হরমুজ প্রণালি বন্ধের হুঁশিয়ারিতে বাংলাদেশের জ্বালানি আমদানিতে অনিশ্চয়তা
হরমুজ প্রণালি বন্ধের হুঁশিয়ারিতে জ্বালানি আমদানিতে অনিশ্চয়তা

হরমুজ প্রণালি বন্ধের হুঁশিয়ারিতে বাংলাদেশের জ্বালানি আমদানিতে অনিশ্চয়তা

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর শনিবার রাতে জাহাজের বেতারবার্তায় হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল বন্ধের হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে। এই সতর্কতার পর থেকেই মধ্যপ্রাচ্যনির্ভর আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যে অনিশ্চয়তার মেঘ ঘনীভূত হয়েছে। তবে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি গতকাল রোববার আল–জাজিরাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে স্পষ্ট করে বলেছেন, এখন পর্যন্ত হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়ার কোনো পরিকল্পনা তাঁদের নেই।

জ্বালানি খাতে তাৎক্ষণিক সংকট নেই

ব্যবসায়ী ও জ্বালানি খাত–সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা একবাক্যে জানাচ্ছেন, হরমুজ প্রণালি বন্ধ হলেও তাৎক্ষণিকভাবে বাংলাদেশে কোনো জ্বালানিসংকটের আশঙ্কা নেই। তবে তারা সতর্ক করে দিয়েছেন, পরিস্থিতি যদি দীর্ঘায়িত হয়, তাহলে সরবরাহব্যবস্থায় চাপ পড়তে পারে এবং জ্বালানি আমদানিতে বিলম্ব দেখা দিতে পারে।

হরমুজ প্রণালি ব্যবহার করে ইরাক, ইরান, কাতার, কুয়েত, বাহরাইন, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সৌদি আরব—এই সাত দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের পণ্য আনা-নেওয়া হয়। যুদ্ধাবস্থার কারণে প্রণালির পাশের ওমান থেকেও ওমান উপসাগরীয় পথে পরিবহন ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। পারস্য উপসাগর থেকে এই প্রণালি পেরিয়ে ওমান উপসাগর, আরব সাগর তথা ভারত মহাসাগর ও বঙ্গোপসাগর হয়ে বাংলাদেশে জাহাজ আসে।

আমদানি-রপ্তানির পরিসংখ্যান

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এই পথনির্ভর দেশগুলো থেকে পণ্য আমদানি ব্যয় ছিল প্রায় ৬০০ কোটি ডলার। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের হিসাবে একই সময়ে ওই দেশগুলোতে রপ্তানি হয়েছে ৭৫ কোটি ডলারের পণ্য। রপ্তানি তুলনামূলক কম হলেও জ্বালানি তেল, গ্যাস ও এলপিজির মতো গুরুত্বপূর্ণ পণ্যের বড় অংশই আসে এ অঞ্চল থেকে।

তেল সরবরাহে বিলম্বের আশঙ্কা

বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) সূত্রে জানা গেছে, ১ থেকে ৩ মার্চের মধ্যে সৌদি আরবের রাস তানুরা বন্দর থেকে এক লাখ টন অপরিশোধিত তেল জাহাজে তোলা হবে। জাহাজটি হরমুজ প্রণালি পেরিয়েই চট্টগ্রামে আসার কথা। তবে যাত্রা সময়মতো শুরু হবে কি না, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। বিপিসির অপরিশোধিত তেলের অর্ধেকই এই পথ ধরে আসে।

বিপিসির কর্মকর্তারা জানান, দেশে এখনই জ্বালানিসংকট নেই। তবে প্রণালির পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে সরবরাহ পরিকল্পনায় চাপ পড়বে। দেশে ডিজেলের মজুত রয়েছে ২ লাখ ১ হাজার ৬১০ টন, যা দিয়ে প্রায় ১৪ দিনের চাহিদা মেটাতে পারে। দৈনিক চাহিদা প্রায় ১৪ হাজার টন। চলতি মাসে আরও ৩ লাখ ৮০ হাজার টন ডিজেল আসার কথা। পেট্রলের মজুত রয়েছে প্রায় ২০ দিনের, অকটেনের ৩০ দিনের ও ফার্নেস অয়েলের ৯৩ দিনের।

