জাতিসংঘ মিশনে পুলিশের অংশগ্রহণ কমছে, কাউন্সেলর পদ শূন্য
জাতিসংঘ মিশনে পুলিশের অংশগ্রহণ কমছে, কাউন্সেলর পদ শূন্য

জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশনে পুলিশের অংশগ্রহণ বাড়াতে সংস্থাটির বাংলাদেশ স্থায়ী মিশনে পুলিশের ‘কাউন্সেলর’ পদ তৈরি করা হয়। কিন্তু সাত বছরেও সেই পদে কাউকে নিয়োগ করা হয়নি। এর ফলে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে পুলিশের অংশগ্রহণ কমছে বলে বাহিনীর কর্মকর্তারা দাবি করছেন। পুলিশ সদর দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, এখন কঙ্গো, দক্ষিণ সুদানসহ আফ্রিকা অঞ্চলে শান্তিরক্ষী হিসেবে মাত্র ৩৫ জন পুলিশ সদস্য কর্মরত।

৩৭ বছরে ২১ হাজার ৮১৬ পুলিশ সদস্যের দায়িত্ব পালন

পুলিশ সদর দপ্তরের সূত্রটি জানায়, বাংলাদেশ পুলিশ ১৯৮৯ সাল থেকে জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশনে কাজ করছে। ৩৭ বছরে পুলিশের ২১ হাজার ৮১৬ জন সদস্য শান্তিরক্ষী হিসেবে দক্ষতা ও সুনামের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছেন। কোনো নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে শান্তিরক্ষা মিশনে কর্মরত পুলিশের সংখ্যা কখনোই ২৩০–এর নিচে নামেনি। এমনকি ২০১৩ ও ২০১৬ সালে সারা বিশ্ব থেকে শান্তিরক্ষী হিসেবে দায়িত্ব পালন করা পুলিশ সদস্যদের মধ্যে বাংলাদেশ পুলিশের অংশগ্রহণ সবচেয়ে বেশি ছিল।

শান্তিরক্ষায় প্রাণ হারিয়েছেন ২৪ জন

পুলিশ সদর দপ্তর জানিয়েছে, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে শান্তিরক্ষার কাজে গিয়ে বাংলাদেশ পুলিশের ২৪ জন সদস্য জীবন দিয়েছেন। আহত হয়েছেন ১৫ জন।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

কাউন্সেলর পদ কেন গুরুত্বপূর্ণ?

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে জানা গেছে, শান্তিরক্ষা মিশনে পুলিশের অংশগ্রহণ বাড়াতে ২০১৯ সালে জাতিসংঘে বাংলাদেশ স্থায়ী মিশনে একটি ‘কাউন্সেলর’ পদ তৈরি করা হয়। পুলিশ সুপার বা তদূর্ধ্ব পদমর্যাদার একজন কর্মকর্তার প্রেষণে এ পদে নিয়োগ পাওয়ার কথা। কিন্তু সাত বছর পরও পদটি শূন্য পড়ে আছে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

শান্তিরক্ষা মিশনে কাজ করা পুলিশের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রথম আলোকে বলেন, মিশনের জন্য সবচেয়ে বেশি অনুদান দেয় যুক্তরাষ্ট্র, এরপর চীন। অনুদান কমে আসায় শান্তিরক্ষা মিশনের সংখ্যাও কমেছে। তবে বাংলাদেশ পুলিশের অংশগ্রহণ বেশি কমেছে ‘কাউন্সেলর’ নিয়োগ দিতে না পারা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বিভিন্ন সংস্থার ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার পরিপ্রেক্ষিতে।

বর্তমানে ৪ হাজার ১৪৮ জন বাংলাদেশি শান্তিরক্ষী

জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনের গত মার্চ মাসের হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে শান্তিরক্ষায় বাংলাদেশ থেকে কাজ করছেন ৪ হাজার ১৪৮ জন। সংখ্যার হিসাবে রোয়ান্ডা, নেপাল ও ভারতের পর বাংলাদেশের অবস্থান। বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীদের মধ্যে ৩ হাজার ৯৮৮ জনই সেনাসদস্য।

কাউন্সেলর নিয়োগের উদ্যোগ

জাতিসংঘের বাংলাদেশ স্থায়ী মিশনে পুলিশ ‘কাউন্সেলর’ নিয়োগ দিতে পুলিশ সদর দপ্তর থেকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠানো হয়েছে। কিন্তু এখনো নিয়োগ হয়নি।

এ এইচ এম শাহাদাত হোসাইন, সহকারী পুলিশ মহাপরিদর্শক

প্রতিবছর ২৯ মে আন্তর্জাতিক জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা দিবস পালিত হয়। দেশে এবার দিবসটি ঈদের ছুটির মধ্যে পড়ায় আজ ১০ জুন দিবসটি উপলক্ষে নানা কর্মসূচি পালিত হবে। দিবস উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বাণীও দিয়েছেন।

বেতন-ভাতা কত?

জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশনে পুলিশ সদস্যরা ফর্মড পুলিশ ইউনিট (এফপিইউ), ইনডিভিজ্যুয়াল পুলিশ অফিসার (আইপিও) এবং প্রফেশনাল পুলিশ অফিসার (পিপিও) হিসেবে কাজ করেন। শান্তিরক্ষা মিশনে অংশ নিয়ে একজন পুলিশ সদস্য মাসে ২ হাজার থেকে ৭ হাজার ডলার বেতন পান। গাড়ি, অস্ত্র ও বিভিন্ন সরঞ্জাম ভাড়া বাবদ মোটা অঙ্কের টাকা আয় করে পুলিশ। মিশনে নিয়োজিত জনবল-সরঞ্জামের ভাতা বাবদ পুলিশ গত ২০২৩ সাল পর্যন্ত চার হাজার কোটি টাকার বেশি আয় করেছে বলে পুলিশ সদর দপ্তর সূত্রে জানা গেছে।

ক্ষতিপূরণের অর্থ

পুলিশ কর্মকর্তারা জানান, শান্তিরক্ষা মিশনে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে অনেকেই আহত বা নিহত হন। নিহত হলে পরিবারের সদস্যদের ৬০–৭০ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়। আহত হলেও ক্ষতিপূরণের অর্থ পাওয়া যায়।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে পুলিশের একজন কর্মকর্তা জানান, সম্প্রতি একটি শান্তিরক্ষা মিশনের জন্য জাতিসংঘের পক্ষ থেকে বাংলাদেশ পুলিশের কার্যক্রম সম্পর্কে জানতে চাওয়া হয়েছিল। কিন্তু জাতিসংঘের সংশ্লিষ্টদের পুলিশের কার্যক্রম সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরতে না পারায় ওই মিশনে যেতে পারেননি বাংলাদেশ পুলিশের সদস্যরা।

হাইতি মিশনে প্রস্তুতি

পুলিশ সদর দপ্তর থেকে জানা গেছে, হাইতিতে শান্তিরক্ষা মিশনে যোগ দিতে পুলিশের একটি কন্টিনজেন্ট পাঠানোর প্রস্তুতি চলছে। এ জন্য ৫২৫ জন পুলিশ সদস্যকে প্রস্তুত করা হয়েছে।

‘কাউন্সেলর’ না থাকার অসুবিধা

পুলিশ সদর দপ্তরের সূত্রটি বলছে, জাতিসংঘে বিভিন্ন দেশের স্থায়ী মিশনে সংশ্লিষ্ট দেশের পুলিশ কর্মকর্তারা সংস্থাটির ‘ডিপার্টমেন্ট অব পিচ অপারেশন’-এর সঙ্গে সমন্বয় করে পুলিশ কন্টিনজেন্ট মোতায়েনের কাজ করেন। কিন্তু দক্ষতা ও সুনাম থাকার পরও ‘কাউন্সেলর’ না থাকায় শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশ পুলিশের অংশগ্রহণ দিন দিন কমছে।

সূত্রটি জানায়, জাতিসংঘের স্থায়ী মিশনের প্রতিরক্ষা উইংয়ের ‘প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা’ বা ডিফেন্স অ্যাডভাইজার শান্তিরক্ষা মিশনে সশস্ত্র বাহিনীর কন্টিনজেন্টে সদস্য মোতায়েন ও অন্যান্য প্রশাসনিক কাজ করে থাকেন। তিনি বিভিন্ন শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশ প্রতিনিধিদলের সফরসহ নানা বিষয়ে জাতিসংঘ সদর দপ্তরের সঙ্গে সমন্বয় করেন। এসব দায়িত্বের পাশাপাশি তিনি পুলিশের জন্যও কাজ করে থাকেন।

শান্তিরক্ষা মিশনে আর্মড ফোর্সেস ও পুলিশের মনোনয়নপদ্ধতি, কাজের ধরন, দায়িত্ব পালন আলাদা হওয়ায় ‘ডিফেন্স অ্যাডভাইজার’-এর পক্ষে পুলিশের সব বিষয় অবগত থাকা সম্ভব হয় না। তাই শান্তিরক্ষা মিশনে পুলিশ মোতায়েনের ক্ষেত্রে নানা অসুবিধার সম্মুখীন হতে হচ্ছে।

পুলিশ সদর দপ্তরের সূত্রটি মনে করছে, বরাদ্দ কমায় সব দেশ থেকেই শান্তিরক্ষা মিশনে অংশগ্রহণ কমেছে। এরপরও বাংলাদেশ পুলিশের পক্ষ থেকে জাতিসংঘের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে লিয়াজোঁ করার মতো কেউ না থাকায় অংশ নেওয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ পুলিশ আরও বেশি পিছিয়ে পড়ছে।

‘কাউন্সেলর’ না থাকায় শান্তি মিশনে গিয়ে নিহত ও আহত পুলিশ সদস্যদের ক্ষতিপূরণের অর্থ পেতেও দেরি হয় বলে সূত্রটি জানায়।

এ বিষয়ে পুলিশ সদর দপ্তরের সহকারী পুলিশ মহাপরিদর্শক এ এইচ এম শাহাদাত হোসাইন প্রথম আলোকে বলেন, জাতিসংঘের বাংলাদেশ স্থায়ী মিশনে পুলিশ ‘কাউন্সেলর’ নিয়োগ দিতে পুলিশ সদর দপ্তর থেকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠানো হয়েছে। কিন্তু এখনো নিয়োগ হয়নি।

পুলিশের এই কর্মকর্তা আরও বলেন, ‘কাউন্সেলর’ নিয়োগ হলে জাতিসংঘের সঙ্গে বাংলাদেশ পুলিশের বিষয়গুলো লিয়াজোঁ করা সহজ হবে।