যুগ যুগ ধরে রাতের আকাশের দিকে তাকিয়ে আমরা মুগ্ধ হয়েছি। রাতের গভীর অন্ধকারে অযুত তারার সঙ্গে স্নিগ্ধ আলো ছড়ানো চাঁদ আমাদের মনন ও কল্পনার এক বিশাল আকাশজুড়ে অবস্থান করছে। আধুনিক বিজ্ঞান ও মহাকাশ গবেষণার কল্যাণে আমাদের সামনে ক্রমেই এই চাঁদের প্রকৃত রহস্য উন্মোচিত হচ্ছে। কল্পনার ও রোমান্টিকতার আড়ালে চাঁদের যে এক কঠিন ও রুক্ষ সত্য লুকিয়ে আছে, তা বড়ই বিস্ময়কর!
চাঁদের আলো ও সৌন্দর্যের মোহ
আমরা জানি, চাঁদের নিজের কোনো আলো নেই। সূর্যের আলোতেই সে নিজে আলোকিত হয় এবং সেই ধার করা আলো পৃথিবীতে বিকিরণ করে, চাঁদ আমাদের রাতের অন্ধকার দূর করে। অথচ চাঁদের এই ধার করা আলোর সৌন্দর্যে যুগ যুগ ধরে মুগ্ধ হয়েছেন কবি-সাহিত্যিকেরা। প্রেমিক-প্রেমিকা এই স্নিগ্ধ মোহনীয় আলোয় খুঁজে পান নিজেদের প্রেমের উপমা ও পূর্ণতা।
কিন্তু বাস্তবে এই ‘চাঁদ মামার’ না আছে সেই কল্পিত রূপ, না আছে মনোরম কোনো সৌন্দর্য! দূর থেকে যাকে রুপার থালার মতো মসৃণ আর উজ্জ্বল দেখায়, যাকে প্রেম-ভালোবাসার প্রতীক হিসেবে গণ্য করা হয়, তার আসল রূপটি বড়ই নীরস ও নির্মম। মহাশূন্য থেকে প্রবল গতিতে ধেয়ে আসা গ্রহাণু আর উল্কাপিণ্ড অনবরত চাঁদের বুকে আঘাত হানছে। পৃথিবীর মতো চাঁদের চারদিকে সুরক্ষাদায়ী বায়ুমণ্ডল নেই। ফলে কোনো বাধা ছাড়াই মহাজাগতিক কঠিন বস্তু সজোর আছড়ে পড়ছে তার মাটিতে। চাঁদের বুক তাই ক্ষতবিক্ষত, অগণিত গর্ত বা ‘ক্র্যাটারে’ ভরা। মহাজাগতিক দ্রুত ধাবমান বস্তুকণার আঘাতেই তার শরীর এমন জর্জরিত।
তাই কবি নজরুল গেয়েছেন, ‘চাঁদেরে কে চায়, জোছনা সবাই যাচে…!’ সত্যিই তো, মানুষ হিসেবে আমরা বস্তুত চাঁদের রুক্ষ অবয়বকে খুঁজি না। আমরা খুঁজি তার গা বেয়ে ঝরে পড়া সেই মায়াবী জ্যোৎস্নাকে! আবার যৌবনের কবি সুকান্ত পূর্ণিমার জ্বলজ্বলে চাঁদকে ‘ক্ষুধার রাজ্যে ঝলসানো রুটি’ হিসেবে দেখেছেন। বলা যায়, চাঁদের প্রকৃত রুক্ষতার চেয়ে, সূর্যের আলোয় উদ্ভাসিত রূপ ও তার সৃজনী প্রভাবই আমাদের কাছে বড় হয়ে ওঠে। চাঁদের কমনীয় জ্যোৎস্না আমাদের নয়ন-মন জুড়ায়! অমৃত সুধারূপে আমাদের অন্তরকে বিমোহিত করে। কবিকে কাব্যরসে উন্মাতাল করে। শিল্পীকে করে উদ্বেলিত!
