পর্তুগালে চাটগাঁইয়া বৈশাখী উৎসব: প্রবাসে মিলনমেলায় দেশের ঘ্রাণ
পর্তুগালে চাটগাঁইয়া বৈশাখী উৎসব, প্রবাসে মিলনমেলা

পর্তুগালে চাটগাঁইয়া বৈশাখী উৎসব: প্রবাসে মিলনমেলায় দেশের ঘ্রাণ

পর্তুগালের আকাশে বসন্তের নরম রোদ আর আটলান্টিক মহাসাগরের লোনা বাতাসে হঠাৎই মিশে গেল এক অন্যরকম ঘ্রাণ। পান্তার টক, মাছ ভাজা আর নানান ভর্তার সেই চেনা গন্ধে যেন মাতোয়ারা হয়ে উঠল পর্তুগালের পরিবেশ। দূর থেকে ভেসে আসা চাটগাঁইয়া টান আর বৈশাখী সুরে মনে হচ্ছিল, এ যেন লালদীঘির ময়দানে বসন্তের আমেজ। কিন্তু না, এটি চট্টগ্রাম নয়, বরং ইউরোপের এক প্রান্তে, সমুদ্রের ধারে গড়ে ওঠা প্রবাসী বাংলাদেশিদের ছোট্ট দুনিয়া। রোববার (১৯ এপ্রিল) চট্টগ্রাম অ্যাসোসিয়েশনের আয়োজনে পর্তুগালে অনুষ্ঠিত হলো বৈশাখী উৎসব ও চাটগাঁইয়া মিলনমেলা, যা প্রবাসী জীবনে এনে দিল এক টুকরো দেশের আবহ।

সকাল থেকেই শুরু হয় উৎসবের আমেজ

সকাল থেকেই লাল-সাদা পোশাকে সেজে মানুষরা আসতে শুরু করেন অনুষ্ঠানস্থলে। ছোট্ট শিশু কোলে মা, হাত ধরে হাঁটা বাবা, আর দল বেঁধে আসা তরুণ-তরুণীদের চোখে ছিল একটাই আকুলতা: একটু দেশের মতো করে নতুন বছরটা শুরু হোক। অনুষ্ঠানস্থলে পা রাখতেই চোখে পড়ে রঙিন সাজসজ্জা আর উৎসবের প্রাণবন্ত পরিবেশ। মঞ্চে তখন চলছিল বৈশাখী গানের মূর্ছনা, কেউ গাইছেন, কেউ নাচছেন, আর বাচ্চাদের দুরন্তপনায় মুখরিত ছিল পুরো এলাকা। আঞ্চলিক পরিবেশনায় উঠে আসছিল চট্টগ্রামের সেই চিরচেনা সুর, যা শুনলে বুকের ভেতর কোথায় যেন একটু কেঁপে উঠত, মনে করিয়ে দিত দূরের দেশের কথা।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

খাবারের আয়োজন: প্রবাসের ক্লান্তি মুছে দিল

উৎসবের আরেক প্রাণ ছিল দেশীয় খাবারের সমৃদ্ধ আয়োজন। পান্তা, মাছ ভাজা, নানান ভর্তা আর মিষ্টান্নের সমাহার যেন প্রবাসের ক্লান্তি এক নিমেষে মুছে দিল। প্লেট হাতে মানুষের মুখে ফুটে উঠেছিল হাসি, পাশাপাশি বসে খাওয়া, পুরনো বন্ধুর সঙ্গে হঠাৎ দেখা—এই ছবিগুলো মিলিয়ে তৈরি হয়েছিল এক অন্যরকম বৈশাখের আবহ। চট্টগ্রাম অ্যাসোসিয়েশনের মোহাম্মদ ইকবাল চৌধুরী বলেন, “এক জায়গায় এতগুলো চাটগাঁইয়া মানুষ—একজন আরেকজনের মুখের দিকে চেয়ে হাসে, কথা বলে। কেউ চেনা, কেউ অচেনা, কিন্তু সেই টান এক। বেক্কলে দেই আর হরান জুড়াইয়া যায়। এইটাই তো আমাগো শক্তি। চট্টগ্রাম অ্যাসোসিয়েশনরে ধন্যবাদ। এই মানুষগুলো না থাকলে প্রবাসে বৈশাখ মানে শুধু ক্যালেন্ডারের একটা তারিখ হতো। তারা সেই তারিখটাকে বানিয়েছে একটা উৎসব, একটা মিলনমেলা, একটা ঘরে ফেরার অনুভূতি।”

