মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনায় বাংলাদেশি জাহাজের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধপরিস্থিতি ও উত্তেজনার প্রভাবে হরমুজ প্রণালীর কাছাকাছি অঞ্চলে অবস্থানরত চারটি বাংলাদেশি পতাকাবাহী জাহাজ মারাত্মক ঝুঁকির সম্মুখীন হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশনের (বিএসসি) মালিকানাধীন জাহাজ ‘এমভি বাংলার জয়যাত্রা’ একটি ইরানি ড্রোন হামলার লক্ষ্যবস্তু হতে হতে অল্পের জন্য রক্ষা পেয়েছে, যা নাবিকদের মধ্যে তীব্র আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে।
ইরানি ড্রোন হামলার নাটকীয় ঘটনা
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি সংযুক্ত আরব আমিরাতের জেবেল আলী বন্দরে ‘এমভি বাংলার জয়যাত্রা’ জাহাজটির মাত্র ১০০ গজ দূরে একটি ইরানি ড্রোন বিস্ফোরিত হয়। জাহাজটিতে ৩১ জন নাবিক রয়েছেন, যারা এই হামলার ভয়াবহতা সরাসরি প্রত্যক্ষ করেছেন। নাবিক আতিকুল হক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, ‘আমাদের জাহাজের খুব কাছেই ইরানি ড্রোনটি বিস্ফোরিত হয়। আলহামদুলিল্লাহ, জাহাজ ও সব নাবিক নিরাপদ রয়েছেন।’ অন্য এক নাবিক স্যাটেলাইট ফোনে জানিয়েছেন, ড্রোনটির আলো ও বিস্ফোরণের তীব্র শব্দে মনে হয়েছিল জাহাজটি সরাসরি হামলার শিকার হয়েছে, যা মুহূর্তেই নাবিকদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে দেয়।
জাহাজের অবস্থান ও পণ্য পরিবহন
‘এমভি বাংলার জয়যাত্রা’ গত ২৭ ফেব্রুয়ারি কাতারের মোসাইয়িদ বন্দর থেকে ৩৮ হাজার ৮০০ টন স্টিল কয়েল নিয়ে জেবেল আলী বন্দরে নোঙর করেছিল। হামলার পরদিনই বন্দরে রেড অ্যালার্ট জারি করা হয়, এবং পণ্য খালাসের কাজ সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়। দুই দিন পর খালাস প্রক্রিয়া পুনরায় শুরু হলেও, যুদ্ধপরিস্থিতির কারণে জাহাজটি এখনই হরমুজ প্রণালী অতিক্রম করতে পারবে না বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
অন্যান্য বাংলাদেশি জাহাজের নিরাপত্তা ব্যবস্থা
হরমুজ প্রণালী ও এর আশপাশের এলাকায় বাংলাদেশি পতাকাবাহী আরও তিনটি জাহাজ অবস্থান করছে, যাদের নিরাপত্তা নিয়ে গভীর উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। এই জাহাজগুলোর মধ্যে দুটি কেএসআরএম গ্রুপের এবং একটি মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের (এমজিআই) মালিকানাধীন। ঝুঁকি এড়াতে এসব জাহাজের গতি কমানোর পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
- কেএসআরএম গ্রুপের নির্বাহী পরিচালক মেহেরুল করিম জানান, তাদের দুটি জাহাজের একটি ওমানের সালালা বন্দর ও অন্যটি কুয়েতগামী ছিল। গন্তব্যে পৌঁছাতে তিন থেকে চার দিন লাগার কথা থাকলেও, নিরাপত্তার খাতিরে জাহাজ দুটির গতি কমিয়ে আনা হয়েছে।
- মেঘনা গ্রুপের অঙ্গ প্রতিষ্ঠান মার্কেন্টাইল শিপিং লাইনসের একটি জাহাজ জ্বালানি সংগ্রহের জন্য সংযুক্ত আরব আমিরাতের শারজার খোর ফাক্কান বন্দরে যাওয়ার কথা ছিল, কিন্তু নাবিকদের নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে সেই যাত্রা স্থগিত করা হয়েছে। বর্তমানে জাহাজটি আরব সাগরে অবস্থান করছে।
উত্তেজনার প্রভাব ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা
মধ্যপ্রাচ্যের এই উত্তেজনা বাংলাদেশি জাহাজগুলোর জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও জাহাজ মালিকরা নাবিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করছেন, তবে যুদ্ধপরিস্থিতির অবনতি হলে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন। এই ঘটনা আন্তর্জাতিক জলপথে বাংলাদেশের বাণিজ্যিক কার্যক্রমের উপর সম্ভাব্য প্রভাব ফেলতে পারে, যা অর্থনৈতিক দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনা করা হচ্ছে।