বিপিসির পরিচালক (বাণিজ্য) এ কে এম আজাদুর রহমান বলেন, "হরমুজ প্রণালি দিয়ে অপরিশোধিত জ্বালানি তেল আনা হয়। পরিশোধিত তেল সরাসরি ওই পথে আসে না। ইতিমধ্যে সংযুক্ত আরব আমিরাত, সিঙ্গাপুর, ইন্দোনেশিয়াসহ বিভিন্ন দেশের কোম্পানিগুলোর সঙ্গে কথা হয়েছে। তারা তেল সরবরাহের ক্ষেত্রে নেতিবাচক কোনো তথ্য দেয়নি।"

এলএনজি আমদানিতে ঝুঁকির শঙ্কা

তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানিতে নির্ভরতা সবচেয়ে বেশি কাতারের ওপর। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের তথ্যে দেখা যায়, চলতি অর্থবছরের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ২৩ লাখ ৩৭ হাজার টন এলএনজি আমদানির শুল্কায়ন হয়েছে। এর ৬৫ শতাংশই এসেছে কাতার থেকে, যা হরমুজ প্রণালি পেরিয়ে আসে।

পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান মো. এরফানুল হক বলেন, "সংঘাত শুরুর আগেই এলএনজিবাহী চারটি জাহাজ প্রণালি পার হয়েছে। ফলে ১২ মার্চ পর্যন্ত বড় শঙ্কা নেই। তবে ১৫ ও ১৮ মার্চ দুটি জাহাজ এই জলপথ ব্যবহার করে দেশে আসার কথা রয়েছে। এ দুটি জাহাজ আটকে গেলে কিছুটা সংকট হতে পারে। তবে এলএনজি আমদানির বিকল্প উৎসও হাতে রয়েছে। যেমন অস্ট্রেলিয়া, মালয়েশিয়ার মতো দেশ থেকে এলএনজি আমদানি করা সম্ভব।"

এলপিজিতে আপাতত স্বস্তি

এলপিজির ক্ষেত্রেও তাৎক্ষণিক সংকট নেই, তবে দীর্ঘ মেয়াদে শঙ্কা রয়েছে বলে এ খাতের ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন। এলপিজি অপারেটরস অব বাংলাদেশের সভাপতি আমিরুল হক বলেন, "হরমুজ অঞ্চলে যাওয়ার অপেক্ষায় থাকা তিনটি জাহাজ দিক পরিবর্তন করেছে। তবে এখনই দেশে এলপিজির সমস্যা হবে না।"

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, ফেব্রুয়ারিতে চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দর এবং সীতাকুণ্ড জেটি দিয়ে ১ লাখ ৭১ হাজার টন এলপিজি আমদানি হয়েছে, যা জানুয়ারির তুলনায় ৩০ শতাংশ বেশি। এ ছাড়া মার্চের প্রথম দুই সপ্তাহে যেসব এলপি গ্যাসবাহী জাহাজ আসার কথা, সেগুলো চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দরের পথে রয়েছে।

এমজিআইয়ের চেয়ারম্যান মোস্তফা কামাল বলেন, "চট্টগ্রাম বন্দরের পথে থাকা এলপি গ্যাসবাহী জাহাজগুলো চলে আসছে। হরমুজ প্রণালি বন্ধ হলেও তাৎক্ষণিক কোনো সমস্যা হবে না। তবে পরবর্তী সময়ে যেসব জাহাজ আসবে, সেগুলোর সরবরাহ দেরি হতে পারে।"

বিকল্প পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে

জ্বালানি খাতের সঙ্গে যুক্ত অভিজ্ঞ ব্যক্তিরা বলছেন, বাংলাদেশে দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি মজুতের সক্ষমতা সীমিত। ফলে হরমুজ প্রণালি দুই সপ্তাহের বেশি কার্যত বন্ধ থাকলে তেল, গ্যাস ও এলপিজি সব ক্ষেত্রেই সরবরাহে চাপ তৈরি হতে পারে। অর্থাৎ এখনই সংকট না থাকলেও পরিস্থিতি দীর্ঘ হলে জ্বালানি নিরাপত্তা বড় পরীক্ষার মুখে পড়তে পারে বাংলাদেশ।

বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেন, "জ্বালানি আমদানি ও সরবরাহ নিয়ে আপাতত কোনো শঙ্কা নেই। হরমুজ প্রণালি অচল হওয়া কিংবা মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাতের ফলে কোনো সংকট হলে তা কাটিয়ে ওঠার জন্য পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। জ্বালানি তেল কিংবা এলএনজি আমদানির সব ধরনের উৎস নিয়ে আমরা কাজ করছি।"