আলাস্কায় ১৫৭৮ ফুট সুনামি, জলবায়ু পরিবর্তনকে দায়ী করছেন বিজ্ঞানীরা
আলাস্কায় ১৫৭৮ ফুট সুনামি, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব

দক্ষিণ-পূর্ব আলাস্কার টঙ্গাস ন্যাশনাল ফরেস্টের ভেতরে ট্রেসি আর্ম ফিয়র্ড নামের একটি অত্যন্ত সুন্দর এলাকা রয়েছে। চারপাশে উঁচু গ্রানাইট পাথরের পাহাড়, ঝরনা আর হিমবাহে ঘেরা সরু সামুদ্রিক খাঁড়িটি পর্যটকদের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয়। কিন্তু ২০২৫ সালের ১০ আগস্ট সকালে এই শান্ত এলাকায় ঘটে যায় এক ভয়াবহ ঘটনা।

ইতিহাসের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ সুনামি

সেদিন ভোররাতে একটি শক্তিশালী ভূমিধসের ফলে সেখানে এক বিশাল সুনামির সৃষ্টি হয়। বিজ্ঞানীদের গবেষণায় দেখা গেছে, ওই সুনামির ঢেউয়ের উচ্চতা ছিল ১ হাজার ৫৭৮ ফুট বা ৪৮১ মিটার, যা এযাবৎকালের রেকর্ড করা ইতিহাসের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ। তুলনা করে বোঝানোর জন্য বলা যায়, নিউইয়র্কের এম্পায়ার স্টেট বিল্ডিংয়ের উচ্চতা ১ হাজার ২৫০ ফুট, অর্থাৎ সুনামির ঢেউটি ১০২ তলা ভবনের চেয়েও অনেক উঁচু ছিল।

প্রবল বেগে ফিয়র্ডের সরু খাঁড়ি দিয়ে বয়ে যাওয়ার সময় ওই বিশাল ঢেউ পাহাড়ের খাড়া দেওয়াল থেকে গাছপালাকে এক নিমেষেই উপড়ে ফেলে দেয়।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

সৌভাগ্য যে বড় দুর্ঘটনা ঘটেনি

ট্রেসি আর্ম ফিয়র্ড এলাকাটি পর্যটকদের কাছে খুবই জনপ্রিয় এবং প্রতিদিন অসংখ্য জাহাজ ও নৌকা এখানে চলাচল করে। তবে সুনামিটি ঘটে ভোর ৫টা ৩০ মিনিটে। এত ভোরে কোনো ক্রুজ জাহাজ বা পর্যটকবাহী নৌকা সেখানে না থাকায় বড় কোনো দুর্ঘটনা ঘটেনি এবং কেউ আহত হয়নি। ক্যালগারি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক ড্যান শুগার এ ঘটনাকে অবিশ্বাস্য সৌভাগ্য বলে বর্ণনা করে বলেন, 'ভূমিধসটি ভোরে হওয়ায় আমরা এবার বেঁচে গেছি। কিন্তু ভবিষ্যতে যখন আবার এমন ঘটনা ঘটবে, তখন আমরা হয়তো এতটা ভাগ্যবান না-ও হতে পারি।'

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব

বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, এই ভয়াবহ ভূমিধসের পেছনে দায়ী হলো জলবায়ু পরিবর্তন। পৃথিবীর তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়ায় পাহাড়ের শিলাস্তরকে ধরে রাখা হিমবাহটি গলে পিছু সরে গিয়েছিল। এর ফলে পাহাড়ের সেই অংশটি অবলম্বনহীন হয়ে পড়ে এবং একসময় হুড়মুড় করে ধসে পড়ে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

পৃথিবীর যে জায়গাগুলোয় জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব সবচেয়ে আগে ও স্পষ্টভাবে দেখা যায়, এই ফিয়র্ডগুলো তার মধ্যে অন্যতম। ২০২৫ সালের সেই সুনামির কোনো সরাসরি ছবি বা ভিডিও হাতে ছিল না। তাই বিজ্ঞানীরা পরে ড্রোন ও স্যাটেলাইট থেকে তোলা ছবি, ভূমিকম্পের তথ্য ও সে সময় আশপাশে থাকা মানুষের বর্ণনার সাহায্য নিয়ে পুরো ঘটনাটি নতুন করে বোঝার চেষ্টা করেছেন।

ভূমিধসের পরিমাণ ও প্রভাব

মাত্র ১ মিনিটের মধ্যে পাহাড় থেকে প্রায় ৮৩ মিলিয়ন ঘন গজ পাথর নিচে ধসে পড়েছিল। ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনের গবেষক স্টিফেন হিকস বলেন, এই পরিমাণ মিসরের গিজার পিরামিডের চেয়েও প্রায় ২৪ গুণ বড়। এত বিশাল ওজনের পাথর যখন একসঙ্গে আছড়ে পড়ে, তখন পৃথিবীতে এমন এক কম্পন সৃষ্টি হয়, যা সারা বিশ্বের সিসমোমিটারে ধরা পড়েছিল।

পাহাড়ধসের পর কিছু ঢেউ ফিয়র্ডের সরু খাঁড়ির ভেতরে আটকা পড়ে যায়। ফলে পানি সেখানে শান্ত না হয়ে বারবার এপাশ-ওপাশ আছড়ে পড়তে থাকে। এই ছলাৎ ছলাৎ শব্দ ও পানির দুলুনি বেশ কয়েক দিন ধরে চলেছিল।

সুনামির ইতিহাস ও পূর্বাভাসের সম্ভাবনা

পৃথিবীর ইতিহাসে এখন পর্যন্ত রেকর্ড করা সবচেয়ে উঁচু সুনামিটিও ঘটেছিল আলাস্কায়। ১৯৫৮ সালে লিটুয়া উপসাগরে বিশাল এক ভূমিধসের ফলে প্রায় ১ হাজার ৭০০ ফুট উঁচু ঢেউ সৃষ্টি হয়েছিল। গভীর সমুদ্রে সৃষ্ট সুনামি অনেক দূর পর্যন্ত যেতে পারে এবং উপকূলে ব্যাপক ক্ষতি করে। ২০০৪ সালে ভারত মহাসাগরের সুনামিতে প্রায় ২ লাখ ৩০ হাজার মানুষ মারা গিয়েছিলেন। অন্যদিকে ২০১১ সালে জাপানের সুনামিতে প্রাণ হারিয়েছিলেন ১৫ হাজারের বেশি মানুষ।

ভূমিকম্পের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, চূড়ান্ত ভূমিধসের প্রায় এক সপ্তাহ আগে থেকেই ওই এলাকায় ছোট ছোট ভূমিকম্প হচ্ছিল। এটি ছিল মূলত পাহাড়ের সেই বিশাল অংশটিতে ফাটল ধরার সংকেত। এই তথ্যগুলো ব্যবহার করে ভবিষ্যতে হয়তো ভূমিধস বা সুনামির সঠিক পূর্বাভাস দেওয়ার প্রযুক্তি তৈরি করা সম্ভব হবে।

গত ৬ এপ্রিল সায়েন্স জার্নালে প্রকাশিত গবেষণাপত্রে এই সুনামি নিয়ে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে। সূত্র: রয়টার্স