সৌদি আরবের ক্যালেন্ডার অনুযায়ী বুধবার রমজান শুরু, জ্যোতির্বিদদের বিতর্ক
সৌদি আরবের দাপ্তরিক হিজরি বর্ষপঞ্জি উম্ম আল-কুরা অনুযায়ী আগামী বুধবার, ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে রমজান মাসের প্রথম দিন নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে এই ঘোষণার পরিপ্রেক্ষিতে জ্যোতির্বিদদের একাংশ নতুন করে বিতর্কের সূচনা করেছেন। তাদের দাবি, সম্ভাব্য হিসাব অনুযায়ী মঙ্গলবার মধ্যপ্রাচ্যের কোথাও চাঁদ দেখা যাওয়ার সুযোগ নেই, যা রমজান শুরুর ঐতিহ্যবাহী পদ্ধতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
চাঁদ দেখা নিয়ে জ্যোতির্বিদদের সন্দেহ
প্রতিবেশী দেশ সংযুক্ত আরব আমিরাতের একাধিক জ্যোতির্বিদ্যা সংস্থা জানিয়েছে, আকাশগত অবস্থান বিবেচনায় মঙ্গলবার চাঁদ দৃশ্যমান হওয়ার সম্ভাবনা অত্যন্ত কম। এই অবস্থানে ক্যালেন্ডারভিত্তিক ঘোষণা বনাম বাস্তবিক চাঁদ দেখার প্রশ্নটি আবারও সামনে এসেছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অভিযোগ উঠেছে যে, চাঁদ দেখা নিশ্চিত হোক বা না হোক, সৌদি কর্তৃপক্ষ প্রায়শই উম্ম আল-কুরা ক্যালেন্ডার অনুসারেই রমজান ও ঈদের তারিখ ঘোষণা করে থাকে।
মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক সংবাদমাধ্যম মিডল ইস্ট আই গত বছরের ২৬ মার্চ এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করে, চাঁদ দেখার তথ্য নিয়ে সৌদি সরকারের বিরুদ্ধে বিভ্রান্তিকর ঘোষণার অভিযোগ একাধিকবার উঠেছে। ইসলামি বিধান অনুযায়ী মুসলিমরা চন্দ্রবর্ষ অনুসরণ করেন, যেখানে প্রতিটি মাস ২৯ বা ৩০ দিনের হয় এবং রমজান ও ঈদের শুরু-শেষ নতুন চাঁদ দেখার ওপর নির্ভরশীল।
বিশ্বব্যাপী অনুসরণ ও ভিন্নমত
বিশ্বের বিভিন্ন দেশ নিজস্ব চাঁদ দেখা কমিটির মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নেয়, আবার কিছু দেশ সৌদির ঘোষণার অনুসরণ করে। উদাহরণস্বরূপ, যুক্তরাজ্যে কেন্দ্রীয় চাঁদ দেখা কমিটি না থাকায় অনেক মুসল্লি সৌদির ঘোষণার সঙ্গে মিল রেখে রোজা ও ঈদ পালন করেন, যদিও এই পদ্ধতি নিয়ে আলেমদের মধ্যে ভিন্নমত বিদ্যমান। বিশেষ করে ঈদুল ফিতরের তারিখ ঘোষণা নিয়ে একাধিকবার বিতর্ক হয়েছে।
২০২৩ সালে ঈদের সম্ভাব্য তারিখ নিয়ে জ্যোতির্বিদরা আপত্তি তুললেও সৌদি নির্ধারিত দিনেই ঈদ ঘোষণা দেয়। সে সময় কুয়েতের জ্যোতির্বিদ আব্দেল আল-সাদুন বলেছিলেন, আরব উপদ্বীপে চাঁদ দেখা সম্ভব নয় এবং কেউ দেখে থাকলে ছবি প্রকাশের আহ্বান জানান। পরে সৌদি পক্ষ থেকে অনুজ্বল চাঁদের একটি সিসিডি ক্যামেরায় তোলা ছবি প্রকাশ করা হয়।
ইতিহাসে অনুরূপ ঘটনা
২০২৪ সালের ৬ জুনও একই ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হয়, যখন জ্যোতির্বিদরা সম্ভাবনা নাকচ করলেও সৌদি চাঁদ দেখার দাবি করে ঈদুল আজহার তারিখ ঘোষণা করে। ইসলামি বর্ষপঞ্জি নিয়ে কাজ করা সংস্থা নিউ ক্রিসেন্ট সোসাইটির প্রতিষ্ঠাতা ইমাদ আহমেদ বলেন, বৈজ্ঞানিকভাবে চাঁদ দেখা অসম্ভব হলেও সৌদিতে দেখার দাবি আসার ঘটনা নতুন নয়। তার মতে, এসব ঘোষণা প্রায়ই উম্ম আল-কুরা ক্যালেন্ডারের সঙ্গে মিলে যায়, যা সব সময় বাস্তব চাঁদ দেখার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
বিশ্লেষকদের ভাষ্য, হিসাব-নিকাশের ভিত্তিতে চাঁদের মাস নির্ধারণ শুধু সৌদির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। তুরস্কও জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক গণনা ব্যবহার করে তারিখ নির্ধারণ করে, তবে তারা আগে থেকেই তা প্রকাশ করে এবং সরাসরি চাঁদ দেখার দাবি করে না—যা সৌদির পদ্ধতি থেকে ভিন্ন। এই পার্থক্য রমজান ও ঈদের তারিখ নির্ধারণে বৈশ্বিক মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে চলমান বিতর্ককে আরও জটিল করে তুলছে।
