হরমুজ প্রণালি সংকট: আন্তর্জাতিক প্রচেষ্টা ব্যর্থ, অচলাবস্থা অব্যাহত
হরমুজ প্রণালির অচলাবস্থা নিরসনে আন্তর্জাতিক মহলের নানামুখী প্রচেষ্টা সত্ত্বেও এখন পর্যন্ত কোনো কার্যকর সমাধান আসেনি। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হামলার প্রতিবাদে ইরান এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে যান চলাচল বন্ধ করে দেওয়ায় বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের এই সংঘাত পঞ্চম সপ্তাহে গড়ালেও যুদ্ধ থামার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না, বরং পরিস্থিতি দিন দিন আরও জটিল আকার ধারণ করছে।
জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে ভোট স্থগিত
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি এক কড়া বার্তায় জানিয়েছেন, হরমুজ প্রণালি নিয়ে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে কোনো ধরনের উসকানিমূলক পদক্ষেপ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলবে। আজ শুক্রবার (৩ এপ্রিল) নিরাপত্তা পরিষদে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের সুরক্ষায় একটি বিশেষ বাহিনী মোতায়েনের খসড়া প্রস্তাব নিয়ে ভোটাভুটির কথা ছিল। তবে শেষ মুহূর্তে সেই ভোট স্থগিত করা হয়েছে এবং পরবর্তী কোনো তারিখ ঘোষণা করা হয়নি।
বাহরাইনের উত্থাপিত এই খসড়া প্রস্তাবে ইরানি হামলা থেকে বাণিজ্যিক জাহাজ রক্ষা করতে 'প্রতিরক্ষামূলক' শক্তি ব্যবহারের অনুমতি চাওয়া হয়েছিল, যা যুক্তরাষ্ট্র এবং উপসাগরীয় দেশগুলোর সমর্থন পেয়েছে। তবে রাশিয়া, ফ্রান্স এবং চীনের মতো সদস্য দেশগুলোর আপত্তির মুখে খসড়া প্রস্তাবটিতে বেশ কিছু পরিবর্তন আনা হয়েছে।
সংশোধিত প্রস্তাবের মূল বক্তব্য
সবশেষ সংশোধিত খসড়া অনুযায়ী, সদস্য রাষ্ট্রগুলো এককভাবে বা বহুজাতিক অংশীদারিত্বের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক নৌপথের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারবে। এই পদক্ষেপ অন্তত ছয় মাসের জন্য কার্যকর করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। যদিও এতে জাতিসংঘ সনদের সপ্তম অধ্যায়ের সরাসরি উল্লেখ বাদ দেওয়া হয়েছে, যা বিশ্ব শান্তি রক্ষায় সশস্ত্র শক্তি ব্যবহারের অনুমতি দেয়।
যুক্তরাজ্যের নেতৃত্বে বৈঠকেও সাফল্য নেই
এদিকে, গতকাল বৃহস্পতিবার (২ এপ্রিল) যুক্তরাজ্যের নেতৃত্বে প্রায় ৪০টি দেশের অংশগ্রহণে হরমুজ সংকট নিয়ে একটি উচ্চপর্যায়ের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। ওই বৈঠক থেকে অবিলম্বে এবং কোনো শর্ত ছাড়াই হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার দাবি জানানো হলেও কার্যকর কোনো সাফল্য আসেনি। বৈঠকে অংশগ্রহণকারী দেশগুলোর মধ্যে ইউরোপীয় ইউনিয়ন, এশিয়ার কয়েকটি রাষ্ট্র এবং মধ্যপ্রাচ্যের কিছু দেশ উপস্থিত ছিল।
বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্য হুমকি
জ্বালানি সরবরাহের প্রধান এই রুটটি ইরানের নিয়ন্ত্রণে থাকায় বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা ক্রমাগত বাড়ছে, যা বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে দিয়েছেন যে, হরমুজ প্রণালি দীর্ঘদিন বন্ধ থাকলে বিশ্বব্যাপী তেলের দাম আকাশচুম্বী হতে পারে এবং মুদ্রাস্ফীতি আরও ত্বরান্বিত হবে।
এই সংকটের প্রভাব শুধুমাত্র জ্বালানি খাতেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, পরিবহন ব্যবস্থা এবং ভোক্তা বাজারে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। বিভিন্ন দেশ তাদের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিকল্প রুট খুঁজতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে, কিন্তু হরমুজ প্রণালির বিকল্প সত্যিকার অর্থে খুবই সীমিত।
বর্তমান পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক প্রচেষ্টা জোরদার করা হচ্ছে, কিন্তু ইরান ও পশ্চিমা দেশগুলোর মধ্যে রাজনৈতিক মেরুকরণ এবং অবিশ্বাসের পরিবেশ সমাধান প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সংকট নিরসনে দ্রুত এবং কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।



