অস্ট্রেলিয়ার সিডনিতে বর্ণাঢ্য ‘একুশে মেলা ২০২৬’ উদ্‌যাপন, ভাষাপ্রীতি ও সংস্কৃতির মশাল প্রজ্বলিত
সিডনিতে একুশে মেলা ২০২৬, ভাষাপ্রীতি ও সংস্কৃতির উৎসব

অস্ট্রেলিয়ার সিডনিতে বর্ণাঢ্য ‘একুশে মেলা ২০২৬’ উদ্‌যাপন

অস্ট্রেলিয়ার সিডনিতে একুশের অবিনাশী চেতনাকে ধারণ করে গত শনিবার, ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে, ক্যাম্পবেলটাউন সংলগ্ন ইংগেলবার্নের হালিনান পার্ক প্রাঙ্গণে আয়োজিত হলো বর্ণাঢ্য ‘একুশে মেলা ২০২৬’। সাবকন্টিনেন্ট ফ্রেন্ডস অফ ক্যাম্পবেলটাউনের উদ্যোগে দিনব্যাপী এই আনন্দঘন আয়োজন সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে, যেখানে প্রবাসী বাঙালির পদচারণায় মেলা প্রাঙ্গণ মূর্ত হয়ে উঠেছিল।

প্রভাতফেরি ও শুভ উদ্বোধন

দিনের কার্যক্রম শুরু হয় বীর মুক্তিযোদ্ধা মিজানুর রহমান তরুণের নেতৃত্বে একটি ভাবগম্ভীর প্রভাতফেরির মাধ্যমে। এরপর মেলার আনুষ্ঠানিক শুভ উদ্বোধন ঘোষণা করেন স্থানীয় কাউন্সিলর মাসুদ চৌধুরী, যা অনুষ্ঠানের মর্যাদা বৃদ্ধি করে।

আলোচনা সভা ও সম্মাননা প্রদান

মেলার বিশেষ আকর্ষণ ছিল লেখকদের নিয়ে আলোচনা সভা, যা অধ্যাপক মোহাম্মদ আলীর প্রাণবন্ত সঞ্চালনায় এক সমৃদ্ধ সাহিত্য আড্ডায় রূপ নেয়। এতে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলের কবি ও কথাসাহিত্যিকেরা অংশগ্রহণ করেন। এবারের মেলার অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল নবপ্রবর্তিত ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস সম্মাননা’। নেপালি, তামিল, উর্দু ও বাংলা ভাষা রক্ষায় বিশেষ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বইঘর ও বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বদের হাতে ক্রেস্ট ও সনদ তুলে দেন স্থানীয় মেয়র ডার্সি লাউন্ড। অনুষ্ঠানে ফেডারেল ও স্থানীয় এমপি এবং রাজনৈতিক নেতারা উপস্থিত থেকে মেলার মহিমা বৃদ্ধি করেন।

প্রবাসী বাঙালিদের আবেগ ও প্রতিক্রিয়া

মেলায় আসা প্রশান্তিকা বইঘরের কর্নধার আতিকুর রহমান শুভ আবেগাপ্লুত হয়ে বলেন, ‘বিদেশের কর্মব্যস্ত জীবনের মধ্যে হালিনান পার্কের এই উৎসব আমাদের শিকড়ের কথা মনে করিয়ে দেয়। আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম যাতে বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির ঐতিহ্যকে হৃদয়ে ধারণ করতে পারে, সে জন্য এমন আয়োজনের বিকল্প নেই।’ লরেন্স ব্যারেলের সম্পাদনায় প্রকাশিত হয় বিশেষ শৈল্পিক সাময়িকী ‘ধারা’, আর দুপুর থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত একটানা চলা মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে অসংখ্য মানুষের সমাগম ঘটে।

সংগঠকের দৃষ্টিভঙ্গি ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা

মেলার প্রধান সংগঠক কায়সার আহমেদ অত্যন্ত আবেগঘন ও জোরালো কণ্ঠে বলেন, ‘এই মেলা কেবল একটি বাৎসরিক আয়োজন নয়, বরং প্রবাসের মাটিতে আমাদের আত্মপরিচয়, ইতিহাস ও জাতীয় মর্যাদার এক বলিষ্ঠ ঘোষণা। আমরা চাই আমাদের নতুন প্রজন্ম যেন এই শিকড়কে হৃদয়ে ধারণ করে বেড়ে ওঠে। আজ যেভাবে বিভিন্ন ভাষার মানুষ এখানে একত্র হয়েছে, তা প্রমাণ করে যে একুশের চেতনা বিশ্বজনীন ও সর্বজনীন। আমাদের এই সংগ্রাম ও সংস্কৃতির মশাল প্রবাসে চিরকাল প্রজ্বলিত থাকবে। আমরা অঙ্গীকার করছি, বাঙালির এই বীরত্বগাথা ও ভাষাপ্রীতি আমরা বিশ্বের দরবারে আরও উঁচিয়ে ধরব। আমাদের এই আয়োজন প্রবাসে বেড়ে ওঠা প্রজন্মের কাছে বাংলা ভাষার উত্তরাধিকার পৌঁছে দেওয়ার একটি দায়বদ্ধতা। আগামী বছর পবিত্র রমজান মাসের কারণে আমরা এক সপ্তাহ এগিয়ে ৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৭ সালে পরবর্তী মেলার আয়োজন করব। আপনাদের এই স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণই আমাদের আগামীর পথচলার মূল চালিকা শক্তি।’

এই মেলা প্রবাসী বাঙালিদের মধ্যে ভাষা ও সংস্কৃতির বন্ধনকে আরও সুদৃঢ় করেছে, এবং একুশের চেতনাকে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দেওয়ার একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।