির কাহিনি নহে, বরং ইহা এক গভীর সংকটের ইঙ্গিত। একইভাবে আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের মিশর, উগান্ডা, নাইজেরিয়া ও ইরাকের মতো দেশসমূহ হইতেও দরিদ্র যুবকদের কৌশলে রণাঙ্গনে নামানো হইতেছে।

জানা যায়, ইউক্রেন যুদ্ধে এই যাবৎ রাশিয়ার ৩ লক্ষ ২৫ হাজারেরও অধিক সৈন্যের প্রাণহানি ঘটিয়াছে। ফলে সৈন্যবাহিনীর শূন্যস্থান পূরণে তাহারা মরিয়া হইয়া বিদেশের ভাড়াটে সৈন্যের ওপর নির্ভর করিতেছে।

সংকটের মূল: বেকার সমস্যা ও রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতা

প্রকৃত পক্ষে এই সংকটের মূলে রহিয়াছে আমাদের দীর্ঘদিনের বেকার সমস্যা। উন্নয়নশীল ও দরিদ্র দেশের সরকারপ্রধানগণ মুখে বড় বড় কথা বলিয়া থাকেন, উন্নয়নের জোয়ারের কথা বলেন। ঘরে ঘরে চাকুরি দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন; কিন্তু বাস্তবে শিক্ষিত-অশিক্ষিত বেকারের মিছিল বাড়িতেই থাকে। তাহাদের গালভরা বুলি ও পরিসংখ্যানের আড়ালে চাপা পড়িয়া যায় এই সকল দেশের দুর্নীতি, অনিয়ম ও সীমাহীন লুণ্ঠন।

দেশের সম্পদ পাচার হইয়া বিদেশের ব্যাংকে জমা হয়, অথচ সেই অর্থে যদি নূতন নূতন শিল্পকারখানা ও কর্মসংস্থান গড়িয়া তোলা হইত, তাহা হইলে আজ এই সকল দেশের যুবকদের ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়া উন্নত দেশে যাইবার পথে সলিল সমাধি বরণ করিতে হইত না। এই পরিস্থিতি আসলে আমাদের রাষ্ট্রব্যবস্থার ব্যর্থতার এক নগ্ন দলিল।

নেতাদের ব্যর্থতা ও লজ্জার বিষয়

দেশের নেতারা উন্নয়নের জিকির তুলিয়া তুষ্ট থাকেন; কিন্তু নাগরিকের জীবনের নিরাপত্তা ও পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান তৈরি করিতে পারেন না। তাহারা যাহা পারেন তাহা হইল-দেশের বিরোধী দল বা মতের লোকদের উপর চড়াও হওয়া, তাহাদের বিরুদ্ধে মিথ্যা ও সাজানো মামলা দিয়া জেলে পুরা। ইহার চাইতে লজ্জার বিষয় আর কী হইতে পারে? আমাদের যুবকদের রক্তে আজ রঞ্জিত হইতেছে ভিনদেশের মাটি, তবু কি শাসকদের বোধোদয় হইবে না? কুম্ভকর্ণের ঘুম তাহা হইলে আর কখন ভাঙিবে?