টেলিস্কোপ দিয়ে সময় ভ্রমণ: জেমস ওয়েবের যুগান্তকারী আবিষ্কার
টেলিস্কোপ দিয়ে সময় ভ্রমণ: জেমস ওয়েবের আবিষ্কার

টাইম ট্রাভেল কি সত্যিই সম্ভব? জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপ প্রমাণ করেছে যে, আমরা চাইলেই অতীত দেখতে পারি। শুধু তাত্ত্বিকভাবে নয়, আক্ষরিক অর্থেই। কীভাবে? টেলিস্কোপের মাধ্যমে! এই যুগান্তকারী আবিষ্কার পদার্থবিজ্ঞান ও জ্যোতির্বিজ্ঞানে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে।

বিগ ব্যাং: মহাবিশ্বের সূচনা

বিগ ব্যাং বা মহাবিস্ফোরণ ঘটেছিল আজ থেকে প্রায় ১৩.৮ বিলিয়ন বছর আগে। জেমস ওয়েব টেলিস্কোপ ইতিমধ্যেই বিগ ব্যাংয়ের ৩০ থেকে ৪০ কোটি বছর পরের ছবি দেখাতে সক্ষম হয়েছে। বিগ ব্যাং শুধু একটি তত্ত্ব নয়; এটি মহাপ্রসারণের ঘটনা। ধারণা করা হয়, বিগ ব্যাংয়ের আগে স্থান ও সময়ের অস্তিত্ব ছিল না। পুরো মহাবিশ্ব একটি উত্তপ্ত ও ঘন শক্তির বিন্দুতে আবদ্ধ ছিল। বিগ ব্যাংয়ের পর সূক্ষ্ম কণা ও বলসমূহ পৃথক হতে শুরু করে।

বিগ ব্যাংয়ের পর মহাবিশ্ব সম্প্রসারণশীল অবস্থায় প্রবেশ করে। পদার্থবিজ্ঞানের চারটি মৌলিক বল—সবল নিউক্লিয় বল, দুর্বল নিউক্লিয় বল, মহাকর্ষ বল ও তড়িৎ-চৌম্বকীয় বল—তখন একত্রে একটি একীভূত বল হিসেবে ছিল। বিগ ব্যাংয়ের পরই এসব বল আলাদা হয়ে কাজ শুরু করে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, সেই সময়ে কোনো পদার্থের অস্তিত্ব ছিল না!

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

প্লাজমা থেকে প্রথম পরমাণু

বিগ ব্যাংয়ের ঠিক পরে মহাবিশ্ব এতটাই ঘন ও উত্তপ্ত ছিল যে, এটি পুরোপুরি প্লাজমা অবস্থায় ছিল। প্লাজমা হলো পদার্থের চতুর্থ অবস্থা, যেখানে ইলেকট্রনগুলো নিউক্লিয়াস থেকে মুক্ত হয়ে অবাধে ঘোরাফেরা করে। এই প্লাজমার কারণে ফোটন বা আলো আটকে ছিল এবং অবাধে চলাচল করতে পারেনি। প্রায় ৩ লাখ ৮০ হাজার বছর পর, রিকম্বিনেশন যুগে মহাবিশ্ব যথেষ্ট ঠান্ডা হলে ইলেকট্রন ও প্রোটন একত্রিত হয়ে প্রথম পরমাণু গঠন করে। এই সময় থেকেই আলো প্রথমবারের মতো অবাধে চলাচল শুরু করে। আজ আমরা সেই আলো কসমিক মাইক্রোওয়েভ ব্যাকগ্রাউন্ড (CMB) হিসেবে পর্যবেক্ষণ করি।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

তাপমাত্রা কমতে কমতে প্রায় ৩ হাজার কেলভিনে নেমে আসে। এরপর ইলেকট্রন ও প্রোটন মিলে গঠন করে মহাবিশ্বের প্রথম মৌল—হাইড্রোজেন। পরে গঠিত হয় হাইড্রোজেনের আইসোটোপ ও হিলিয়াম। হাইড্রোজেনের কোনো নিউট্রন না থাকলেও হিলিয়ামের নিউট্রন আছে। কোয়ার্ক নামে অতিপারমাণবিক কণাগুলো মিলে প্রোটন ও নিউট্রন তৈরি করেছিল। এরপর প্রোটন ও নিউট্রন ফিউশন প্রক্রিয়ায় মিলিত হয়ে ভারী পরমাণু তৈরি করে। এভাবেই ধাপে ধাপে বর্তমানে প্রাপ্ত সব মৌলের সৃষ্টি হয়েছে।

গ্যালাক্সির জন্ম ও বাংলাদেশি বিজ্ঞানীর সাফল্য

বিগ ব্যাংয়ের কয়েক শ কোটি বছর পর ধূলিকণা, গ্যাস এবং ডার্ক ম্যাটার একত্রিত হয়ে গ্যালাক্সির জন্ম দেয়। সম্প্রতি বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত মহাকাশবিজ্ঞানী লামিয়া আশরাফ মওলা জেমস ওয়েব টেলিস্কোপ দিয়ে গ্যালাক্সির সবচেয়ে গভীর ও স্পষ্ট ছবি তুলতে সক্ষম হয়েছেন। এটি আমাদের জন্য দারুণ সুখবর।

