ইতালিতে শীতল বসন্তের রমজান: প্রবাসী বাংলাদেশিদের আধ্যাত্মিক যাত্রা
ইতালিতে পবিত্র রমজান মাস এবার ১৮ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হয়েছে, যা স্থানীয় মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে কিছুটা বিতর্ক সৃষ্টি করেছিল। ইতালীয় ইসলামিক কালচারাল সেন্টার এবং হিলাল কমিটির মধ্যে রোজা শুরুর তারিখ নিয়ে মতপার্থক্য দেখা দিলেও, শেষ পর্যন্ত সৌদি আরবের সাথে মিল রেখেই রোজা পালন শুরু হয়। ইতালিতে কেন্দ্রীয় চাঁদ দেখা কমিটির অভাবের কারণে প্রতি বছরই এমন সাময়িক বিভ্রান্তি তৈরি হয়, তবে এবারও দ্বিতীয় দিন থেকেই সবকিছু স্বাভাবিক হয়ে যায়।
প্রবাসে 'এক টুকরো বাংলাদেশ' এর আবহ
ইতালিতে বর্তমানে প্রায় দুই লাখেরও বেশি বাংলাদেশি বসবাস করছেন, যাদের মধ্যে রোমে বাংলাদেশিদের আধিক্য সবচেয়ে বেশি। রোজার আগেই গ্রোসারি ও সুপারশপগুলোতে কেনাকাটার ধুম পড়ে যায়, যা প্রবাসের বুকে অঘোষিত এক টুকরো বাংলাদেশ এর জীবন্ত চিত্র ফুটিয়ে তোলে। কর্মব্যস্ততার মাঝেও এখানে রোজার আমেজ চোখে পড়ার মতো, বিশেষ করে বাংলাদেশি রেস্টুরেন্টগুলোতে দেশি ইফতারির সমারোহ দেখা যায়।
দুই দশকের রেকর্ড ভাঙা শীতল রোজা
এবারের রমজান ইতালিতে প্রায় ১৯-২০ বছরের রেকর্ড ভেঙেছে, কারণ রোজা পর্যায়ক্রমে শীত ও বসন্তের দিকে চলে এসেছে। গত কয়েক বছর (২০১০-২০১৮) প্রবাসীদেরকে প্রখর গ্রীষ্মে ১৬ থেকে ১৮ ঘণ্টা রোজা রাখতে হতো, কিন্তু এবার দিনের দৈর্ঘ্য কমে দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৩ ঘণ্টায়। এই শীতল আবহাওয়া ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের জন্য বয়ে এনেছে বিশেষ প্রশান্তি, যা প্রায় দুই দশক পর ফেব্রুয়ারি-মার্চে রোজা ফিরে আসার সুফল।
কর্মব্যস্ততা ও ইফতারের সম্মিলিত আনন্দ
ইতালিতে প্রবাসী বাংলাদেশিদের কাজের সূচি বৈচিত্র্যময়:
- রেস্টুরেন্ট সেক্টরে কাজ করা ব্যক্তিদের জন্য রোজা রাখা কিছুটা সহজ
- ডাবল শিফটে কাজ করা বা ভ্রাম্যমাণ দোকান (বাংকার) চালানো শ্রমজীবীদের জন্য এটি বেশ কষ্টসাধ্য
- সেহরি খেয়ে ভোরে কাজে বের হওয়া এবং কাজ শেষে ফেরার পথেই ইফতারের সময় হয়ে যাওয়া—এমন সংগ্রাম অনেকের নিত্যদিনের সঙ্গী
তবে কষ্টের মাঝেও আনন্দের কমতি নেই। ইতালির প্রতিটি মসজিদে মসজিদ কমিটির উদ্যোগে ৪০০ থেকে ৫০০ মানুষের ইফতারের আয়োজন করা হয়, যেখানে বিভিন্ন দেশের মুসলিমদের সাথে একই কাতারে বসে ইফতার করা প্রবাসীদের জন্য এক অনন্য অভিজ্ঞতা। বাংলাদেশি রেস্টুরেন্টগুলো পরিবার ছাড়া থাকা প্রবাসীদের জন্য ভরসা হয়ে দাঁড়িয়েছে, সেখানে পেঁয়াজু, আলুর চপ, বেগুনিসহ সব দেশি ইফতারি পাওয়া যায়।
খোলা মাঠে ইফতার ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি
এ বছর রোমে ইল ধূমকেতু অ্যাসোসিয়েশন খোলা মাঠে এক বিশাল ইফতার মাহফিলের আয়োজন করে, যেখানে বিভিন্ন জেলাভিত্তিক সংগঠনের সহযোগিতায় কয়েকশ প্রবাসীর সরব উপস্থিতি ছিল। বিশেষ করে ৮ মার্চ বিশ্ব নারী দিবস হওয়ায় ইফতারে নারীদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো।
আয়োজক নুরে আলম সিদ্দিকী বাচ্চু জানান, তারা কেবল মুসলিম নয়, স্থানীয় গির্জার ফাদার, মন্দিরের পুরোহিত এবং বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদেরও এই আয়োজনে আমন্ত্রণ জানান। এর মূল উদ্দেশ্য হলো ইতালীয় প্রশাসনের কাছে ধর্মীয় সংস্কৃতি ও সাম্প্রদায়িক সহাবস্থানের চিত্রটি তুলে ধরা। খোলা মাঠে একসাথে এত মানুষের ইফতার করার দৃশ্য স্থানীয় ইতালীয়দের মাঝেও বেশ কৌতূহল ও প্রশংসার জন্ম দিয়েছে।
ইতালীয়দের মাঝে ইসলামের প্রতি ক্রমবর্ধমান আগ্রহ
ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতায় দেখা যায়, অনেক ইতালীয় সহকর্মী রোজা শুরুর অনেক আগে থেকেই জানতে চান—কবে থেকে রোজা শুরু হচ্ছে। তারা বাংলাদেশি সংস্কৃতি ও ঈদ সম্পর্কেও বেশ অবগত, যা প্রবাসীদের জন্য অত্যন্ত গর্বের ও আনন্দের বিষয়। এই শ্রদ্ধা এবং আগ্রহ ইতালীয় সমাজে ইসলামের প্রতি ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গিরই প্রতিফলন।
রহমতের ১০ দিন এবং মাগফেরাতের ৯ দিন পার হয়ে ইতালিতে ইতিমধ্যে ১৯তম রোজা শেষ হয়েছে (৮ মার্চ)। চোখের পলকেই বাকি দিনগুলো কেটে যাবে বলে প্রবাসীরা আশা করছেন। নাজাতের দিনগুলো শেষে ঈদের চাঁদ উঠলে বিশ্ব মুসলিমের সাথে ইতালির প্রবাসীরাও মেতে উঠবেন প্রাণের উৎসবে, যা তাদের আধ্যাত্মিক যাত্রার একটি স্মরণীয় অধ্যায় হয়ে থাকবে।
