মার্কিন নৌবাহিনীর সর্বাধুনিক রণতরিতে টয়লেট সংকট: নাবিকদের দীর্ঘ অপেক্ষা
মার্কিন নৌবাহিনীর সর্বাধুনিক বিমানবাহী রণতরি ইউএসএস জেরাল্ড আর ফোর্ড বর্তমানে এক অদ্ভুত সংকটের মুখোমুখি। যুদ্ধ বা সামরিক কৌশলের পরিবর্তে জাহাজটির পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থার করুণ অবস্থা এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই সমস্যাকে উপহাস করে 'টয়লেট যুদ্ধ' নামে অভিহিত করা হচ্ছে।
পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থায় বড় ধরনের ত্রুটি
এনপিআর ও ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রায় পাঁচ হাজার নাবিক ও সেনার এই বিশালাকার রণতরিতে সচল টয়লেটের সংখ্যা এখন নগণ্য। অবস্থা এতটাই বেগতিক যে, একেকজন নাবিককে শৌচাগার ব্যবহারের জন্য ৪৫ মিনিট পর্যন্ত লাইনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতে হচ্ছে। গত ১৫ জানুয়ারি এনপিআর জানিয়েছিল, জাহাজটির অত্যাধুনিক পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থায় বড় ধরনের ত্রুটি দেখা দিয়েছে।
রণতরিটি মোতায়েন থাকা অবস্থাতেই এর বর্জ্যনিষ্কাশন নালাগুলো বারবার বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। ভ্যাকুয়াম সিস্টেমটি এতটাই জটিল যে, ডকইয়ার্ডে না ফেরা পর্যন্ত এটি মেরামত করা সম্ভব নয়। ফলে সাগরে থাকা অবস্থায় নাবিকদের চরম ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। মার্কিন নৌবাহিনী অবশ্য দাবি করেছে, টয়লেটের এ সমস্যার কারণে তাদের যুদ্ধ প্রস্তুতি বা সক্ষমতায় কোনো প্রভাব পড়বে না।
সামাজিক মাধ্যমে হাসির খোরাক ও মনোবলে প্রভাব
শৌচাগার ব্যবহারের জন্য মার্কিন নাবিকদের এই হাহাকার ইন্টারনেটে হাসির খোরাক জোগাচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে নানা আলোচনা ও ব্যঙ্গাত্মক মন্তব্য ছড়িয়ে পড়েছে। জাহাজের অচল টয়লেট এবং সেনাদের ব্যক্তিগত জীবনের ত্যাগের বিষয়টি নিয়ে অনেকে রসিকতা করছেন। একই সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি সামরিক অবস্থান নিয়েও নেটিজেনরা বিভিন্ন প্রশ্ন তুলছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর সবচেয়ে বড় যুদ্ধজাহাজ ইউএসএস জেরাল্ড আর ফোর্ড কয়েক মাস সাগরে থাকার পর আবারও মধ্যপ্রাচ্যের দিকে রওনা দিয়েছে। কারণ, ইরানের সঙ্গে এখন সরাসরি যুদ্ধে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। তবে দীর্ঘ সময় সাগরে থাকা এবং জাহাজের ত্রুটিপূর্ণ পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থার কারণে সেনাদের মনোবল এখন তলানিতে পৌঁছেছে।
মিশনের দীর্ঘায়ন ও রক্ষণাবেক্ষণের সমস্যা
এই রণতরি গত জুন মাস থেকে টানা সাগরে অবস্থান করছে। প্রথমে ভূমধ্যসাগরে এবং পরে ক্যারিবীয় অঞ্চলে মোতায়েন থাকার পর এটি এখন আবার পূর্ব দিকে অগ্রসর হচ্ছে। ইরানের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য মার্কিন সামরিক অভিযানে সহায়তা করতেই জাহাজটির মিশনের এই বারবার পরিবর্তন ও সময়সীমা বাড়ানো হয়েছে বলে ধারণা করা যায়।
রণতরিটির অধিনায়ক ক্যাপ্টেন ডেভিড স্কারোসি নাবিকদের পরিবারের কাছে লেখা এক চিঠিতে স্বীকার করেছেন, মিশনের মেয়াদ দ্বিতীয়বারের মতো বাড়ানোয় তিনি নিজেও অবাক হয়েছেন। তিনি লিখেছিলেন, তিনি আশা করেছিলেন, কয়েক সপ্তাহের মধ্যে বাড়িতে ফিরে বাসার পেছনের উঠানের বেড়া মেরামত করবেন। কিন্তু এর ভেতরে পরিস্থিতি বদলে গেছে।
সাধারণত শান্তিকালীন সময়ে একটি বিমানবাহী রণতরির মিশন ছয় মাস স্থায়ী হয়। অবসরপ্রাপ্ত রিয়ার অ্যাডমিরাল মার্ক মন্টগোমারি ওয়াল স্ট্রিট জার্নালকে জানান, পরিকল্পনাকারীরা জরুরি প্রয়োজনে মিশন কিছুটা দীর্ঘায়িত করার সুযোগ রাখলেও জেরাল্ড আর ফোর্ড এখন স্বাভাবিক প্রত্যাশার চেয়ে অনেক বেশি সময় ধরে সাগরে অবস্থান করছে।
বর্জ্যনিষ্কাশন ব্যবস্থায় নিয়মিত সমস্যা
বর্তমানে মার্কিন নৌবাহিনীর বহরে ১১টি বিমানবাহী রণতরি রয়েছে, যেগুলো পূর্বপরিকল্পিত সূচি অনুযায়ী বিশ্বজুড়ে দায়িত্ব পালন করে। বর্তমানে জেরাল্ড আর ফোর্ডের পাশাপাশি ইউএসএস আব্রাহাম লিংকনকেও মধ্যপ্রাচ্যে মোতায়েন করা হয়েছে।
তবে দীর্ঘ সময় সাগরে অবস্থানের কারণে ইউএসএস জেরাল্ড আর ফোর্ডের রক্ষণাবেক্ষণের কাজ ব্যাহত হচ্ছে। নৌবাহিনীর এক কর্মকর্তা ওয়াল স্ট্রিট জার্নালকে জানিয়েছেন, জাহাজের ৬৫০টি শৌচাগার নিয়ন্ত্রণকারী বর্জ্যনিষ্কাশন ব্যবস্থায় নিয়মিত সমস্যা দেখা দিচ্ছে। অবস্থা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে এই ত্রুটি সারানোর জন্য গড়ে প্রতিদিন অন্তত একবার প্রকৌশলীদের ডাকতে হচ্ছে।
এই সংকট শুধু নাবিকদের দৈনন্দিন জীবনে ভোগান্তি বাড়াচ্ছে না, বরং সামরিক কার্যক্রমের দক্ষতাতেও প্রভাব ফেলতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন। মার্কিন নৌবাহিনীর জন্য এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে, যা দ্রুত সমাধানের দাবি রাখে।



