মহাকাশ নিয়ে পাঁচটি ভুল ধারণা: নাসার বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা
মহাকাশ নিয়ে পাঁচটি ভুল ধারণা: নাসার ব্যাখ্যা

মহাকাশ জয় কিংবা অন্য গ্রহে বসতি স্থাপনের চেয়ে মানুষ এখনো অনেক দূরে রয়েছে। তবে পৃথিবীর সীমানার বাইরে কী রহস্য লুকিয়ে আছে, তা জানার কৌতূহল কিন্তু থেমে নেই। ১৯৬৯ সালে চাঁদের বুকে মানুষের প্রথম পা রাখার পর থেকে প্রযুক্তির অনেক উন্নতি ঘটেছে। যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসা প্রতিনিয়ত নতুন নতুন আবিষ্কারের মাধ্যমে মহাকাশ নিয়ে মানুষের মনে জমে থাকা প্রাচীন সব ভুল ধারণা ও গুজব দূর করতে কাজ করছে। হলিউডের সিনেমা ও কল্পবিজ্ঞানের গল্পগুলো আমাদের মনে মহাকাশ সম্পর্কে এমন কিছু অদ্ভুত ধারণার জন্ম দিয়েছে, যা সম্পূর্ণ কাল্পনিক। নাসা বৈজ্ঞানিক তথ্য-উপাত্ত দিয়ে প্রমাণ করেছে যে বাস্তব মহাকাশ আমাদের ভাবনার চেয়ে অনেক আলাদা। মহাকাশ নিয়ে এমন পাঁচটি অদ্ভুত ভুল ধারণা নিচে আলোচনা করা হলো।

১. সূর্য আসলে জ্বলন্ত আগুনের গোলক

সূর্য প্রচণ্ড গরম, এটি প্রমাণিত সত্য। কিন্তু কেন এই উত্তাপ? ১৯৬০–এর দশকের একটি জনপ্রিয় গানে সূর্যকে আকাশের আগুনের গোলক বলা হয়েছিল। সাধারণ মানুষের মধ্যেও এই ধারণাই প্রচলিত। তবে নাসা প্রমাণ করেছে, সূর্য মোটেও কোনো আগুনের গোলক নয়। সূর্যের উপরিভাগ বা ফটোস্ফিয়ার থেকে আগুনের মতো শিখা বের হতে দেখা যায়। কিন্তু বাস্তবে সূর্য হলো পারমাণবিক ফিউশন প্রক্রিয়ায় চলা একটি বিশাল গ্যাসীয় পিণ্ড। সূর্যের তাপ কোনো সাধারণ আগুন বা শিখা থেকে আসে না, বরং এটি আসে বিকিরণ বা রেডিয়েশন থেকে। নাসার ইন্টারফেস রিজিয়ন ইমেজিং স্পেক্ট্রোগ্রাফ প্রজেক্ট সূর্যের বায়ুমণ্ডলের বিভিন্ন অংশের তাপমাত্রা পরিমাপ করে এই তথ্য নিশ্চিত করেছে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

২. মহাকাশ থেকে খালি চোখে চীনের মহাপ্রাচীর দেখা যায়

কয়েক শ বছর ধরে একটি কিংবদন্তি প্রচলিত আছে, মহাকাশ থেকে মানুষের তৈরি চীনের মহাপ্রাচীর দেখা যায়। চীনের মানুষও এই গল্প বেশ পছন্দ করে। তবে মানুষ যখন সত্যি সত্যি মহাকাশে যাওয়ার প্রযুক্তি অর্জন করল, তখন এই ধারণা ভুল প্রমাণিত হলো। নাসার অ্যাপোলো ১২ মিশনের পাইলট অ্যালান বিন মহাকাশ থেকে অনেক খুঁজেও মানুষের তৈরি কোনো স্থাপনা দেখতে পাননি। তিনি জানিয়েছিলেন, এই দূরত্ব থেকে মানুষের তৈরি কোনো বস্তু দৃশ্যমান নয়। আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশন থেকে নাসার কমান্ডার লেরয় চাও একটি ছবি তুলেছিলেন, যা মহাপ্রাচীরের ছবি বলে দাবি করা হয়। কিন্তু সেটি কোনো নিশ্চিত প্রমাণ ছিল না। মহাকাশ থেকে মহাপ্রাচীরের স্পষ্ট ছবি তুলতে অত্যন্ত শক্তিশালী ক্যামেরার প্রয়োজন হয়। মহাকাশ স্টেশন পৃথিবী থেকে চাঁদের তুলনায় অনেক কাছে হওয়ার পরও সেখান থেকে খালি চোখে এই প্রাচীর দেখা অসম্ভব।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