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

শিশুদের জন্য আলাদা আনন্দের ব্যবস্থা

শিশুদের জন্যও ছিল আলাদা আনন্দের ব্যবস্থা। খেলাধুলা, বিনোদন, গ্রুপ ফটো সেশন আর র‍্যাফেল ড্র—দিনশেষে পুরস্কার হাতে ছোটদের চোখে যে চকচকে আলো দেখা গিয়েছিল, সেটাই হয়তো সবচেয়ে বড় পাওনা ছিল আয়োজকদের জন্য। এই আয়োজনে এসে মুগ্ধ হলেন বাংলাদেশ দূতাবাসের দূতালয় প্রধান এস এম গোলাম সরওয়ার। তিনি বললেন, “বাংলাদেশি সংস্কৃতির সব উদ্যোগে দূতাবাস পাশে থাকবে। নিজেদের এই সংস্কৃতি ছড়িয়ে দিতে হবে নতুন প্রজন্মের মাঝে।”

প্রবাসে একাকিত্ব দূর করার প্রয়াস

চট্টগ্রাম অ্যাসোসিয়েশনের জাহিদ কায়সার বলেন, “প্রবাসে সবচেয়ে কষ্টের একা থাকা। উৎসবের দিনেও একলা লাগে। কিন্তু আজ যখন বউ-বাচ্চা নিয়ে এই মেলায় এলাম, চারদিকে চাটগাঁইয়া মুখ দেখলাম, ছেলেমেয়েদের হাসি দেখলাম—মনে হলো, না, আমরা একলা নই।” অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ কমিউনিটি লিডার রানা তসলিম উদ্দিন, চট্টগ্রাম অ্যাসোসিয়েশনের মো. আলাউদ্দিন, আশরাফুল আলম, মোজাম্মেল হোসেন, নাসিরুল আলম সাইমন, মোহাম্মদ শাহিন, আবুল কাশেম, আব্দুল্লাহ আল জিহাদ, মো. রিদওয়ান, মো. মাসুদ, ইমদাদুল হক রিফাত, হেলাল উদ্দিন, মোহাম্মদ কাইয়ুম উদ্দিন, কামরুল পাশা, শ্রী প্রমাল নাথ, পর্তুগাল বাংলাদেশ প্রেসক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা ও সাবেক সভাপতি রনি মোহাম্মদ, সভাপতি রাসেল আহমেদ এবং গ্লোবাল জালালাবাদ অ্যাসোসিয়েশন ও মোরারিয়া বিজনেস ফোরামের সাধারণ সম্পাদক মাছুম আহমদ, কাজা দো বাংলাদেশের সভাপতি রনি হোসাইন ও ইকবাল হোসেন কাঞ্চন, মোহাম্মদ শাহীন প্রমুখ।

এই বৈশাখী উৎসব শুধু একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান নয়, বরং প্রবাসী বাংলাদেশিদের মধ্যে ঐক্য ও সম্প্রীতির এক জীবন্ত উদাহরণ হয়ে উঠল। পর্তুগালের মাটিতে চাটগাঁইয়া সংস্কৃতির এই প্রদর্শনী নতুন প্রজন্মকে তাদের শিকড়ের সঙ্গে যুক্ত রাখতে সাহায্য করবে বলে আশা করা হচ্ছে।