মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের মাঝে কবি মাহমুদ দারবিশের প্রেমিকা তামার বেন-আমির মৃত্যু
আগ্রাসন ও যুদ্ধ মানেই বিপুল মৃত্যু। ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের চলমান আগ্রাসনসৃষ্ট যুদ্ধে এই তিন দেশ ছাড়াও আরও ১০টি দেশে বোমা পড়েছে ইতিমধ্যে। মধ্যপ্রাচ্যে বহু জাতির মানুষ মরছে ১৩–দেশীয় এই যুদ্ধে।
এর মধ্যেই হাড়ের ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে ২৪ ফেব্রুয়ারি মারা গেলেন তামার বেন-আমি। তিনি যুদ্ধক্ষেত্র বা এর আশেপাশে কোথাও মারা না গেলেও চলমান যুদ্ধে বেন-আমির স্বাভাবিক মৃত্যুও খানিক মনোযোগ পাচ্ছে মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ে আগ্রহীদের মধ্যে। কারণ, নামটি জড়িয়ে আছে ফিলিস্তিনের জাতীয় কবি মাহমুদ দারবিশের জীবনের সঙ্গে।
ফিলিস্তিনিদের সংগ্রামের প্রতীক কবি মাহমুদ দারবিশ
বহুকাল ধরেই মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা ও যুদ্ধাবস্থার বড় কারণ—ফিলিস্তিনিদের মাতৃভূমি ফিরে পাওয়ার সংগ্রাম এবং তাতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের লাগাতার বৈরিতা। ফিলিস্তিনিদের মাতৃভূমি ফিরে পাওয়ার সংগ্রামের অন্যতম প্রতীকী এক চরিত্র কবি মাহমুদ দারবিশ। কবিতায় যিনি নিজ জনগোষ্ঠীর সংগ্রামকে বাঙ্ময় করে তুলে ধরতেন। ২০০৮ সালে প্রয়াত এই কবি বাংলাভাষীদের মধ্যেও বহুকাল ধরে জনপ্রিয়।
তাঁর বহুল আলোচিত ১৯৬৪ সালে লেখা ‘পরিচয়পত্র’ কবিতার বিখ্যাত সেই লাইন—‘লিখে রাখো, আমি একজন আরব, আমার পরিচয়পত্র নম্বর পঞ্চাশ হাজার’—বাংলাভাষী অনেক কবিতাপ্রেমীর মনেই অনূদিত হয়ে গাঁথা আছে।
ইহুদি তরুণী বেন-আমি ও কবি দারবিশের সম্পর্ক
ইহুদি তরুণী বেন-আমি ছিলেন মাহমুদ দারবিশের প্রেমিকা। তাঁদের কখনো বিয়ে হয়নি। কিন্তু মাহমুদ দারবিশ ও বেন-আমির কয়েকটি যুগল ছবি বহুকাল বহুভাবে মধ্যপ্রাচ্যে ফিলিস্তিনিদের সঙ্গে ইহুদিদের অতীত মেলামেশা, বন্ধুত্ব ও মৈত্রীর স্মারক হিসেবে প্রচারিত হয়ে চলেছে। সম্প্রতি ৭৯ বছর বয়সে সুদূর বার্লিনে বেন–আমির মৃত্যু তাই বড় খবর হলো আরব বিশ্বে।
ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে কয়েক দশক ধরে ইসরায়েলি শাসকদের নির্মমতায় এই তথ্য এখন বেশ অবিশ্বাস্য ঠেকে; যেন ব্যক্তিপর্যায়ে ফিলিস্তিনিদের সঙ্গে ইহুদিদের সুসম্পর্ক বিরল কিছু। মাহমুদ দারবিশ এবং তামার বেন-আমির সম্পর্কও সে রকম অতীতের অংশ। পরস্পর তাঁরা নিজেদের ‘মাহমুদ’ ও ‘তামারি’ বলে ডাকতেন।
১৯৬২ সালে হাইফার সাফারামে প্রথম দেখা
১৯৬২ সালে হাইফার সাফারামে কমিউনিস্ট পার্টির এক রাজনৈতিক মিছিলে প্রথম দেখা হয়েছিল তাঁদের। মাহমুদের বয়স তখন ২২, বেন-আমির সাড়ে ১৬। তারপর মাত্র ২-৩ বছর এ সম্পর্ক সচল ছিল। তবে এরপরও তামারি ছিলেন কবি মাহমুদের চিরকালের এক শিল্পপ্রেরণা। কবিতায় বারবার যাঁকে পাওয়া যায় ‘রিতা’ নামে।
