রমজান তারিখ নির্ধারণে সৌদি আরবের চাঁদ দেখা বিতর্ক: উম্ম আল-কুরা বনাম বৈজ্ঞানিক হিসাব
রমজান তারিখে সৌদি আরবের চাঁদ দেখা বিতর্ক

রমজান তারিখ নির্ধারণে সৌদি আরবের চাঁদ দেখা নিয়ে চলমান বিতর্ক

সৌদি আরবের দাপ্তরিক হিজরি বর্ষপঞ্জি উম্ম আল-কুরা অনুযায়ী আগামী বুধবার, ১৮ ফেব্রুয়ারি রমজান মাসের প্রথম দিন নির্ধারিত হয়েছে। তবে এই ঘোষণার মধ্যেই নতুন করে জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের সঙ্গে মতবিরোধ দেখা দিয়েছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতের কয়েকটি জ্যোতির্বিদ্যা সংস্থা স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, মঙ্গলবার মধ্যপ্রাচ্যের কোথাও চাঁদ দেখা যাওয়ার সম্ভাবনা নেই।

চাঁদ দেখা বনাম ক্যালেন্ডার: একটি দীর্ঘস্থায়ী দ্বন্দ্ব

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সৌদি আরব চাঁদ দেখার ঘোষণাকে ঘিরে বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। বহু ইসলামি বিশেষজ্ঞ ও জ্যোতির্বিদের অভিযোগ, চাঁদ দেখা যাক বা না যাক, উম্ম আল-কুরা ক্যালেন্ডারের পূর্বনির্ধারিত তারিখ অনুযায়ীই রমজান ও ঈদের দিন ঘোষণা করা হয়। গত বছরের মার্চ মাসে মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক সংবাদমাধ্যম মিডল ইস্ট আই তাদের একটি প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছিল, কয়েক বছর ধরে সৌদি সরকারের বিরুদ্ধে চাঁদ দেখার তথ্য নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠছে।

এই বিতর্কের মূল কারণ ইসলামি বর্ষপঞ্জির মৌলিক বৈশিষ্ট্য। ইসলামি বর্ষপঞ্জি সম্পূর্ণরূপে চন্দ্রভিত্তিক, যেখানে ১২টি মাস থাকে এবং প্রতিটি মাস ২৯ বা ৩০ দিনের হয়ে থাকে। রমজান ও ঈদের তারিখ নির্ধারণে প্রকৃত চাঁদ দেখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় বিষয়। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ এই প্রক্রিয়া ভিন্নভাবে অনুসরণ করে:

  • কিছু দেশ নিজস্ব চাঁদ দেখা কমিটির মাধ্যমে স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে
  • অনেক দেশ সৌদি আরবের ঘোষণার ওপর সরাসরি নির্ভরশীল
  • যুক্তরাজ্যের মতো দেশে কেন্দ্রীয় চাঁদ দেখা কমিটি না থাকায় বহু মুসল্লি সৌদির ঘোষণাই অনুসরণ করেন

২০২৩ সালের ঈদুল ফিতর: বিতর্কের তীব্রতা

২০২৩ সালে ঈদুল ফিতরের তারিখ ঘোষণা নিয়ে বিতর্ক বিশেষভাবে তীব্র আকার ধারণ করেছিল। সে বছরের ২০ এপ্রিল সৌদি আরব ঈদের চাঁদ অনুসন্ধানের ঘোষণা দিয়েছিল। কিন্তু কুয়েতের প্রখ্যাত জ্যোতির্বিদ আব্দেল আল-সাদুন স্পষ্ট ভাষায় বলেছিলেন, "আরব উপদ্বীপে সেদিন চাঁদ দেখা সম্ভব নয়"। তিনি আরও চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছিলেন, "যদি কেউ চাঁদ দেখে থাকেন তাহলে প্রমাণ হিসেবে এর ছবি তুলুন"।

তবে সৌদি কর্তৃপক্ষ একই দিন জানায়, ২১ এপ্রিল ঈদুল ফিতর পালিত হবে। এই ঘোষণার পর অনেকেই চাঁদ দেখার প্রমাণ চাওয়া শুরু করেন। উত্তরে সৌদি জ্যোতির্বিদ মুলহাম আল-হিন্দি একটি সিসিডি ক্যামেরায় তোলা "অনুজ্জ্বল চাঁদ"-এর ছবি প্রকাশ করে দাবি করেন যে সেটিই চাঁদ দেখার প্রমাণ।

২০২৪ সালের ঈদুল আজহা: একই ধারাবাহিকতা

২০২৪ সালের ৬ জুন সৌদি আরব ঈদুল আজহার তারিখ ঘোষণা করে আবারও চাঁদ দেখার দাবি করে। কিন্তু জ্যোতির্বিদদের একটি বড় অংশ তখনও দৃঢ়ভাবে বলেছিলেন, বৈজ্ঞানিক হিসাব অনুযায়ী সেদিন চাঁদ দেখা সম্ভব নয়। এই অসামঞ্জস্যতা ইসলামি বিশেষজ্ঞদের মধ্যে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।

বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণ: বৈজ্ঞানিক বাস্তবতা বনাম ঘোষণা

ইসলামিক বর্ষপঞ্জি বিষয়ক বিশেষজ্ঞ সংস্থা নিউ ক্রিসেন্ট সোসাইটির প্রতিষ্ঠাতা ইমাদ আহমেদ মিডল ইস্ট আই-কে একটি সাক্ষাৎকারে বলেছেন, "বৈজ্ঞানিকভাবে যেখানে চাঁদ দেখা সম্ভব নয়, সৌদি সেখানে চাঁদ দেখার তথ্য দিতে বিশেষভাবে ইচ্ছুক"। তিনি তার পর্যবেক্ষণে উল্লেখ করেছেন যে এই তথ্য প্রায়ই উম্ম আল-কুরা বর্ষপঞ্জিকার সঙ্গে মিলে যায়, কিন্তু বাস্তব চাঁদ দেখার বিষয়টি সব সময় এই ক্যালেন্ডারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

ইমাদ আহমেদ আরও দাবি করেন, প্রতি বছর নির্দিষ্ট এলাকার মাত্র দুই-তিনজন ব্যক্তি চাঁদ দেখার দাবি করেন, অন্যদের কাছ থেকে এমন দাবি আসে না। এই নির্বাচনী দাবিগুলোই প্রায়শই সরকারি ঘোষণার ভিত্তি হয়ে দাঁড়ায়।

বিশেষজ্ঞরা স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে সৌদি আরব একমাত্র দেশ নয় যারা হিসাব-নিকাশ ব্যবহার করে তারিখ নির্ধারণ করে। তুরস্কও জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক গণনার ভিত্তিতে ঈদের দিন নির্ধারণ করে থাকে। তবে তুরস্ক ও সৌদি আরবের মধ্যে একটি মৌলিক পার্থক্য রয়েছে: তুরস্ক প্রকাশ্যেই হিসাবের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা জানায়, যখন সৌদি আরব চাঁদ দেখার বিষয়টিকে প্রাধান্য দেয় বলে দাবি করে।

এই চলমান বিতর্ক ইসলামি বিশ্বে ঐক্যের চেয়ে বিভেদই বেশি সৃষ্টি করছে। অনেক মুসলিম দেশ এখন সৌদি আরবের ঘোষণার ওপর নির্ভরশীল, আবার অনেক দেশ স্বাধীনভাবে চাঁদ দেখা কমিটির সিদ্ধান্ত মেনে চলে। এই অবস্থা বিশ্বব্যাপী মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে উৎসবের তারিখ নিয়ে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করছে।