৩. অ্যাস্টেরয়েড বেল্ট বিপজ্জনক বাধা

কল্পবিজ্ঞানের সিনেমা স্টার ওয়ার্সের একটি বিখ্যাত দৃশ্যে দেখা যায়, একটি স্পেসশিপ গ্রহাণুপুঞ্জ বা অ্যাস্টেরয়েড বেল্টের ভেতর দিয়ে বিপজ্জনকভাবে পাথর এড়িয়ে উড়ে যাচ্ছে। চারপাশে বড় বড় মহাজাগতিক পাথর একে অপরের সঙ্গে ধাক্কা খাচ্ছে। এই দৃশ্য দেখে মনে হতে পারে, মহাকাশে গ্রহাণুর দল বুঝি গাদাগাদি করে থাকে। বাস্তবতা হলো এই গ্রহাণুগুলো একে অপরের থেকে অনেক দূরে অবস্থান করে। অন্তত এক কিলোমিটার আকারের গ্রহাণুগুলোর মধ্যে লাখ লাখ মাইল দূরত্ব থাকে। মঙ্গল ও বৃহস্পতি গ্রহের মাঝখানে যেখানে প্রধান অ্যাস্টেরয়েড বেল্ট রয়েছে, সেখান দিয়ে কোনো মহাকাশযান গেলে কোনো পাথরের সঙ্গে ধাক্কা লাগার আশঙ্কা নেই বললেই চলে। উদাহরণস্বরূপ, নাসা ২০০৩ সালে পাইওনিয়ার ১০ নামের একটি মহাকাশযান পাঠিয়েছিল। এই যানে কোনো বর্ম বা অস্ত্র ছিল না, এমনকি পথ পরিবর্তনের জন্য কোনো থ্রাস্টারও ছিল না। তবু এটি কোনো রকম বিপদ ছাড়াই গ্রহাণু বেল্ট পার হয়ে গিয়েছিল।

৪. স্পেসস্যুট ছাড়া মহাকাশে মানুষ সঙ্গে সঙ্গে জমে মারা যায়

হলিউডের ‘মিশন টু মার্স’ কিংবা ‘গার্ডিয়ানস অব দ্য গ্যালাক্সি’ সিনেমায় দেখানো হয়, কোনো মানুষ স্পেসস্যুট ছাড়া মহাকাশের শূন্যতায় উন্মুক্ত হলে মুহূর্তের মধ্যে জমে বরফ হয়ে যায় বা মারা যায়। কিন্তু নাসা প্রমাণ করেছে, এ ধারণা পুরোপুরি সঠিক নয়। মহাকাশের শূন্যতায় কোনো পরমাণু থাকে না। তাই শরীরের তাপ শুষে নেওয়ার মতো কোনো মাধ্যম সেখানে নেই। সুমেরু মহাসাগরের বরফশীতল পানিতে কোনো মানুষ যতটা দ্রুত শরীরের তাপ হারাবে, মহাকাশের শূন্যতায় তার চেয়ে অনেক বেশি সময় ধরে শরীরের তাপমাত্রা বজায় থাকবে। অবশ্য মহাকাশে অক্সিজেন না থাকা এবং অত্যন্ত কম বায়ুচাপ শরীরের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। ১৯৬৬ সালে নাসার টেকনিশিয়ান জিম লেব্লাঙ্ক একটি ভ্যাকুয়াম চেম্বারে স্পেসস্যুট পরীক্ষা করার সময় দুর্ঘটনার শিকার হন এবং তাঁর স্যুট থেকে বাতাস বেরিয়ে যায়। কক্ষটির বায়ুচাপ স্বাভাবিক করতে ৮৭ সেকেন্ড সময় লেগেছিল। এই দীর্ঘ সময় বায়ুশূন্য স্থানে থাকার পরও জিম লেব্লাঙ্ক সামান্য কানের ব্যথা ছাড়া বড় কোনো আঘাত পাননি। তীব্র চাপের পরিবর্তন বিপজ্জনক হলেও এটি তাৎক্ষণিক মৃত্যুর কারণ নয়।

৫. মহাকাশ পানিহীন শুষ্ক জায়গা

মহাকাশ মূলত একটি বিশাল শূন্যস্থান। তবে এই শূন্যস্থান কিন্তু পানিহীন নয়। তবে অনেকেই মনে করেন পৃথিবীর বাইরে তরল বা পানির কোনো অস্তিত্ব নেই। মহাকাশে প্রচুর পরিমাণে পানি রয়েছে। এটি কেবল ধূমকেতুর বরফ বা শনির বলয়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। ২০১১ সালে নাসার জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা একটি কোয়াসার ব্ল্যাকহোলের সন্ধান পান, যা বিশাল জলীয় বাষ্পের মেঘ দ্বারা পরিবেষ্টিত। এই পানির পরিমাণ এতটাই বিশাল তা দিয়ে পৃথিবীর সব মহাসাগরকে কয়েক ট্রিলিয়ন বার পূর্ণ করা সম্ভব। এই বিপুল পরিমাণ জলীয় বাষ্প সেখানে কীভাবে এল, তা এখনো বিজ্ঞানীদের কাছে এক বড় রহস্য। তবে এই ব্ল্যাকহোলটি পৃথিবী থেকে ১২ বিলিয়ন আলোকবর্ষ দূরে অবস্থিত।

সূত্র: নাসা সায়েন্স আর্কাইভ