বিশ্বজুড়ে জলবায়ু পরিস্থিতি আবারও এক অনিশ্চিত মোড়ে দাঁড়িয়েছে। আন্তর্জাতিক আবহাওয়া বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন, চলতি জুন থেকে আগস্টের মধ্যেই গড়ে উঠতে পারে ‘এল নিনো’ পরিস্থিতি। আর তা হলে পৃথিবীর নানা প্রান্তে তাপমাত্রা বৃদ্ধি, খরা, অস্বাভাবিক বৃষ্টিপাত এবং চরম আবহাওয়ার ঝুঁকি আরও বেড়ে যেতে পারে। মঙ্গলবার (২ জুন) এমন পূর্বাভাস দিয়েছে বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা (ডব্লিউএমও)।
এল নিনো গঠনের সম্ভাবনা
সংস্থাটি জানিয়েছে, আগামী কয়েক মাসের মধ্যে এল নিনো তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা প্রায় ৮০ শতাংশ। নভেম্বর নাগাদ এটি পূর্ণাঙ্গ রূপ নেওয়ার সম্ভাবনা ৯০ শতাংশেরও বেশি। উষ্ণমণ্ডলীয় প্রশান্ত মহাসাগরের পানির তাপমাত্রা অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পাওয়ার কারণে এল নিনো পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে বলে জানিয়েছে ডব্লিউএমও। এটি বিশ্বজুড়ে তাপমাত্রা ও বৃষ্টিপাতের স্বাভাবিক নিয়মে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে যাচ্ছে।
তাপমাত্রা ও বৃষ্টিপাতের পূর্বাভাস
জুন থেকে আগস্ট মাসের পূর্বাভাসের ভিত্তিতে ডব্লিউএমও জানিয়েছে, বিশ্বের প্রায় সব প্রান্তেই স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি তাপমাত্রা বজায় থাকার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। এর ফলে কিছু অঞ্চলে একের পর এক প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। আঞ্চলিক জলবায়ু কেন্দ্রগুলোর পূর্বাভাস অনুযায়ী, দক্ষিণ এশিয়ায় গড় বৃষ্টিপাতের চেয়ে কম মৌসুমি বৃষ্টিপাতের আশঙ্কা আছে। এর ফলে দীর্ঘস্থায়ী তাপপ্রবাহ, বনভূমিতে অগ্নিকাণ্ড এবং স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়তে পারে।
এল নিনো কী এবং এর প্রভাব
এল নিনো হলো একটি প্রাকৃতিক জলবায়ুগত ঘটনা, যা ঘটে যখন মধ্য ও পূর্ব নিরক্ষীয় প্রশান্ত মহাসাগরের পানির তাপমাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। সমুদ্রের এই উষ্ণতা বায়ুমণ্ডলের ওপর প্রভাব ফেলে এবং বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের বৃষ্টি, তাপমাত্রা ও বায়ুপ্রবাহের স্বাভাবিক ধরন বদলে দেয়। সাধারণত প্রতি দুই থেকে সাত বছর পরপর এল নিনো ফিরে আসে এবং প্রায় ৯ থেকে ১২ মাস স্থায়ী হতে পারে। এর বিপরীত পর্যায় হলো ‘লা নিনা’, যেখানে সমুদ্রের পানির তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে কমে যায়।
দক্ষিণ এশিয়ায় প্রভাব
ডব্লিউএমওর পূর্বাভাস অনুযায়ী, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে স্বাভাবিকের তুলনায় কম মৌসুমি বৃষ্টিপাত হতে পারে। এতে কৃষি, পানিসম্পদ ও খাদ্য উৎপাদনের ওপর প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। ডব্লিউএমও-এর প্রধান চেলেন্তে সাউলো বলেন, বিশ্বের এখন থেকেই প্রস্তুতি নেওয়া প্রয়োজন। কারণ এল নিনোর প্রভাবে খরা ও ভারী বৃষ্টিপাতের প্রবণতা বাড়তে পারে। সেই সঙ্গে স্থলভাগ ও মহাসাগর- উভয় অঞ্চলেই তীব্র তাপপ্রবাহের ঝুঁকি তৈরি হবে। এল নিনোর অন্যতম বৈশিষ্ট্যই হলো আবহাওয়ার চরম বৈপরীত্য।
সাম্প্রতিক বছরগুলোর রেকর্ড
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এল নিনোর প্রভাব বিশ্ব উষ্ণায়নের সঙ্গে মিলিত হয়ে নতুন রেকর্ড গড়েছে। এল নিনোর প্রভাবে ২০২৩ সালের উষ্ণতার রেকর্ড ইতিহাসের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ। পরের বছর (২০২৪) সালে গড় তাপমাত্রা বাড়ে প্রায় ১ দশমিক ৫৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এতে ২০২৪ সাল উষ্ণতার সব রেকর্ড ভেঙে দেয়। এ বিষয়ে জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস বলেছেন, এল নিনোকে এখন একটি বৈশ্বিক জলবায়ু সতর্কতা হিসেবে দেখা উচিত। তার ভাষায়, এটি ইতোমধ্যে উষ্ণ হয়ে ওঠা পৃথিবীর পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে। এল নিনো পরিস্থিতি উত্তপ্ত হতে থাকা পৃথিবীতে ‘আগুনে ঘি ঢালার’ মতো কাজ করবে।
প্রস্তুতির প্রয়োজনীয়তা
বিশেষজ্ঞদের মতে, এল নিনো মাঝারি থেকে শক্তিশালী রূপ নিতে পারে। ফলে বিশ্বের অনেক অঞ্চলে স্বাভাবিক আবহাওয়া ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। কৃষি, খাদ্য নিরাপত্তা, পানি ব্যবস্থাপনা এবং জনস্বাস্থ্যের মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলোতে এর প্রভাব পড়তে পারে। তাই আবহাওয়ার পরিবর্তিত প্রবণতার দিকে নজর রাখা এবং আগাম প্রস্তুতি নেওয়াই হতে পারে আগামী মাসগুলোতে সম্ভাব্য ঝুঁকি মোকাবিলার সবচেয়ে কার্যকর উপায়।