রেডশিফট: তরঙ্গের সম্প্রসারণ

বিগ ব্যাংয়ের পর যে তরঙ্গ সৃষ্টি হয়েছিল, তা ছিল অত্যন্ত তীব্র এবং এর তরঙ্গদৈর্ঘ্য ছিল খুবই কম। সময়ের সঙ্গে মহাবিশ্বের প্রসারণ ঘটতে থাকে এবং সেই সঙ্গে প্রসারিত হতে থাকে তরঙ্গের দৈর্ঘ্যও। এই ঘটনাকে বিজ্ঞানের ভাষায় বলে রেডশিফট। আলোর তীব্রতা যত বৃদ্ধি পায়, তরঙ্গদৈর্ঘ্য তত হ্রাস পায়। দৃশ্যমান আলোর মধ্যে সর্বোচ্চ তরঙ্গদৈর্ঘ্য হলো লাল আলোর এবং সর্বনিম্ন বেগুনি আলোর। ছোট থেকে বড় তরঙ্গদৈর্ঘ্যের দিকে যেতে থাকলে আলো লাল হতে থাকে, এটাই রেডশিফট।

কসমিক মাইক্রোওয়েভ ব্যাকগ্রাউন্ড (CMB)

বিগ ব্যাংয়ের সবচেয়ে প্রাচীন তরঙ্গ বা আলো হলো CMB। একে বিগ ব্যাংয়ের প্রাচীনতম ছাপ বলা হয়। এর বিকিরণ শুরু হয় বিগ ব্যাংয়ের প্রায় ৩ লাখ ৮০ হাজার বছর পর। CMB অত্যন্ত ক্ষীণ তাপীয় বিকিরণ, যার গড় তাপমাত্রা প্রায় ২.৭ কেলভিন। এটি কোনো পদার্থ নয়, বরং একধরনের তড়িৎ-চৌম্বকীয় বিকিরণ। CMB সব জায়গায় ছড়িয়ে রয়েছে। পুরোনো অ্যানালগ টেলিভিশনের ঝিরঝির দৃশ্য বা রেডিওর শোঁ শোঁ আওয়াজ আসলে এই CMB। এর মাধ্যমে মহাবিশ্বের বয়স, আকৃতি, বিগ ব্যাংয়ের তাপমাত্রা ও ঘনত্ব, ডার্ক ম্যাটার ও ডার্ক এনার্জির প্রভাব এবং মহাবিশ্বের সম্প্রসারণের হার সম্পর্কে জানা যায়।

জেমস ওয়েব টেলিস্কোপ: কীভাবে কাজ করে?

জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপ মূলত মহাবিশ্বে বিকিরিত অবলোহিত তরঙ্গ কাজে লাগিয়ে অতীতে ঘটে যাওয়া মহাজাগতিক ঘটনার ছবি তুলতে পারে। এমনকি মহাজাগতিক ধূলিকণার মেঘ ভেদ করেও এটি ছবি তুলতে সক্ষম। কোটি কোটি বছর আগের আলো পৃথিবীতে পৌঁছাতে অনেক সময় লাগে; টেলিস্কোপ সেই পুরোনো আলোকেই বন্দী করে। সে জন্যই জেমস ওয়েবের ছবি তোলাকে টাইম ট্রাভেলের সঙ্গে তুলনা করা হয়।

টেলিস্কোপটির মুখের চাকচিক্যময় অংশটি সোনার প্রলেপযুক্ত। এর ১৮টি ষড়ভুজাকৃতির আয়না বেরিলিয়াম দিয়ে তৈরি, যার ওপর ৪৮.২৫ গ্রাম সোনার প্রলেপ দেওয়া হয়েছে। অবলোহিত রশ্মি প্রতিফলনে সোনার ক্ষমতা কাচের চেয়ে অনেক বেশি। আয়নাগুলো ইনফ্রারেড রশ্মিকে প্রতিফলিত করে প্রাইমারি মিররে পাঠায়, যা রশ্মিকে শনাক্তকারী যন্ত্রে পাঠায়। সেখান থেকে ইনফ্রারেড বিশ্লেষণ করে প্রসেসিং ইউনিট ছবিতে পরিণত করে। সবচেয়ে চমকপ্রদ ব্যাপার হলো, টেলিস্কোপটির ভেতরের অংশগুলো চরম ঠান্ডায় কাজ করে!

বিগ ব্যাংয়ের মুহূর্তের ছবি কি সম্ভব?

জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপ বা অন্য কোনো অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে কি আমরা কখনো ঠিক বিগ ব্যাংয়ের মুহূর্তের ছবি তুলতে পারব? উত্তর, না! কারণ যখন তরঙ্গের কোনো অস্তিত্বই ছিল না, তখনকার ছবি জেমস ওয়েব দিয়ে তোলা সম্ভব নয়। জেমস ওয়েব নিজেই অবলোহিত তরঙ্গ ব্যবহার করে ছবি তোলে, যা বিগ ব্যাংয়ের অনেক পরে রেডশিফট হওয়ার মাধ্যমে সৃষ্টি হয়েছিল।

লেখক: শিক্ষার্থী, প্রথম বর্ষ, সমুদ্রবিজ্ঞান বিভাগ, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়। সূত্র: নাসা এবং ওয়েব টেলিস্কোপ ডটঅর্গ।