চাঁদের রুক্ষতা ও পৃথিবীর জন্য আশীর্বাদ
তবু এই ক্ষতবিক্ষত উপগ্রহটিই পৃথিবীর সবচেয়ে বড় আশীর্বাদ। তার নিজস্ব আলো না থাকলেও মহাকাশে পৃথিবীর সবচেয়ে কাছে প্রতিবেশী হিসেবে তার এই নীরব অবস্থান পৃথিবীকে দারুণভাবে উপকৃত করে। চাঁদের মহাকর্ষীয় টানের ফলেই পৃথিবীর সমুদ্রে ও নদীতে জোয়ার-ভাটার সৃষ্টি হয়। এই জোয়ার-ভাটা সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্রকে সচল রাখে এবং পৃথিবীর ঘূর্ণন গতিকে প্রভাবিত করে প্রকৃতির মধ্যে এক অপূর্ব স্থিতাবস্থা বজায় রাখে। এই চাঁদকে কেন্দ্র করেই ঈদ, পূজা-পার্বণ, উৎসবের আয়োজন হয়। আমরা আমাদের সত্তায় পূর্ণিমার ও অমাবস্যার জোয়ারের প্রতিক্রিয়া অনুভব করি। চন্দ্রগ্রহণের সময় গর্ভবতী মায়েরা বিশেষ সাবধানতা অবলম্বন করেন এবং এই চাঁদকে উপলক্ষ করেই মানুষের আচরিত সংস্কৃতিতে নানান প্রচলিত আচার-উপচারের আয়োজন হয়ে থাকে।
দূর পরবাসে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]
চাঁদ না থাকলে পৃথিবী কেমন হতো
তো এই রুক্ষ চাঁদ না থাকলে কী হতো আমাদের এই পৃথিবীর? বিজ্ঞানীরা বলেন, চাঁদ না থাকলে পৃথিবীর আহ্নিক গতি অনেক বেড়ে যেত, দিন-রাতের হিসাব বদলে যেত। আবহাওয়া হয়ে উঠত চরম ভাবাপন্ন এবং হয়তো পৃথিবীতে প্রাণের বিকাশই অন্য রকম হতো। চাঁদের বুকে যে অগণিত ক্ষত, তা যেন পৃথিবীরই স্থিতিশীলতা বজায় রাখার এক নীরব সাক্ষ্য।
তাই চাঁদ নিজে রুক্ষ হলেও পৃথিবীকে সে সাজিয়েছে প্রাণের স্পন্দনে। বাস্তবের চাঁদ যতই ক্ষতবিক্ষত আর বায়ুহীন হোক না কেন, পৃথিবীর আকাশে সে চিরকালই এক পরম নির্ভরতা এবং আমাদের কল্পনার অবিচ্ছেদ্য এক সুন্দরতম উপমা হয়েই থাকবে। চাঁদের এই রুক্ষতাই প্রমাণ করে, সৌন্দর্য কেবল বাহ্যিক রূপে নয়, বরং অন্যের জীবনে তার প্রভাব ও অবদানের মধ্যেই প্রকৃত সৌন্দর্য লুকিয়ে থাকে। আমরা জ্যোৎস্না চেয়ে যাই, আর চাঁদ নিজেকে ক্রমান্বয়ে প্রকাশ করে পূর্ণিমায় সৌন্দর্য ছড়িয়ে দিয়ে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য অমাবস্যায় নিজেকে আড়াল করে নেয়।
চাঁদ যে কেবল আমাদের রূপকথার সঙ্গী তা নয়, বরং সে এক নীরব প্রহরী হয়ে নিজের বুকে আঘাত সয়ে পৃথিবীকে সুরক্ষিত রেখেছে। তার এই রুক্ষতা পৃথিবীর জন্য এক আশীর্বাদ। চাঁদ নিজে বায়ুমণ্ডলহীন বলয়ে বন্ধুর পাথুরে ভূমিতে পূর্ণ হয়েও এক হিতৈষী প্রতিবেশী হয়ে আমাদের পৃথিবীকে, তার জীববৈচিত্র্যকে সচল রাখছে!
আর্টেমিস-২ মিশন: চাঁদে মানুষের নতুন রেকর্ড
অতিসম্প্রতি (চলতি বছরের ১ এপ্রিল, ২০২৬ সাল) আমেরিকার নাসা কর্তৃক আর্টেমিস-২ রকেটে চড়ে চারজন নভোচারী, কমান্ডার রিড ওয়াইজম্যান (নাসার অধীনে ২য় মহাকাশযাত্রা), পাইলট ভিক্টর গ্লোভার (নাসার অধীনে ২য় মহাকাশযাত্রা), মিশন স্পেশালিস্ট ক্রিস্টিনা কোচ (নাসার অধীনে ১ম নারী অভিযাত্রী, ২য় মহাকাশযাত্রা) এবং মিশন স্পেশালিস্ট জেরেমি হেনসেন (কানাডিয়ান স্পেস এজেন্সি, নাসার অধীনে ১ম মহাকাশযাত্রা)। ১ এপ্রিল ফ্লোরিডার কেনেডি মহাকাশকেন্দ্র থেকে আর্টেমিস-২ রকেট উৎক্ষেপণ করা হয়। ওরিয়ন চাঁদের দূরবর্তী পৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৪ হাজার ৪৭ মাইল (৬ হাজার ৫১৩ কিলোমিটার) দূরত্বে চাঁদের চারপাশে প্রদক্ষিণ করে। নাসার ভাষ্যমতে, পৃথিবী থেকে তারা প্রায় ৪ লাখ ছয় হাজার ৭৭১ কিলোমিটার বা ২ লাখ ৫২ হাজার ৭৫৬ মাইল দূরে অবস্থান করেছেন। এ পর্যন্ত মহাকাশে এত দূরে কোনো মানুষ যেতে পারেনি। পৃথিবীর বাইরে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে দূরবর্তী স্থানে মানুষের যাওয়ার নতুন রেকর্ড গড়লেন আর্টেমিস-২-এর নভোচারীরা। আমরা সচরাচর চাঁদের যে অংশ দেখে থাকি, এই অভিযানের অভিযাত্রীরা তার উল্টো দিকেও পরিভ্রমণ করে অভূতপূর্ব রেকর্ড গড়েছেন। চাঁদের নতুন এই রেকর্ড গড়ার সময় পৃথিবীর সঙ্গে যোগাযোগ-বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিলেন নভোচারীরা। প্রায় ৪০ মিনিট যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন থাকার পর আবার যোগাযোগ স্থাপিত হয়। বিষয়টি নভোচারীদের জন্য ছিল সবচেয়ে বেশি উত্তেজনার। তাঁরা চাঁদের কক্ষপথে পৌঁছে অতি কাছাকাছি দূরত্ব থেকে আরও নিখুঁতভাবে চাঁদের বিভিন্ন তথ্য, ছবি, ভিডিও সংগ্রহ করে পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন। এবারের ওরিয়ন নভোযানটি চার নভোচারী নিয়ে পৃথিবী থেকে চাঁদে যাওয়া ও আসার যাত্রায় মোট ৬ লাখ ৯৪ হাজার ৪৮১ মাইল পথ পাড়ি দিয়েছে।
অভিযানের সফল সমাপ্তি
পৃথিবীর বাইরে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে দূরবর্তী স্থানে মানুষের যাওয়ার নতুন রেকর্ড গড়া নাসার আর্টেমিস-২ মিশনের মহাকাশযান ওরিয়নে থাকা নভোচারীরা নিরাপদে পৃথিবীতে ফিরে এসেছেন। এই চারজন নভোচারী যাত্রার ১০ম দিনে ১১ এপ্রিল স্থানীয় সময় সন্ধ্যা ৬টা ৩৫ মিনিটে ক্যালিফোর্নিয়ার কাছাকাছি প্রশান্ত মহাসাগরে অবতরণ করে তাঁদের ঐতিহাসিক সফল চন্দ্রাভিযানের সমাপ্তি ঘোষণা করেন। পৃথিবীতে ফিরে এসে বিজয়ী চার নভোচারী স্বস্তির ও প্রশান্তির নিশ্বাস নিয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে অভিযাত্রীদের অধিনায়ক ওয়াইজম্যান বলেছিলেন, ‘আমরা এমন সব দৃশ্য দেখেছি, যা আগে কোনো মানুষ দেখেনি! এমনকি অ্যাপোলো অভিযানের সময়ও না! আমাদের জন্য তা ছিল সত্যি বিস্ময়কর!’
আর্টেমিস-২-এর নভোচারীদের সংগৃহীত ছবি ও তথ্য আগের সব ছবি ও তথ্যের চেয়ে আরও অনেক বেশি স্পষ্ট এবং নিখুঁত হয়েছে। তাঁরা বিগত ৫০ বছর পর চাঁদের কাছাকাছি গেছেন, চাঁদকে প্রদক্ষিণ ও নিবিড় পর্যবেক্ষণ করেছেন। আশা করা যায়, তাঁদের পর্যবেক্ষণ, সংগৃহীত তথ্য-উপাত্তকে নির্ভর করে অদূর ভবিষ্যতে চাঁদে আরও ব্যাপক অভিযান পরিচালিত হবে। এই চাঁদকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও অন্যান্য দেশের গবেষণার সফল রূপ, অদূর ভবিষ্যতে বিশ্ববাসী প্রত্যক্ষ করবে। আশা করা যায়, চাঁদের বুকে সঞ্চিত সম্পদরাশি মানুষের কল্যাণে ব্যবহৃত হবে। এই চাঁদকে, মঙ্গল গ্রহকে এবং আরও গ্রহ-নক্ষত্রকে কেন্দ্র করে বিশ্বের পরাশক্তিগুলো ক্ষমতার প্রতিযোগিতা নয়, বন্ধুসুলভ সহযোগিতার হাত প্রসারিত করবে এবং বিশ্ববাসীর মঙ্গলের জন্য, বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য হাতে হাত মিলিয়ে এগিয়ে আসবে সবাই। তখন এই পৃথিবীতে শান্তি প্রতিষ্ঠার নতুন দুয়ার উন্মোচিত হবে।



