মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধাবস্থা: সামাজিক মাধ্যমে ভুয়া তথ্যের ছড়াছড়ি, খামেনির মৃত্যু ও হামলার দাবি যাচাই
মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধাবস্থা: ভুয়া তথ্যের ছড়াছড়ি, খামেনি ও হামলা দাবি

মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা ও সামাজিক মাধ্যমে ভুয়া তথ্যের বিস্তার

ইরানে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের হামলার পর মধ্যপ্রাচ্যে বর্তমানে যুদ্ধাবস্থা বিরাজ করছে। দুই পক্ষের মধ্যে পাল্টাপাল্টি হামলা অব্যাহত রয়েছে, যেখানে যুদ্ধবিমান, ক্ষেপণাস্ত্র এবং ড্রোনের ব্যবহার লক্ষণীয়। এই উত্তপ্ত পরিস্থিতিতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা ধরনের ভুয়া তথ্য ও মিথ্যা দাবি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে, যা জনমনে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করছে।

খামেনির মৃত্যুর দাবিতে এআই তৈরী ছবির প্রচার

গত শনিবার ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ অভিযান শুরুর পরদিন রোববার ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির মৃত্যুর খবর ছড়ায়। এরপর তাঁর শেষকৃত্যের দৃশ্য বলে দাবি করে দুটি ছবি ইন্টারনেটের বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে ব্যাপকভাবে প্রচারিত হয়। যাচাইয়ের শুরুতে দেখা যায়, এই ছবিগুলোর উৎস সম্পর্কে কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। ইরান সরকারের পক্ষ থেকে খামেনির শেষকৃত্যের কোনো ছবি প্রকাশ না করায়, আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমেও এগুলো গুরুত্বসহ প্রচারিত হয়নি।

ছবিগুলো বিশ্লেষণ করলে বেশ কিছু অসংগতি ধরা পড়ে। কফিনে খামেনিকে চশমা ও সাধারণ পোশাক পরিহিত অবস্থায় দেখানো হয়েছে, যা বাস্তবতার সাথে মেলে না। ছবি দুটির পটভূমিতে স্পষ্ট পার্থক্য রয়েছে এবং একটির নিচের ডান কোণে গুগলের জেমিনি এআইয়ের জলছাপ লক্ষ করা যায়। এআই কনটেন্ট শনাক্তকারী প্ল্যাটফর্ম হাইভ মডারেশন ও এআই অর নটের মাধ্যমে পরীক্ষা করে দেখা গেছে, ছবিগুলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে তৈরী হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল।

ভেনেজুয়েলার হামলার ছবি খামেনির বাসভবন বলে প্রচার

ফেসবুকে আরেকটি ভিডিও শেয়ার করে দাবি করা হচ্ছে, এটি আলী খামেনির বাসভবনে বাংকার ধ্বংসকারী বোমা হামলার আগের ও পরের অবস্থা দেখাচ্ছে। যাচাইয়ে দেখা যায়, ভিডিওটি থেকে নেওয়া কিফ্রেম রিভার্স ইমেজ সার্চে ফক্স নিউজের ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্টে একটি পোস্ট মেলে, যা গত ৫ জানুয়ারি প্রকাশিত হয়েছিল। এতে ভেনেজুয়েলার ফুয়ের্তে তিউনা সামরিক ঘাঁটিতে যুক্তরাষ্ট্রের হামলার ছবি ব্যবহার করা হয়েছে, যেখানে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছিল।

সিবিসি নিউজের ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্টে ৪ জানুয়ারির একটি পোস্ট এবং ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য টেলিগ্রাফের ৯ জানুয়ারির প্রতিবেদনেও একই ছবি পাওয়া যায়। অর্থাৎ, খামেনির বাসভবনে হামলার দাবিতে প্রচারিত ছবিগুলো আসলে ভেনেজুয়েলার রাজধানী কারাকাসের ফুয়ের্তে তিউনা সামরিক ঘাঁটিতে গত জানুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্রের হামলার স্যাটেলাইট ইমেজ।