মাহমুদ দারবিশকে নিয়ে তৈরি ইবতিসাম মারানার তথ্যচিত্র ‘লিখে রাখো, আমি একজন আরব’–এ–ও তাঁদের সম্পর্কের বিবরণ আছে। ২০১৪ সালে তৈরি ওই ডকুমেন্টারিতে হিব্রুতে লেখা তাঁদের প্রেমপত্রগুলো তুলে ধরা হয়েছে, যা বেন-আমি বহুকাল যত্ন করে রেখে দিয়েছিলেন।
রাজনৈতিক বাস্তবতায় সম্পর্কের বিচ্ছিন্নতা
মাহমুদ ও বেন-আমির সম্পর্ক দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। জটিল রাজনৈতিক বাস্তবতার বলি হয়েছে সেই সম্পর্ক। উভয়ে তাঁরা ফিলিস্তিন সংকটের দুই বিপরীত মেরুতে পড়ে যান। ১৯৬৭ সালের যুদ্ধ শেষে জায়নবাদীদের দখলদারত্বের মুখে জন্মভূমি হারিয়ে বৈরুত গিয়ে ইয়াসির আরাফাতদের গেরিলা দল পিএলওতে যোগ দেন মাহমুদ দারবিশ। অন্যদিকে বেন-আমিকে যোগ দিতে হয় নৌবাহিনীর সংগীত দলে। স্পষ্টতই যুদ্ধ তাঁদের কেবল আলাদা করেনি, উভয়ের জীবনের গতিপথও বদলে দেয়।
জীবনের শেষ দিনও মাহমুদ দরবিশ কাটিয়েছেন মাতৃভূমি ও সেখানে ফেরার আকুতি নিয়ে ক্রমাগত লিখে ও বক্তৃতা দিয়ে। অন্যদিকে বেন-আমি বার্লিনে থাকলেও মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রচারে বিশ্বের নানান জায়গায় ঘুরে বেড়াতেন। মাঝেমধ্যে হাইফাতেও আসতেন কিছু সাংস্কৃতিক প্রকল্পের কাজে।
‘রিতা এবং একটি রাইফেল’ কবিতার প্রেক্ষাপট
মাহমুদ দারবিশের কবিতাগুলোর মধ্যে ১৯৬৭ সালে লেখা ‘রিতা এবং একটি রাইফেল’ বেশ বিখ্যাত। সেখানে কবি লিখেছিলেন: ‘রিতা এবং আমার চোখের মাঝে রয়েছে একটা রাইফেল...’ এই কবিতায় প্রেম ও যুদ্ধের দ্বন্দ্ব ফুটে উঠেছে। হাইফার দিনগুলোতে ‘সৌন্দর্যভরা পেয়ালাগুলো’র সামনে করা রিতা ও কবির কোনো অঙ্গীকার দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। রিতা একজন ইসরায়েলি চর ছিলেন বলেও অনেক অপ্রমাণিত প্রচার শোনা গেছে পরবর্তী সময়ে।
মৃত্যু পর্যন্ত বেন-আমির দারবিশের প্রতি শ্রদ্ধা
পারস্পরিক বিচ্ছিন্নতার মধ্যেও মৃত্যু পর্যন্ত বেন-আমি নিয়মিত ইউরোপের বিভিন্ন স্থানে দারবিশের কবিতা পড়তেন। তাঁর জীবন ও কর্ম নিয়ে বক্তৃতা দিতেন। ১৯৯৮ সালে তাঁদের আবার দেখাও হয়েছিল ফ্রান্সে। তবে মাহমুদ দারবিশ পরে বিভিন্ন সময় বলেছেন, প্রাথমিক জীবনের সম্পর্কের চেয়েও মাতৃভূমির জন্য পরিণত জীবনের সংগ্রামই তাঁর কাছে মুখ্য ও বেশি গুরুত্বের।
২০০৭ সালে ৩৫ বছর পর শেষবারের মতো হাইফায় এসেছিলেন দারবিশ। তখনো তাঁর অতীত প্রেম ও বর্তমান ফিলিস্তিনের মধ্যে অতিক্রম–অযোগ্য যুদ্ধবাজ রাইফেল গণহত্যায় লিপ্ত। এমনকি সদ্য বিদায়ী ফেব্রুয়ারিতে, যখন বেন-আমিও আর নেই পৃথিবীতে, তখনো দারবিশ উল্লিখিত সেই রাইফেলের রাজত্বই চলছে মধ্যপ্রাচ্যে। রাইফেলের রাজত্বে কবিদের যে অতৃপ্তি নিয়ে বিদায় নিতে হয়, দারবিশের জীবন তা–ই জানায় আমাদের। নিশ্চিতভাবে এ মুহূর্তে মাতৃভূমি ধ্বংস হতে দেখা ইরানের কবিদের জীবনেও একই অভিজ্ঞতার পুনরাবৃত্তি ঘটছে।