ইসরায়েলে অগ্নিকাণ্ডের পুরোনো ভিডিও প্রচার

ইরানের তেহরানসহ বিভিন্ন স্থানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পর, ইসরায়েলে ইরানের হামলার দৃশ্য বলে একটি ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়ায়। যাচাইয়ে সিরিয়ান সিভিল ডিফেন্সের এক্স অ্যাকাউন্টে ২০২৫ সালের ২৩ এপ্রিলের একটি পোস্ট থেকে জানা যায়, ভিডিওটি আসলে পূর্ব আলেপ্পোর আল-বাব শহরের একটি পেট্রোলপাম্পে ২০২৫ সালের ২২ এপ্রিল ঘটে যাওয়া অগ্নিকাণ্ডের, যা সাম্প্রতিক সময়ের নয়।

আর্জেন্টিনার বিস্ফোরণ ইসরায়েলের বলে দাবি

সামাজিক মাধ্যমে আরেকটি ভিডিও প্রচার করে দাবি করা হয়, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ইসরায়েলের একটি রাসায়নিক কারখানায় বিস্ফোরণ হয়েছে। রিভার্স ইমেজ সার্চে তুরস্কভিত্তিক গণমাধ্যম টিআরটি ওয়ার্ল্ডের ইউটিউব চ্যানেলে গত বছরের ১৭ নভেম্বরে প্রকাশিত একটি শর্টস মেলে, যার শিরোনাম ছিল ‘বুয়েনস এইরেসের একটি রাসায়নিক কারখানায় বিস্ফোরণ’।

বুয়েনস এইরেস টাইমসের ২০২৫ সালের ১৫ নভেম্বরের প্রতিবেদন অনুসারে, আর্জেন্টিনার বুয়েনস এইরেস প্রদেশের এজেজা এলাকার একটি শিল্পাঞ্চলে ২০২৫ সালের ১৫ নভেম্বর একটি ভয়াবহ বিস্ফোরণ ঘটে, যাতে অন্তত ২২ জন আহত হন। অর্থাৎ, এই ভিডিওটি আর্জেন্টিনার পুরোনো ঘটনার, ইসরায়েলের সাথে এর কোনো সম্পর্ক নেই।

বেন গুরিয়ন বিমানবন্দরে হামলার মিথ্যা দাবি

ইসরায়েলের বেন গুরিয়ন বিমানবন্দরে ইরানের বোমা হামলা চালানোর দাবিতে আরেকটি ভিডিও প্রচারিত হয়। যাচাইয়ে বার্তা সংস্থা এপির ইউটিউব চ্যানেলে গত বছরের ২৮ জুলাইয়ের একটি ভিডিও মেলে, যার শিরোনাম ছিল ‘ডেনভার বিমানবন্দরে ধোঁয়াচ্ছন্ন একটি বিমান থেকে যাত্রীরা জরুরি স্লাইড ব্যবহার করে নেমে যাচ্ছেন’।

সিএনএন–এর ২০২৫ সালের ২৭ জুলাইয়ের প্রতিবেদন অনুসারে, ডেনভার আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে আমেরিকান এয়ারলাইনসের একটি ফ্লাইটে আগুন ধরে যাওয়ার ঘটনাটি ঘটে, যা ইসরায়েলের সাথে সম্পর্কহীন। এই ভিডিওটি যুক্তরাষ্ট্রের একটি বিমান দুর্ঘটনার, ইরানের হামলার নয়।

সামগ্রিকভাবে, মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান যুদ্ধাবস্থায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভুয়া তথ্য ও মিথ্যা দাবির ব্যাপক বিস্তার ঘটছে। এসবের সত্যতা যাচাই করে দেখা গেছে, বেশিরভাগ ছবি ও ভিডিও পুরোনো ঘটনা বা ভিন্ন দেশের ঘটনাকে বিকৃত করে উপস্থাপন করা হচ্ছে, যা জনগণকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা মাত্র।